নাগরিক মতামত

এবার বাজেট হোক জীবন ও জীবিকার

আপডেট : ০২ জুন ২০২০, ০৯:৪৩

জুন মাস শুরু হয়েছে। এসে যাচ্ছে নতুন বাজেট। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট। অন্যান্য বছরের মতো এবার বাজেট নিয়ে হইচই কম। সবার কথা, অর্থনীতি কীভাবে পুনর্জীবিত হবে? বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন আমরা। অর্থনীতির দুই লাইফলাইন তৈরি পোশাক রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের অবস্থা ভালো নয়। মিল-ফ্যাক্টরি এখনো বন্ধ। বহু লোক বেকার, কর্মহীন, ক্যাশলেস। খাবার দিতে হচ্ছে অগণিত মানুষকে। নগদ টাকা দিতে হচ্ছে। ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে অর্থনীতির পুনর্জীবনের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করতে। সরকার সুদে ভর্তুকি দেবে। বড়ো ব্যবসায়ী, ছোটো ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা কম সুদে মেয়াদি ঋণ ও প্রচালন ঋণ পাবে। রিফাইনেসিংয়ের ব্যবস্থা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি পরিমাণের প্রণোদনা ঘোষিত হয়েছে, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

এদিকে প্রতিদিন করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে বেশি বেশি মানুষ, মারাও যাচ্ছে বেশি বেশি। চারদিকে আতঙ্ক। প্রয়োজনের বাইরে কেউ ঘর থেকে বেরোচ্ছে না। অথচ ঘর থেকে বেরোনো ছাড়া সাধারণ মানুষের উপায় নেই। জানও বাঁচাতে হবে, জীবিকাও দরকার, রোগ থেকেও বাঁচতে হবে। ভাত, কাপড়, চাল, ডাল, নুন, তেল, মাছ, মাংস, তরিতরকারি, ফলমূল—সবই দরকার। এর জন্য দরকার ক্যাশ। বর্তমান অবস্থায় ক্যাশ কে দেবে? কাজ না থাকলে মিল-ফ্যাক্টরি না চললে ক্যাশ আসবে কোত্থকে? আমদানি-রপ্তানি কবে শুরু হবে সে আছে অনিশ্চয়তা। বেতন পাওয়া যাবে কি না—তা নিয়ে আছে অনিশ্চয়তা। এরই মধ্যে এসেছে বাজেটের সময়। বড়োই দুঃসময়, চ্যালেঞ্জের সময়। কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা।

মানুষের মনে প্রশ্ন—কী হবে নতুন বাজেট? এটা কী আগের মতোই হবে? না একটু ভিন্ন ধরনের হবে? থাকবে কী নতুন কথা, নতুনভাবে শুরুর কথা? এসব প্রশ্ন চারদিকে। এই সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া গেছে গেল সপ্তাহে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ঘোষিত হয়েছে। সামান্য বেড়েছে বরাদ্দ। তবে মূল্যস্ফীতি হিসাবে বিলে ২০১৯-২০-এর এডিপি থেকে ২০২০-২১-এর এডিপির পরিমাণ কম। এর অর্থ আগামী দিনে সরকারের বিনিয়োগ কম হবে, খরচ কম হবে। অথচ এখন সরকারি বিনিয়োগের সময়। কারণ বেসরকারি বিনিয়োগ নেই, আসতে আরো সময় লাগবে। তাহলেই প্রশ্ন কেমন হবে ২০২০-২১ অর্থবছরের নতুন বাজেট। এডিপিতে দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অগ্রাধিকার অনেক কম। অগ্রাধিকার বেড়েছে পরিবহন, তারপর ফিজিক্যাল প্ল্যানিং, আবাসন, তারপর বিদ্যুত্। স্বাস্থ্য পেয়েছে সবচেয়ে কম অগ্রাধিকার। অথচ আমাদের সাধারণ বুদ্ধি বলে—এখন স্বাস্থ্যের অগ্রাধিকার বেশি হওয়া দরকার ছিল। তা না হোক, তবু কিছু কথা বাজেটকে সামনে রেখে বলতেই হয়।

