ল্যাটিন ভাষায় আইনশাস্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয়তম প্রবচনের মধ্যে একটি হল 'ইগনোরেনশিয়া জুরিস নন এক্সকিউস্যাট' বা ইগনোরেনশিয়া লেজিস নেমিনেম এক্সকিউস্যাট' যার অর্থ 'আইনের অজ্ঞতা কাউকে ছাড় দেয় না'।
এটি একটি আইনি নীতি যা এই আইনটিকে অবহিত করে যে, কোনও ব্যক্তি কেবল মাত্র আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা থাকার কারণে আইন লঙ্ঘনের দায় থেকে অব্যাহতি পেতে পারে না। অন্যথায় ফৌজদারি বা দেওয়ানী মোকদ্দমার অপরাধে অপরাধী যে কেউই 'আইনের বিষয়বস্তু জানা ছিল না' এমন দাবি করে দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যেতে পারতো।
রাষ্ট্রের কার্যক্রমের প্রতিটি ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে প্রতিটি আইন সম্পর্কে সচেতন হওয়া সাধারণ মানুষ বা যথেষ্ট আইনি প্রশিক্ষণ থাকা কারো পক্ষে সম্পূর্ণভাবে জানাও অসম্ভব। তবে, দেশের প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের জন্য আইন সম্পর্কে কিছুই না জানার চেয়ে কিছুটা ধারনা রাখা ভাল। যেহেতু 'অজ্ঞতা কোন অজুহাত নয়' এবং ইচ্ছাকৃত অন্ধত্ব দোষক্ষালন নির্মূলের ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে না। সুতরাং, প্রাথমিক পর্যায় থেকেই আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় সমাজে নিয়মিত জীবিকা নির্বাহের স্বার্থে প্রয়োগ যোগ্য 'মৌলিক' আইনগুলির ধারণাটি চালু করা একটি দুর্দান্ত উদ্যোগ হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, আইনের কয়েকটি সাধারণ ক্ষেত্র রয়েছে যা পাঠ্য ক্রমে চালু করা এবং অধ্যয়ন করা যেতে পারে, যেমন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এর সংবিধানের উল্লেখিত 'মৌলিক মানবাধিকার' প্রতিটি নাগরিককে নিজের মৌলিক অধিকার বুঝতে সহায়তা করবে এবং যদি এই মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন বা অনিষ্ট করা হয় সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণে সচেতনতা সৃষ্টি করবে। 'রাস্তা সুরক্ষা, 'পরিবহন' এবং 'ট্রাফিক আনি; সম্পর্কিত আইনগুলো ট্র্যাফিক নিয়ম এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় আখতে এবং দুর্ঘটনা বা গাফিলতি বা অসাবধানতা হ্রাস করতে সহায়তা করবে। পাশাপাশি 'সাইবার অপরাধ', 'ডিজিটাল নিরাপত্তা' এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সামাজিক প্লাটফর্মের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কিত আইনগুলো নিয়ে ধারণা এ সকল ক্ষেত্র সংশ্লিষ্ট অপরাধ হ্রাসে সহায়ক হবে এবং ইন্টারনেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, অপহরণ, প্রতারণা বা রাষ্ট্রদ্রোহিতা ইত্যাদি অপরাধের বিষয়ে মৌলিক 'ফৌজদারি আইন' এর জ্ঞান এবং শাস্তি ও জরিমানা সম্পর্কে ধারণা অপরাধ হ্রাসে সহায়তা করবে। যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন, মাদকদ্রব্য সম্পর্কিত আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ক আইন, সন্ত্রাস বিরোধী বিভিন্ন আইনগুলোর প্রাথমিক ধারণা থাকলে নতুন প্রজন্মকে নিয়ম মেনে ও নিষ্ঠার সঙ্গে টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে সুন্দর সমাজ গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। যা সমাজে ইতিবাচক সামষ্টিক উন্নয়ন সুনিশ্চিত এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রশাসনের কাজ সহজ করবে।
এই দৈনিক সাধারণ আইনগুলি, 'প্রাথমিক শিক্ষা' যেমন ৫ম-৮ম ক্লাস হইতে মাধ্যমিক (এসএসসি/ও'লেভেল) এবং উচ্চতর (এইচএসসি) শিক্ষার পাঠ্যক্রমে বাংলা সহ অন্যান্য আবশ্যক বিষয়গুলির সঙ্গে একত্রে যুক্ত করা যেতে পারে। ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থার 'এ-লেভেল' পর্যায়ে এখন আইন বিষয়টি যুক্ত রয়েছে।
যে কোন কাঠামোর উপরের অংশ মজবুত থাকতে হলে প্রয়োজন মজবুত ভিত্তি। তেমনি ভাবে প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে সাধারণ মৌলিক আইনের শিক্ষা প্রত্যেককে সামাজিক বিকাশে ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে। পাঠ্য পুস্তকের মাধ্যমে নাগরিককে প্রাথমিক পর্যায়ে থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত আইনের শিক্ষা দেয়া অবাস্তব বা অযৌক্তিক চিন্তা নয়।
শুধু উচ্চ মাধ্যম পর্যায় নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও এই আইনগুলো সম্পর্কিত জ্ঞান সকলের জন্য সহায়ক হবে। সেই সঙ্গে এই আইনের জ্ঞান প্রত্যেককে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলকে এবং পেশাদার জীবনে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
শিক্ষা একটি সমাজের মেরুদণ্ড এবং সমাজ পরিচালিত হয় আইন দ্বারা। সুতরাং, যদি শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার এবং সমাজের প্রতি কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয় তবে তা হবে সমাজের প্রান্তিক পর্যায় থেকে সৃষ্টি হওয়া সচেতনতা। যার মাধ্যমে সচেতন হতে পারে তার অভিভাবক। এভাবে এগিয়ে গেলে সেদিন বেশি দূরে নয় যখন মেধা, জ্ঞান ও মানবিক আত্মবিশ্বাসী বলিয়ান হয়ে গড়ে উঠবে এক তরুণ প্রজন্ম যাদের হাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
লেখক: ঢাকা বারের শিক্ষানবিশ আইনজীবী এবং 'গভর্নেন্স চ্যালেঞ্জ ২০২০'-এর প্রধান সমন্বয়ক
ইত্তেফাক/আরএ
