খুব ছেলেবেলায় বর্ণমালার বই পড়তে গিয়ে শিখেছিলাম—ঐ-তে ঐরাবত। ঐরাবত মানে হাতি। আমি জীবনে হাতি লিখতে গিয়ে কখনোই ঐরাবত শব্দটা লিখিনি। আমার জীবনে ঐরাবত নেই। কিন্তু হাতি আছে। হাতি আমার খুব প্রিয় একটা প্রাণী। বিশেষ করে বাচ্চা হাতি। ছোটোদের জন্যে একটা উপন্যাস লিখেছিলাম যার নায়ক ছিল ভোলানাথ ওরফে ভোলা ওরফে ভুল্লু নামের একটি বাচ্চা হাতি। উপন্যাসের নাম দিয়েছিলাম ‘বাচ্চা হাতির কাণ্ডকারখানা’।
সুযোগ পেলেই আমি বাচ্চা হাতিদের মজার মজার কাণ্ডকারখানা দেখি ইউটিউবে খোঁজ দ্যা সার্চ দিয়ে। দু’দিন আগেও দেখছিলাম একটা ভিডিও ক্লিপ—কিউট একটা বাচ্চা হাতি ফুটফুটে একটা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে কুস্তি লড়ার মতো জড়িয়ে ধরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। একবার দু’বার বারবার। মেয়েটা হাসতে হাসতে অস্থির। আর বাচ্চা হাতিটা তারচে বেশি অস্থির মেয়েটার সঙ্গে খেলতে পেরে।
গেল এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে আমি ডুবেছিলাম আমেরিকায় সাদা পুলিশের হাঁটুর নিচে জীবন দেওয়া কৃষ্ণাঙ্গ মানবসন্তান জর্জ ফ্লয়েডকে নিয়ে। অন্তঃসত্ত্বা একটি হাতির প্রতি কেরালার মানুষের নৃশংসতার সাম্প্রতিক হূদয়বিদারক সংবাদটি তাই দৃষ্টিগোচর হয়নি। আজ সকালে খবরটির বিস্তারিত পড়ে স্তব্ধ হয়ে গেছি আমি।
খাদ্যের সন্ধানেই লোকালয়ে এসেছিল সন্তানসম্ভবা হাতিটা। উত্তর কেরালার মালাপ্পুরম জেলার একটা গ্রামে ঢুকে পড়েছিল সে। একসঙ্গে দুটি অপরাধ করেছিল হাতিটা। এক—লোকালয়ে ঢুকে পড়া, যেখানে মানুষেরা বাস করে। দুই—সেই মানুষদের সে বিশ্বাস করেছিল। এবং বিশ্বাস করেই মানুষের দেয়া একটা আনারস মুখে পুরেছিল। সে জানত না, সেই মানুষেরা আনারসের ভেতরে পুরে রেখেছিল কিছু বাজি আর পটকা। আনারসটা মুখে পুরে মহানন্দে চিবুতে গিয়েই হাতিটা টের পেয়েছিল—মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখা পাপ। মুখের ভেতরেই বস্ফািরিত হলো পটকা আর বাজিগুলো। মুহূর্তের মধ্যেই ঝলসে গেল মুখের ভেতরটা। ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল তার জিভ। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে ছুটোছুটি করেছে সে পুরো গ্রামটায়। কিন্তু কোনো মানুষ কিংবা কোনো বাড়িঘরের সামান্যতম ক্ষতিও সে করেনি। মুখের ভেতরটায় আঘাতের পরিমাণ এতোটাই ভয়াবহ ছিল যে কিছু খাওয়ার সাধ্যও ছিল না তার। পেটের সন্তানকে বাঁচাবার জন্যে অসহায় হাতিটা কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিল না। আর কয়েক মাস পরেই পৃথিবীর আলোতে আসবার কথা ছিল বাচ্চাটার!
ঝলসে যাওয়া মুখের আগুনজ্বলা যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে এদিক ওদিক ছুটতে ছুটতে এক পর্যায়ে সে স্থানীয় ভেলিয়ার নদীতে এসে নেমে গেল। তারপর নদীর জলে মুখ আর শুঁড় ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। কষ্টটা যদি কমে একটু। যদি বাঁচানো যায় বাচ্চাটাকে! দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়েছিল সে নদীর জলে মুখ ডুবিয়ে। এবং ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই এক পর্যায়ে (২৭ মে বিকেলে) মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল মানুষের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা হতভাগ্য হাতিটা।
আহারে কী বীভত্স সে মৃত্যু দৃশ্য! পেটের বাচ্চাটার সঙ্গে এই সময়ে নিশ্চয়ই অনেক কথা বলেছিল হাতিটা। ইনোসেন্ট বাচ্চাটা তখন কী বলেছিল তার মাকে?
আমি ভাবতে পারি না। ভাবতে গেলেই চোখ দুটো ভেসে যায় জলে। আমি চিন্তা করতে পারি না কিছু। শরীর আমার অবশ হয়ে আসে। পৃথিবীর অপরূপ সৌন্দর্য না দেখেই মায়ের গর্ভেই কী করুণ মৃত্যু ঘটল একটা ছোট্ট এইটুকুন বাচ্চা হাতির! একজন মানুষ হিসেবে মানব সম্প্রদায়ের এমন নিষ্ঠুরতাকে কী বলে নিন্দা জানাব আমি? আমি তো জানতাম ভারতের কেরালাতেই শিক্ষার হার সবচে বেশি! এত এত শিক্ষা নিয়ে এতোটা অমানুষ তোমরা হলে কী করে হে কেরালার মানুষ! শেইম অন ইউ!
২
পৃথিবী নামের এই গ্রহে মানুষের নিষ্ঠুরতা দেখতে দেখতে ক্লান্ত অবসন্ন বিপন্ন বিষণ্ন আমি।
মানুষ তুমি মানুষ হবে কবে? তোমাকে উচিত শিক্ষা দিতে পৃথিবীতে কোভিড১৯ আসবে না তো কি রহমতের রসগোল্লা আসবে?
মাঝে মধ্যেই এমন একটা পৃথিবীর স্বপ্ন দেখি আমি যেখানে শুধু পশুপাখিরাই থাকবে। যে পৃথিবীতে মানুষ থাকবে না কোনো। একজনও না।
অটোয়া ০৩ জুন ২০২০
