বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনা ভাইরাসের দুর্যোগকালীন এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের গুরুত্ব ও তাত্পর্য একটু ভিন্ন মাত্রার। এবারের এ দিবস উদ্যাপনের সাড়ম্বর না থাকলেও এর অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য উপলদ্ধির গভীরতা বিশ্ব সভ্যতাকে ছুঁয়েছে বিশেষভাবে। পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো দাম্ভিক বিশ্বসভ্যতার উদ্ধত মস্ত অবলীলায় আনত এখন পরিবেশের হার না মানা স্বতঃস্ফূর্ততার কাছে। উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক বিজ্ঞান তাই নীরবে তার অসহায়ত্বের ভাষাই প্রকাশ করে চলেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্তমান সময়টাই সম্ভবত মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। প্রকৃতির প্রতিশোধের তাণ্ডবে প্রকম্পিত এখন দাম্ভিক সভ্যতা ও তার মালিকেরা। পৃথিবীতে দাম্ভিকতার প্রভাব খাটিয়ে চলা মানুষের দৃশ্যপট এখন ঠিক পালটেছে, মানুষ অবরুদ্ধ, সামাজিক-অর্থনৈতিক সব কর্মকাণ্ড থমকে আছে, সভ্যতা হয়েছে গতিহীন-স্তব্ধ-নীরব, অথচ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে প্রকৃতি ও পরিবেশের অনুষঙ্গ এবং অন্যান্য প্রাণিকুল। যদিও সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পরিবেশবিরোধী কার্যকলাপ বিবেচনায় এধরনের বিপর্যয়ের আগমনে হয়তো খুব আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। পৃথিবীটাকে মারাত্মক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছিলাম আমরা। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি—পরিবেশ দূষণের কথা, অনিয়ন্ত্রিত দূষণের মাত্রা এমনই পর্যায়ে চলে যাচ্ছিল যে, ২০১৯ সালে বিশেষজ্ঞগণ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি এ শতাব্দীতেই ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির নিচে রাখতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসারণ ৪৫ শতাংশ কমাতে হবে এবং আগামী ১৮ মাসের মধ্যে দূষণ কমিয়ে এনে পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তা একটি ‘Irreversible’ অবস্থার মধ্যে চলে যাবে পরিবেশের ভারসাম্য, অর্থাত্ আসন্ন দুর্যোগ হয়তো আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। সাম্প্রতিক সময়ের ঘূর্ণিঝড়গুলো আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় আম্ফান বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সব ঘূর্ণিঝড়ের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল।
অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য, মানবসৃষ্ট নৈরাজ্যের কারণে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ১৫০-২০০ প্রজাতির জীব চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে! এ গতিতে চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ মোট জীব প্রজাতির এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেকই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। প্রকৃতি অবশ্য সীমা লঙ্ঘন বরদাস্ত করে না, তার নিজস্ব উপায়ে সবকিছু সমতা করে দেয়। প্রাণী বিলুপ্তির কারণে এবং দিনে দিনে জীবের বৈচিত্র্য কমে যাওয়ায় মানুষের নিজেরও অন্যান্য প্রাণীর কাছ থেকে নানান ধরনের রোগে (Zoonotic Disease-এ) সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। অন্য ভাষায় বললে, প্রকৃতির ওপর অত্যাচার করে মানুষ নিজেও আত্মহননের দিকেই এগিয়ে চলেছে নিরন্তর। নতুন নতুন প্রাণঘাতী ‘Zoonotic Disease’-এর আবির্ভাব সম্পর্কে যে আশঙ্কা করা হতো, খামখেয়ালি মানুষ যেন কোভিড-১৯-এর মধ্য দিয়ে ভয়ংকরভাবে সেই সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। চীনের উহান শহরে একটি বেআইনি বন্যপশু ক্রয়বিক্রয় এলাকা থেকে বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শে এসে মানুষের শরীরে প্রথম করোনা নামক ভাইরাসটি বিস্তার করেছে বলে ধারণা করা হয়। মানুষের অবরুদ্ধ হয়ে থাকার সুযোগ নিয়ে, জবরদখল করে প্রভাব খাটিয়ে থাকা মানুষের কাছ থেকে প্রকৃতি আবারও তার অধিকার ফিরিয়ে নেওয়া শুরু