করোনা-পরবর্তী বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতি

আপডেট : ০৭ জুন ২০২০, ২১:৪৭

নিউটন মজুমদার

করোনা ভাইরাস জীবনের ঝুঁকি তৈরির পাশাপাশি মানুষের অর্থনীতির মেরুদণ্ডে মারাত্মক আঘাত হেনেছে। ইতোমধ্যে বিশ্বে আক্রান্তে শীর্ষে থাকা দেশগুলো তাদের দেশে লকডাউন শিথিল করছে বা করতে বাধ্য হয়েছে এবং খুব শিগিগরই শর্ত সাপেক্ষে তাদের দেশের বিমান চলাচল ও পর্যটন খাত উন্মুক্তের ঘোষণাও দিয়েছে। এ থেকেই ধারণা পাওয়া যায় এই অচলাবস্থা যে কোনো দেশের অর্থনীতির ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করছে। ঝুঁকি জেনেও লকডাউন শিথিল করছে ইতালি এবং সে দেশের প্রধানমন্ত্রী জুজেপ্পেকন্তে বলেছেন, ‘প্রতিষেধক আবিষ্কার পর্যন্ত বসে থাকাটা তাদের পক্ষে কুলিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।’ যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে লকডাউনের প্রতিবাদে প্রতিনিয়ত বিক্ষোভ হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা (আইএলও)-এর তথ্যমতে, ‘করোনা ভাইরাসের প্রভাবে পৃথিবীতে প্রায় ৩৩০ কোটি মানুষের কাজ হয়তো পুরোপুরি নয়তো আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া এর প্রভাবে বিশ্বের প্রায় ১৬০ কোটি মানুষ বেকার হয়ে পড়তে পারেন, ইতোমধ্যে চাকরি হারাতে শুরু করেছেন মেহনতি মানুষ।’ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ধারণা করছে, ‘এ সব লকডাউনের ফলে এ বছর বিশ্ব অর্থনীতি তিন শতাংশ সংকুচিত হবে।’ ইতোমধ্যে সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের তেল নির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো কর্মসংস্থান সংকুচিত করা শুরু করেছে। সৌদি অর্থনীতির ধস ঠেকাতে সেখানে সরকার বিভিন্ন খাতে প্রায় তিন গুণ কর বৃদ্ধি করছে এবং সংকুচিত করা হচ্ছে অভিবাসী শ্রমিকদের শ্রম বাজার। ফলে অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের রেমিট্যান্স আয়ের ওপর এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে, তত্সঙ্গে বেকার হবেন অসংখ্য অভিবাসী শ্রমিক। সম্প্রতি আমেরিকার মতো বৃহত্ অর্থনীতির দেশ তাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ৩০০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে ৩০০ বছরে সবচেয়ে বড়ো পতন হয়েছে, সেখানে চিরতরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য দেশি-বিদেশি ক্ষুদ্রব্যবসায় প্রতিষ্ঠান।

করোনা পরবর্তী বিশ্বে যে কোনো দেশের জন্য সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার। কারণ দীর্ঘ সময় বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তাদের মূলধন সংকট হবে মারাত্মক, ফলে চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। বড়ো বড়ো শিল্প প্রতিষ্ঠান শ্রমিক ছাঁটাই করে স্বল্প পরিসরে তাদের উত্পাদন আরম্ভ করে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করবে। ফলে কমে যাবে কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেতে আরম্ভ করবে। যার প্রভাব সরাসরি পড়বে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের ওপর; তাদের বৈদেশিক আয় হ্রাস পাবে, বৃদ্ধি পাবে বেকারত্ব। তৃতীয় বিশ্বের এসকল দেশের অসংখ্য উদ্যোক্তার স্বপ্নভঙ্গ হবে। থেমে যেতে পারে এদেশগুলোর সব মেগা প্রকল্প! এছাড়া পর্যটন ও এয়ার লাইন্স শিল্প স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগবে। পৃথিবীতে প্রায় প্রতি ১০ জন মানুষের মধ্যে এক জন মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের মতে, ‘এ শিল্পের প্রায় ৫ কোটি মানুষ তাদের জীবিকা হারাতে পারে’। মারাত্মক ছোঁয়াচে এই রোগের কারণে মানুষ ভ্রমণ বা চলাচল সীমিত বা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন, এখন তাদের আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাটা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যত্!

অর্থনীতির ধাক্কায় টালমাটাল বিশ্বকরোনা যুদ্ধের লাগাম টানতে না টানতেই উদীয়মান বাণিজ্যকিং চীনকে হয়তো বিশ্ব রাজনীতির রাহুগ্রাসে পতিত হতে হবে। কারণ হিসেবে হয়তো চীনের গবেষণাগারে করোনা ভাইরাস তৈরির অভিযোগ তোলা হবে। তবে এ অভিযোগ হতে চীন হয়তো পরিত্রাণ লাভ করবে, যেহেতু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে ‘ভাইরাসটি মানব সৃষ্ট নয়, প্রাকৃতিক’। ইতিমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কয়েক বার সরাসরি গণমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। অস্ট্রেলিয়াসহ পশ্চিমা বিশ্বের বেশ কিছু দেশ আমেরিকার পক্ষে তাদের অবস্থান সুস্পষ্টের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছে। অন্য দিকে চীন বরাবর আমেরিকার এ অভিযোগ অস্বীকার করছে।

কিন্তু অপর পরাশক্তি রাশিয়া এ বিষয়ে এখনো তাদের কোনো অবস্থান জানান  দেয়নি। অবশ্য করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাপী সংক্রমণের শুরুর দিকে আমেরিকা অভিযোগ উত্থাপন করেছিল যে রাশিয়ার সঙ্গে সংযোগ আছে এমন কিছু সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হতে ‘আমেরিকা করোনা ভাইরাস চীন ও বিশ্ব ব্যাপী ছড়াচ্ছে’ মর্মে ‘ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার ইরানের বিরুদ্ধে তাদের একটি ফ্লাইটের মাধ্যমে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর অভিযোগ করা হয়েছে। এভাবেই বিশ্বব্যাপী ‘করোনা বিস্তার ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ বিস্তৃত হচ্ছে, যার পরিণতি মোটেই সুখকর হবে না। যা হয়তো করোনা পরবর্তী বিশ্বরাজনীতিতে দুটো বলয় সৃষ্টির সুস্পষ্ট পূর্বাভাস।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, আমেরিকা যদি এই করোনা ভাইরাসকে ‘চীনা বা উহানভাইরাস’ হিসেবে প্রতিপন্ন করার মানসিকতায় থাকে, তাহলে করোনা পরবর্তী বিশ্বরাজনীতিতে ক্ষমতার নতুন বলয় সৃষ্টি হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। যার পরিণামে বিংশশতাব্দীর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের স্নায়ু যুদ্ধের মতো একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব ও হয়তো এক নয়া স্নায়ু যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করবে, যার নেতৃত্বে থাকবে আধুনিক বিশ্বের দুই বাণিজ্য সম্রাট ও পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। ফলশ্রুতিতে আবারও কাঁদতে হবে করোনায় বিধ্বস্ত বিশ্ববাসীকে!

n লেখক :বিএসএস (সম্মান), এমএসএস, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