বিশ্ব নেতৃত্বে চ্যালেঞ্জের মুখে যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ০৮ জুন ২০২০, ২১:৫৮

গত তিন দশক বিশ্বের একক কর্তৃত্বের অধিকারী যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান সময়ের মতো এত সংকটকাল সময় আর কখনো অতিক্রম করেনি। একদিকে বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ অর্থাত্ অদৃশ্য ভাইরাসের কাছে নাস্তানাবুদ খোদ যুক্তরাষ্ট্র, অপরদিকে বর্ণবাদের শিকার হয়ে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে কারফিউ উপেক্ষা করে চলছে তীব্র প্রতিবাদ। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে গলা ফাটানো খোদ যুক্তরাষ্ট্রে আজও সবচেয়ে বড়ো প্রতিবাদ। এ যেন ১৯৬৮ সালে মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দীর্ঘদিন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের জীবন বিলিয়ে দিলেও যুক্তরাষ্ট্র বর্ণবাদের অভিশাপ থেকে কখনো মুক্ত হতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের ঘরোয়া বর্তমান পরিস্থিতি এবং করোনা ভাইরাসের ফলে আগামীতে ভূ-রাজনীতি, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সুসম্পর্ক, বিশ্বে অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ, কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক, সামরিক শক্তি এবং সর্বোপরি একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের নেতৃত্বে বড়ো ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমান বিশ্ববাসী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে সংকটকাল সময় অতিক্রম করছেন। যার নীতিবাচক প্রভাবে এরই মধ্যে বাড়তে শুরু করেছে রাজনৈতিক বিদ্বেষ, বর্ণবৈষম্য, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক ধসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। যুক্তরাজ্যে বেড়েছে জাতিগত বিদ্বেষ। এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৪ লক্ষাধিক। যার মধ্যে বিশ্বের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রে মারা গেছে লক্ষাধিক এবং আক্রান্তের সংখ্যা বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ। যা যেকোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ।

মার্কিন বুদ্ধিজীবী এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক নোয়াম চমস্কি মার্কিনীদের ব্যাপক প্রাণহানি এবং লক্ষাধিক মানুষকে হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়ার পেছনে সরাসরি ট্রাম প্রশাসনকে দায়ী করেছেন। অদৃশ্য ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে ত্বরিত গতিতে বাড়ছে বেকারত্বের হার। এরই মধ্যে বেকারত্ব ৩ কোটি ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে। যা শতকরা ১৪.৭ ভাগ। গত তিন দশকের মধ্যে বর্তমানে যা সর্বোচ্চ। মার্কিন গবেষকদের ধারণা— করোনা-পরবর্তীকাল চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে আগামীতে বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব অনেকখানি খর্ব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্যোগে নোভেল করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে এবং টিকা আবিষ্কারের নামে আন্তর্জাতিকভাবে ৮১০ কোটি ডলারের তহবিল গঠন করা হয়েছে। যার ৪৪০ কোটি ডলার শুধু টিকা আবিষ্কার গবেষণায় ব্যয় হবে। এতে ইউরোপসহ ৪০টি দেশ এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলেও যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া অংশগ্রহণ করেনি। যা তাদের করোনা-পরবর্তী ইউরোপের মিত্র দেশগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রকে বড়ো খেসারত দিতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে। অপরদিকে বর্তমানে দ্বিতীয় অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন করোনাকালে বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার মাধ্যমে সুদূর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

চীনের উহান প্রদেশকে কোভিড-১৯-এর উত্পত্তিস্থল হিসেবে ধরে নেওয়া হলেও সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে অদৃশ্য ভাইরাস যুদ্ধে ১৪০ কোটি কমিউনিস্টশাসিত চীন জয়ী হয়ে বিশ্বকে অলিখিতভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রয়োজনে বিভিন্ন দেশে বাড়িয়ে দিয়েছে সহযোগিতার হাত। এরই মধ্যে চীনে অদৃশ্য ভাইরাস সাফল্যের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণের ফলে স্বাভাবিক হতে শুরু করে চীনাদের শক্তিশালী অর্থনীতি। যার ফলে করোনা এবং পরবর্তী সংকটকালে চীন  বিশ্ব অর্থনীতিতে অতিগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়া চীনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা মহাযজ্ঞ ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ কর্মসূচির আওতায় ছয়টি অর্থনৈতিক করিডোরের মাধ্যমে ৬০টির অধিক দেশের আওতায় বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার মাধ্যমে ভবিষ্যত চীন যুক্তরাষ্ট্রকে  পেছনে ফেলে বিশ্ববাণিজ্য দখল করবে বলে উল্লেখ করা যেতে পারে। অপরদিকে, ভবিষ্যতে বিশ্ব নেতৃত্বের অন্যতম দাবিদার রাশিয়া একবিংশ শতাব্দীর সামরিক শক্তি বিবেচনায় নতুনভাবে আবির্ভাব হতে পারে। রাশিয়া সিরিয়া-যুদ্ধে  সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এরই মধ্যে তার শক্তির জোগান দিতে শুরু করেছে। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার শক্তি নতুনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে আইএস নিরসনে এবং বৈশ্বিক জঙ্গি দমনে রাশিয়ার ভূমিকা বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। যার ফলে আগামীতে বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে রাশিয়া প্রস্তুত। বর্তমান এই সংকটকালে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম প্রশাসন ঘরোয়া রাজনীতিসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্লান্তিকর সময় অতিক্রম করছে। মূলত, এই সংকটকালে বিশ্বের নেতৃত্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন ট্রাম্প প্রশাসন। বর্তমান করোনা পরিস্থিতি প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর স্প্যানিশ-ফ্লুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যেখানে বিশ্বে অস্ট্রিয়া-জার্মানি নেতৃত্ব হারিয়ে উত্থান ঘটেছিল ফ্রান্স-ব্রিটেনের।

বিশ্বব্যবস্থা তত্ত্বের অন্যতম প্রবক্তা ইমানুয়ের ওয়ালার স্টেইলনের মতে, প্রতি ৫০ বছরে বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। বলতে দ্বিধা নেই, বিশ্বে গণতন্ত্রের আদর্শ যুক্তরাষ্ট্রের ঘরোয়া রাজনীতিতে বাড়ছে পারস্পরিক রাজনৈতিক হিংসা-বিদ্বেষ, বর্ণবৈষম্য এবং সাম্প্রদায়িকতা। যা আগামীর ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড়ো ধরনের অশনি সংকেত। বর্ণবৈষম্যের সর্বশেষ নিকৃষ্ট উদাহরণ জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ড। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্সের তথ্যমতে, ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৮ হাজার মার্কিনীকে হত্যা করেছে পুলিশ। যার মধ্যে শ্বেতাঙ্গের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ তিনগুণ বেশি। এমনকি তারা পর্যাপ্ত মৌলিক অধিকার  থেকে বঞ্চিত। করোনা ভাইরাস-পরবর্তীকাল বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বব্যবস্থায় অনেক কিছু পরিবর্তন আসবে তা নিশ্চিত। এই অদৃশ্য ভাইরাস-পরবর্তী বিশ্বরাজনীতির  মঞ্চে বড়ো পরিবর্তন আসাটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। সুতরাং আগামীদিনে সময় বলে দিবে কে দখল করবে বিশ্বরাজনীতির মুকুট?

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া