করেছে। পৃথিবীর বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে অপরিকল্পিত পর্যটনের মধ্য দিয়ে এতদিন প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছে মানুষ। এখন মানুষের ঘরবন্দি থাকার সুযোগে সেখানে আবারও ফিরতে শুরু করেছে ডলফিনের ঝাঁক। সাগরলতা বিস্তৃত হয়ে প্রাণহীন বালুতটে আবারও প্রাণের সঞ্চার করে চলেছে। কোণঠাসা হয়ে থাকা হরিণেরা তাদের বেদখল হয়ে যাওয়া জায়গায় ফিরে এসেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে মানব-বসতির কাছে দেখা মিলেছে নীলগাই, চিতাবাঘ (Leopard) ইত্যাদির। বিশ্বব্যাপী একই দৃশ্য দেখে মনে হয়, প্রকৃতি যেন অনেকদিন পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। পরিবেশ নিজেই নিজের আপন রূপ ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে, মানুষের সহায়তা তার প্রয়োজন নেই। WHO-এর তথ্যানুযায়ী এক সময়ে বায়ু দূষণের শীর্ষে থাকা শহর দিল্লি, যেখানে Air Quality Index (AQI) ৫০০-৬০০ পর্যন্ত দেখা যেত, তা এখন ৫০-এ নেমে এসেছে; নাইট্রোজেন ডাইঅক্সাইড দূষণ ৭০ শতাংশের চেয়েও বেশি কমে এসেছে। মার্চ মাসে নিউ ইয়র্কে কার্বন ডাইঅক্সাইড দূষণ ১০ শতাংশ কমে এসেছে। অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য— প্যারিসে তা কমেছে ৭২ শতাংশ (+/-১৫ শতাংশ)। উত্তরমেরু (আর্কটিক) আচ্ছাদনকারী ওজোন স্তরে তৈরি হওয়া একটি রেকর্ডপরিমাণ বড়ো ফুটো সম্প্রতি আবারও পূর্ণ হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। প্রকৃতি কতটা নির্মমভাবে প্রতিশোধ নিতে পারে, তার উত্কৃষ্ট উদাহরণ করোনা ভাইরাসের বিশ্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী বিস্তার। ৩১ মে অবধি সারা বিশ্বে প্রায় ৬ দশমিক ০৮ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হয়েছে কোভিড-১৯-এ; অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করেছে ৩ লাখ ৭০ হাজার মানুষ। বাংলাদেশে কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে তার শেষ দেখার জন্য উদ্বিগ্নতার সঙ্গে অপেক্ষা করে আছে দেশবাসী।
কোভিড-১৯-এর কার্যকরী কোনো প্রতিরোধ পদ্ধতি বা চিকিত্সা এখনো মানুষের নাগালের বাইরে। কতদিনে এর চিকিত্সাব্যবস্থা খুঁজে পাবে মানুষ তা জানে না আজও। কোনো প্রতিরোধ পদ্ধতি বা চিকিত্সা না আসা পর্যন্ত মানুষকে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনেই অভ্যস্ত হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। সেলক্ষ্যে বিশেষজ্ঞগণ যেসব পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন তা মানুষকে আবারও ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি ও পরিবেশের দ্বারে। করোনাকালীন সময়ে মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শের পাশাপাশি নিরাপদ সুযোগ থাকলে নির্মল পরিবেশে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর পরামর্শও দিচ্ছেন অনেকেই।
কোভিড-১৯ মানবজাতিকে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়ে গেল: পরিবেশের প্রতি এবং অন্যান্য জীবের প্রতি সদয় না হলে এবং সীমা লঙ্ঘন করলে চরম বিপর্যয় অনিবার্য। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া মানবজাতি বাস্তবে প্রকৃতির কাছে অতি ক্ষুদ্র আর দুর্বল; মানুষের সহায়তা প্রকৃতির প্রয়োজন নেই, প্রকৃতি নিজেই নিজের নিয়ন্ত্রণকারী; কিন্তু টিকে থাকতে হলে প্রকৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে সহাবস্থান তৈরি করে মানিয়ে চলতে হবে মানুষকেই। পরিবেশের প্রতি নিদারুণ অবহেলা যেমন বিপন্ন করেছে সভ্যতাকে, ঠিক তেমনই এ সভ্যতাকে টিকে থাকতে হলে এখনই সময় নতুন করে ভাবনার, নতুন করে পথচলা নির্ধারণের। করোনার সময়কালে ও করোনা-পরবর্তীকালে আমরা পরিবেশের সম্ভাব্য ক্ষতি এড়িয়ে কতটা পরিবেশ বান্ধব জীবনের পথে চলব সে সিদ্ধান্ত নেবার এখনই সময়। এ সিদ্ধান্ত শুধু একা রাষ্ট্রের নয়, আপনার, আমার—সবার। তাই আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পরিবেশবান্ধব জীবনের পথচলা হোক সবার অঙ্গীকার।
n লেখকত্রয় :বন সংরক্ষক, যশোর সার্কেল, যশোর। শিক্ষক, ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
