অনিতা রানী সাহা
সম্প্রতি করোনা ভাইরাস মানুষকে শারীরিকভাবে সংক্রমণ ছাড়াও প্রভাবিত করছে মানসিকভাবে। এ মহামারির কারণে দীর্ঘসময় কোয়ারেন্টাইন, লকডাউনসহ বিভিন্ন অনিশ্চয়তায় মানবমনে সৃষ্টি হচ্ছে মানসিক বিশৃঙ্খলা। বেশির ভাগ সময় টিভি ও অনলাইন মিডিয়ার সংবাদ প্রচারণা দখল করে রাখছে মস্তিষ্কের বিশেষ একটি অংশ। ফলে বাড়ছে মানসিক চাপ, অস্থিরতা ও অবসাদ।
করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি যেমনই হোক আপনাকে হতে হবে নিজের মনের ভালো বন্ধু। নিজে নিজেকে সহযোগিতা করাই এ সময় সর্বোত্তম সহযোগিতা। কীভাবে করবেন মনের পরিচর্যা? করোনা ভাইরাস-সম্পর্কিত যে বিষয়গুলো জানার তা ১০-১৫ মিনিটেই জানতে পারেন। এর বেশি সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবেই দখল করে রাখে মস্তিষ্ককে। নিজেকে প্রশ্ন করুন :বারবার করোনা ভাইরাস-সম্পর্কিত সংবাদ দেখা কি আপনার নতুন অভ্যাস এবং এটি কি আপনার পছন্দ? এটা কি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে? মনের পরিচর্যার উত্তর নিজেই পেয়ে যাবেন।
করোনা ভাইরাস নিয়ে যাদের অতিরিক্ত মাত্রায় দুশ্চিন্তা হয় তারা দুশ্চিন্তার জন্য দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় ও জায়গা বেছে নিয়ে ১০-১৫ মিনিট সময় দুশ্চিন্তা করার জন্য বরাদ্দ রাখতে পারেন। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্তদের জন্য এটি কার্যকরী হবে। কারণ নিয়মিত অনুশীলনে এই কৌশল আপনাকে শেখাবে চিন্তা স্বয়ংক্রিয় হলেও দুশ্চিন্তার ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ আছে।
আপনার কাছের ব্যক্তিটিকে বলতে পারেন মনের অনুভূতির কথা। চিকিত্সা মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ভেন্টিলেশন’ বলে একটি শব্দ আছে। মনের জমানো যেসব কথা ব্যস্ততার কারণে এতদিন মনেই চাপা পড়ে ছিল, সেগুলো কাছের বা আস্থাভাজন ব্যক্তির সঙ্গে করে নিতে পারেন ভাগাভাগি। অর্থাত্ একটা ঘরে অনেক দিন কোনো আলো-বাতাস না ঢুকলে, জানালা-দরজা সব বন্ধ থাকলে কেমন লাগবে? আর একদিন ঐ ঘরটার জানালা-দরজা সব খুলে দিলে কেমন লাগবে? নিশ্চই অনেক প্রশান্তি আসবে। নিজের এই আবেগগুলো প্রকাশ করে ফেলার নামই হচ্ছে ‘ইমোশনাল ভেন্টিলেশন’। তাতে নিজেকে অনেক হালকা ও প্রফুল্ল লাগবে।
করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি তৈরি করেছে প্রাত্যহিক জীবনের নতুন রুটিন। নতুন রুটিনটাও আবার আপনার উদ্বিগ্নতার কারণ। আপনি নিজেই রুটিনটা স্বাভাবিক করে নিতে পারেন। কীভাবে? যাদের ঘুমের সমস্যা হচ্ছে তাদের—একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া (ঘুম না এলেও একই সময়ে বিছানায় থাকা), ঘুমানোর আগে ঘরের পরিবেশটি ঘুমের উপযোগী করে ফেলা। সেলফোন, বই বিছানা থেকে দূরে রাখা, ঘুমের আগে ক্যাফেইন-সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। এক দিনেই কাজ হবে এরকম ফলাফলের প্রত্যাশা না করে প্রক্রিয়ার অনুশীলনে আগ্রহ তৈরি করতে পারেন, যা আপনার জন্য ফলপ্রসূ হবে। ঘরে বসে অফিসের কাজ যাদের করতে হয়, তারা মনোযোগ বিচ্ছিন্ন না হয় এরকম স্থান নির্ধারণ করে নিতে পারেন।
করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি যদি আপনাকে অবসাদে ফেলে, করে দেয় হতবিহ্বল—সেটাও মেনে নিন। নিজেকে বলুন, ‘ঠিক আছে এরকমটা হতেই পারে’। এর মাধ্যমে অবসাদ ও খাপ খাওয়ানোর এক নতুন ভারসাম্য শিখবেন। গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ করতে পারছেন না বলে নিজেকে দোষী ভাবার কিছু নেই বরং আপনি পরিস্থিতির স্বাভাবিক মোকাবিলা করে যাচ্ছেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ, এজন্য নিজেকে পুরস্কৃত করুন।
যাদের পরিবার করোনা ভাইরাস আক্রান্ত তাদের কষ্টের ভার স্বাভাবিক মানুষের থেকে বেশি, তাতে সন্দেহ নেই। একটা টানেলের শেষ প্রান্তে দিনের আলো থাকবে, এ ভাবনা থাকা ভালো। কিন্তু সাহসী ভাবনা হলো সেই আলো টানেলের অপরদিক থেকে আসা ট্রেনের আলোও হতে পারে। পারসোনালিটি সাইন্স বলছে, নিরাশা সব সময় নেতিবাচক চিন্তা নয় বরং ভবিষ্যতের ফলাফল কী রকম হতে পারে তারই ভাবনা। এটা আমাদের শেখায় আসলে প্রচেষ্টার ঘাটতি কোথায় রয়েছে আর কোথায় মনোযোগ দিতে হবে। করোনা আক্রান্ত হওয়া কোনো দোষ বা পাপ নয়, বরং সাহসিকতা এটাই যে, বাস্তবতা স্বীকার করে নেওয়া। টানেলের অপরদিক থেকে আসা আলোটি আসলে ট্রেনেরই আলো, তাহলে সামনে চলার প্রচেষ্টাগুলো সাবলীল ও গোছানো হবে।
প্রচেষ্টা ও অনুশীলন যুগান্তকারী দৃষ্টান্তের সৃষ্টি করে। এসব কৌশল নিয়মিত অনুশীলনে একদিকে যেমন নিজের মনোবল দৃঢ় হবে, অন্যদিকে সংকট মোকাবিলায় বৃদ্ধি করবে মানসিক দক্ষতা।
n লেখক :চিকিত্সা মনোবিজ্ঞানী,
রিজিওনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার,
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়