আমার বিবেচনায় এক নম্বর বিবেচ্য বিষয় এবার হওয়া উচিত খাদ্য নিরাপত্তা। এর দুটো দিক রয়েছে। খাদ্যের সহজপ্রাপ্তি, দুই নম্বর হচ্ছে খাদ্য কেনার ক্ষমতা। প্রাপ্তির দিকে আসলে দেখা যাচ্ছে বোরো ফসল ভালোই হয়েছে। সরকার ২২ লাখ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করবে বলে ঠিক হয়েছে। সামনে আউশ ফসল। এখন কৃষকরা ব্যস্ত ঐ ফসল লাগানো নিয়ে। সরকারি ভাষ্যমতে কৃষক উত্পাদনের সব উপাদান পাচ্ছে। এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। তবে একথা বলে রাখা ভালো—আউশ ফসল ভালো হতেই হবে।

মুশকিল হচ্ছে ফসল ভালো হলেই যে সাধারণ মানুষ চাল কিনতে পারবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এর জন্য দরকার হবে ‘ক্যাশ’। যারা রোজগার করতে পারবে না—এ রকম অসহায় লোকদের জন্য সরকারি ত্রাণের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা কিনে খায়, যারা গায়ে খাটতে পারে তাদের দরকার কাজ—দরকার কর্মসংস্থান। এখানেই বড়ো বিপদ। অর্থমন্ত্রীকে এই জায়গায় অকৃপণভাবে কাজ করতে হবে যাতে অর্থনীতি যতশীঘ্র সম্ভব সচল হয়। রপ্তানি-আমদানি ব্যবসা স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। এটা নির্ভর করে বিদেশি বাজারের ওপর। আমাদের বিদেশি বাজারে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে পুরোপুরি রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতি করতে গিয়ে যখন বড়ো ধাক্কা সামলাতে হবে। একই অবস্থা রেমিট্যান্সেরও। এই রেমিট্যান্সের অবস্থা স্বাভাবিক হতেও সময় লাগবে। অথচ এই দুই খাতের অবদান খুবই বড়ো। এমতাবস্থায় কর্মসংস্থানের জন্য নির্ভর করতে হবে কৃষির ওপর, ‘এসএমই’র ওপর। এই খাতেই সর্বোচ্চ কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি।

আমরা জানি বড়ো বড়ো পুঁঁজিনির্ভর শিল্পে কর্মসংস্থান হয় কম। অর্থমন্ত্রী তাই এই কৃষি এবং এসএমইর ওপর নির্ভর করে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করতে পারেন। মনে রাখতে হবে আগামী বাজেট ‘নতুন বাংলাদেশের’ বাজেট হবে। করোনা-পরবর্তী বাংলাদেশ সম্পূর্ণ ‘নতুন বাংলাদেশ’। মাস্ক পরে চলতে হবে, ঘনঘন হাত ধুতে হবে। সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে হবে। এ এক সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের জগত্। অতএব বাজেটকেও হতে হবে ভিন্ন ধরনের। পূর্ববর্তী ১০টি বাজেটের কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নজর দিতে হবে খাদ্যের পর, কর্মসংস্থানের পর স্বাস্থ্যের দিকে। স্বাস্থ্য বলতে আমি ওষুধ কম্পানি, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডাক্তার-নার্স বোঝাচ্ছি না। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় স্বাস্থ্য চলে গেছে এসব দিকে।

