সম্প্রতি লিবিয়ায় নৃশংস হত্যার শিকার হয়েছেন ২৬ বাংলাদেশি। এ সময় আরো ১১ বাংলাদেশি মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত পাচারকারী চক্রের মূলহোতা হাজি কামালকে রাজধানীর গুলশান শাহজাদপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। কামাল গত ১০ বছর ধরে অন্তত ৪০০ যুবককে অবৈধভাবে বিদেশে পাঠিয়েছেন। লিবিয়ায় নিহত ও আহতদের বেশির ভাগই হাজি কামাল পাঠিয়েছেন। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর পাচারকারীচক্র পরিবারের কাছ থেকে যে মুক্তিপণ আদায় করেছে তার সব টাকাই হাজি কামালের মাধ্যমে পরিশোধ হয়েছে। এদের মধ্যে লালচান ও তরিকুল ইসলামের মুক্তিপণ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন হাজি কামাল। লালচান হত্যার শিকার হলেও তরিকুল মারাত্মক আহত হয়ে মিজদাহ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। গতকাল সোমবার র্যাব-৩ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক লে. কর্নেল রকিবুল হাসান এসব তথ্য জানান।
লে. কর্নেল রকিবুল বলেন, ‘মুক্তিপণ দিয়েও অনেকে তার সন্তানকে ফেরত পাননি। হাজি কামালকে গ্রেফতারের সময় পাওয়া ডায়েরিতেও অন্তত ৪০০ ভিকটিম ও তার পরিবারের মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা পাওয়া গেছে। ডায়েরিতে ১০ জন দালালের তথ্য রয়েছে। এরা কামালের সহযোগী। এই দালালরা ঢাকা, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, মাগুরা ও গোপালগঞ্জ থেকে যুবকদের সংগ্রহ করতেন। হাজি কামালের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। তিনি গত ১৫ বছর ঢাকায় থাকেন। তার কাছ থেকে বিভিন্ন মানুষের ৩১টি পাসপোর্ট ও একাধিক ব্যাংকের চেকবই উদ্ধার করা হয়েছে। টাইলস ঠিকাদারের আড়ালেই মানবপাচার করতেন তিনি। ইউরোপ গমনের ক্ষেত্রে তারা ৭-৮ লাখ টাকার বেশি অর্থ নিয়ে থাকেন। এর মধ্যে সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা লিবিয়ায় যাওয়ার আগে এবং বাকি আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা লিবিয়ায় গমনের পর নেওয়া হতো। কামালকে মাদারীপুর রাজৈর থানা ও কিশোরগঞ্জের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
যেভাবে লিবিয়ায় পাঠানো হয় : বাংলাদেশ হতে লিবিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে এ চক্রের সদস্যরা সম্প্রতি বাংলাদেশ-কলকাতা-মুম্বাই-দুবাই-মিশর-বেনগাজী-ত্রিপলি (লিবিয়া) রুট ব্যবহার করেছেন। দুবাইয়ে পৌঁছে পাচারকৃতরা বিদেশি এজেন্টদের তত্ত্বাবধানে সাত-আট দিন অবস্থান করেন। বেনগাজিতে পাঠানোর জন্য বেনগাজি থেকে এজেন্টরা কথিত ‘মরাকাপা’ নামক একটি ডকুমেন্ট দুবাইতে প্রেরণ করে। সেই ডকুমেন্টসহ বিদেশি এজেন্ট তাদেরকে মিসর ট্রানজিট নিয়ে বেনগাজি পাঠায়। বেনগাজিতে বাংলাদেশি এজেন্ট তাদেরকে ত্রিপলিতে স্থানান্তর করে।
লিবিয়া থেকে ইউরোপ : ভিকটিমরা ত্রিপলিতে বেশ কয়েক দিন অবস্থান করেন। এরপর এজেন্টদের দেশীয় প্রতিনিধির দ্বারা স্বজনদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেন। পরে ভিকটিমদের ত্রিপলির বন্দর এলাকায় একটি সিন্ডিকেটের নিকট অর্থের বিনিময়ে ইউরোপে পাচারের উদ্দেশ্যে হস্তান্তর করা হয়। এ সিন্ডিকেট নৌযান দিয়ে তিউনিশিয়া উপকূলীয় চ্যানেল হয়ে ইউরোপের পথে রওনা দেয়। এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ভিকটিমরা ভূমধ্যসাগরে প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ে মৃত্যুর শিকার হন।