দেশে সবচেয়ে বেশি ওষুধ বিক্রি হয় ‘এন্টাসিড’। চিন্তার বিষয়। এটা তো ওষুধের ব্যাপার নয়। দেহের ব্যাপার, খাবারের ব্যাপার। আমাদের পূর্বপুরুষরা অনেক চিকিৎসা করেছেন গাছ, লতাপাতা দিয়ে। আঙ্গুলের মাথা ফুলে গেলে আমরা বেগুন ছিদ্র করে তাতে আঙ্গুল ঢুকিয়ে রেখেছি। রক্তপাত হলে গেন্ধা গাছের পাতার রস দুর্বাঘাসের রস লাগিয়েছি। বিনা পয়সায় ভালো হয়েছি। আজ এসবের জন্য ডাক্তার দরকার। অ্যান্টিবায়টিক দরকার হচ্ছে। টেস্ট দরকার হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতকে এই জায়গা থেকে ফিরিয়ে আনা দরকার। আয়ুর্বেদ ইউনানিকে মর্যাদা দেওয়া দরকার। আগামী দিনগুলো ভয়াবহ। ইম্যুনিটি বাড়ানো দরকার। লতাপাতা ফলমূল এ কাজ করতে পারে। আশা করি অর্থমন্ত্রী মহোদয় স্বাস্থ্য যা করার করবেন, অধিকন্তু দেশজ চিকিত্সার দিকেও নজর দেবেন। স্বাস্থ্যের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক আছে। এ দুটো খাত বহুদিন যাবত্ উপযুক্ত অগ্রাধিকার থেকে বঞ্চিত। ২০২০-২১ অর্থ বছরের বাজেটে আশা করি অর্থমন্ত্রী বাজেটের এই ইমব্যালেন্সটি দূর করবেন।

আরেকটা কথা না বলে পারছি না। ২০২০-২১ অর্থ বছরে টাকার অভাব হবে। ঋণ করতে হবে। ঘাটতি অর্থায়ন করতে হবে। মানুষের হাতে টাকা ধরিয়ে নিতে হবে। এর জন্য যে টাকা দরকার কোত্থেকে তা আসবে? বহু বছর যাবত্ আমি বলে আসছি খরচের গুণগত দিকের কথা। সবাই স্বীকার করব আমরা আমাদের দেশে এক টাকার কাজ দুই টাকায়, তিন টাকায় হয়। এই সম্পর্কে বালিশের মূল্য জাতীয় খরচ মিডিয়ায় প্রচুর। অর্থমন্ত্রী এই জায়গায় একটা সাহসী উদ্যোগ নিতে পারেন। কাজের খরচের টাকার পাইপাই হিসাব নিতে পারেন তার ব্যবস্থা করতে পারেন। এটা খুব অসম্ভব কাজ নয়। ১০ শতাংশ টাকাও যদি এডিপি এবং রাজস্ব বাজেট থেকে তিনি সাশ্রয় করতে পারেন তাহলে বড়ো একটি কাজ হবে। বোঝাই যাচ্ছে এবার রাজস্ব বাজেটের কাজ বড়োই অনিশ্চিত। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার কথা।

আগামী বছরে রাজস্ববৃদ্ধি কোত্থেকে হবে তা দুশ্চিন্তার বিষয়। এরই মধ্যে আমার কথা আছে। মানুষের হাতে টাকা দিতে হলে খরচ বৃদ্ধি করতে হলে সাধারণ করদাতাদেরকে কিছুটা স্বস্তি দিতে হবে। ৩-৪ বছর যাবত্ করমুক্ত আয় একই জায়গায় আছে। অতএব এবার একটু স্বস্তি দিলে এই বাজারে যাবে। মনে রাখতে হবে ধনীদের টাকা বাজারে যাবে না। গরিবের টাকা মধ্যবিত্তের টাকা বাজারে যায়। এদিকে নজর দেওয়া দরকার। আর যদি পারা যায় অতিধনীদের ট্যাক্স করার কথা ভাবা যায়। অতিধনীদের সমাজের প্রতি অবদান খুব বড়ো নয়। তারা স্বেচ্ছায়ও এগিয়ে আসতে পারেন। বহু প্রকল্প আছে যা অপ্রয়োজনীয়, এগুলো বছরের পর টানা হচ্ছে। এসব বর্জন করা যায়। তাহলে টাকা বাঁচে। পরিশেষে বলতে চাই খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য-শিক্ষা, কৃষি এবং এসএমই হোক ২০২০-২১ অর্থ বছরের নতুন বাজেটের লক্ষ্য। মানুষের জীবন ও জীবিকা দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন