বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত সনাক্ত হয় মার্চের ৮ তারিখে। এরপর কেটে গেছে তিন মাস। জুন মাসের ৮ তারিখের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মোট রোগী ৬৮ হাজার ৫০৪ জন। ১৪ হাজার ৫৬০ জন ব্যক্তির সুস্থ হওয়ার বিপরীতে মৃত্যু বরণ করেছে ৯২৩ জন। অর্থাৎ বর্তমানে দেশে প্রায় ৫৩ হাজার ২১ জন সক্রিয় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী রয়েছে এবং সংখ্যাটি ঊর্ধ্বমুখী। তবে সংক্রমণের পরিমাণ, হার এবং চিত্র দেশের সর্বত্র একরকম নয়।
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের আইইডিসিআর-এর প্রদত্ত দৈনিক জেলা ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় দেশের এক এক জেলায় সংক্রমণের অবস্থা এক এক রকম। কিছু এলাকায় মোট সংক্রমণ অনেক কম হলেও ঊর্ধ্বমুখী আবার কিছু এলাকায় সংক্রমণ সংখ্যা বেশি হলেও অপেক্ষাকৃত বেশি সংক্রমণ সেইসব এলাকা পার করে ফেলেছে।
দেশে করোনা সংক্রমণকারী রোগীর সংখ্যা ৫০০ পার করেছে এমন জেলা ১১টি। এই ১১টি জেলাতেই মোট সংক্রমণের প্রায় ৫৫% রোগী পাওয়া যায়। এই ১১ জেলাকেই বাংলাদেশের করোনা সংক্রমণের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

চিত্র: ৫০০ বা তার বেশি করোনা আক্রান্ত জেলাসমূহের ম্যাপ ও তথ্য
ম্যাপটি থেকে আরেকটি তথ্য পরিলক্ষিত হয় মূল কেন্দ্র যে ১১টি জেলা তার দশটি বাংলাদেশের পূর্বপাশে। একমাত্র রংপুর জেলাটি দেশের পশ্চিমে।
প্রতি জেলায় প্রতি ১,০০,০০০ মানুষে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা বিশ্লেষণে গেলে উপরের চিত্রটি আরো পরিষ্কার হয়।

চিত্র: প্রতি লাখে করোনা আক্রান্তের ম্যাপ
প্রতি লাখে আক্রান্তর বিবেচনায় মূল তিনটি জেলা ঢাকা (১৫০), নারায়ণগঞ্জ (৭২) এবং মুন্সিগঞ্জ (৫৭) বাংলাদেশের একেবারে কেন্দ্রে। এর পশ্চিমের বিভাগগুলো অর্থাৎ রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের জেলাগুলোতে প্রতি লাখে আক্রান্তের সংখ্যা পশ্চিমের বিভাগগুলো অর্থাৎ ময়মনসিংহ, সিলেট এবং চট্টগ্রামের জেলাগুলো থেকে তুলনামূলকভাবে বেশ কম। কেন্দ্রের একেবারে নীচে অবস্থিত নদীবেষ্টিত বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যাও বেশ কম।
প্রতি লাখে ৫ জন বা এর থেকে থেকে কম আক্রান্ত মোট জেলা রয়েছে ২৩ টি। যার মাঝে মাত্র একটি জেলা মৌলভীবাজার দেশের পশ্চিম পাশে, বাকি ২২ জেলাই দেশের পূর্বপাশে। প্রতি লাখে ৫ জনের থেকে বেশি এবং ১০ জনের থেকে কম আক্রান্ত জেলা সংখ্যা ২৪টি। এর মাঝে ১৩ টি জেলা দেশের পশ্চিম পাশে বাকি ১১টি পূর্বপাশে।

চিত্র: প্রতি লাখে সংক্রমিত বনাম জেলা সংখ্যা
প্রতি লাখে ১০ জনের থেকে বেশি এবং ২০ জনের থেকে কম আক্রান্ত এমন জেলা সংখ্যা ৯টি। জামালপুর, শরিয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুর ঢাকা বিভাগে, রংপুর জেলা রংপুর বিভাগে, কুমিল্লা ও ফেনী চট্টগ্রাম বিভাগে, রাজশাহী বিভাগে জয়পুরহাট জেলা এবং সিলেট বিভাগে সিলেট জেলা। বাকি ৫টি জেলা গোপালগঞ্জ, নোয়াখালী, গাজীপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের প্রতি লাখে সংক্রমণ সংখ্যা যথাক্রমে ২১, ২২, ২৮, ৩২ ও ৩৩ জন করে।
তিনমাসের তথ্য যেভাবে পুরো দেশের চিত্র দেখায় বিগত ১৪ দিনে নতুন আক্রান্তের তথ্য বিশ্লেষণ করলে চিত্রে বেশ কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।

চিত্র: বিগত ১৪ দিনে জেলা ভিত্তিক মোট আক্রান্তের ম্যাপ ও তথ্য
বিগত ১৪ দিনের তথ্য বিশ্লেষণে গেলে দেশের পূর্ব পশ্চিমের আক্রান্তের সংখ্যার পার্থক্য বেশ কমে গেছে দেখা যায়। ঈদ এবং তার পরবর্তী সময়ে মানুষের চলাচলের সাক্ষ্য বহন করে এই ম্যাপটি। কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী বেশ অনেকগুলো জেলাগুলোতেই নতুন সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়। এ সময় খুব দ্রুত চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার উপরের দিকে চলে আসে। কিছুদিনের আগের ভয়াবহ কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জকে পেছনে ফেলে এখন দ্বিতীয় স্থানে চট্টগ্রাম।
এমতাবস্থায় প্রতিটা জেলায় মোট সংক্রমণের কত শতাংশ বিগত ১৪ দিনে আক্রান্ত হয়েছে তা জানতে গেলে বেশ অবাক করা তথ্য পাওয়া যায়। ফেরিঘাট আর সদরঘাটে স্বাস্থ্যবিধি না মানার যে রিপোর্টগুলো নিয়মিত দেখা যায় তার প্রমাণ নিচের চিত্রে পাওয়া যায়।

চিত্র: বিগত ১৪ দিনে মোট সংক্রমণের শতকরা হার
ভোলা জেলায় মোট সংক্রমিত ব্যক্তি ৬৯ জন যার মাঝে ৫৫ জনই বিগত ১৪ দিনে আক্রান্ত। শুরুর দিকে অপেক্ষাকৃত কম আক্রান্ত জেলাগুলোর তথ্য বর্তমান সময়ে এমন। নীচের গ্রাফে দেখা যায় বাগেরহাট, ভোলা, সিরাজগঞ্জ, মেহেরপুর, খুলনা জেলাগুলোতে মোট সংক্রমণ কম থাকলে এবং বেশ পরে সংক্রমণ শুরু হলেও এখন গ্রাফ উর্ধ্বমুখী। এখনি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের সাহায্যে এ জায়গাগুলো নতুন কেন্দ্র হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

চিত্র: পাঁচ জেলায় উর্ধ্বমুখী সংক্রমণ
বিগত ১৪ দিনে মোট আক্রান্তের শতকরা হারের তালিকার উপরের দিক যেমন শঙ্কার তথ্য দেয় তেমনি তালিকার নীচের দিকের জেলাগুলো দেয় আনন্দের সংবাদ। চুয়াডাঙ্গা, হবিগঞ্জ, যশোর ও মৌলভীবাজার জেলার আক্রান্তের মোট সংখ্যা যথাক্রমে ১১১, ১৭৫, ১৬৫ ও ১১৬ হওয়ার পরেও সংক্রমণ হার নিম্নমুখী।

চিত্র: ৪ জেলায় নিম্নমুখী সংক্রমণ
আবার এমনও রেকর্ড পাওয়া যায় কোন কোন জেলার ক্ষেত্রে তারা তাদের সংক্রমণ গ্রাফের সর্বোচ্চ বিন্দু পার হয়ে এসে পুনরায় নতুন সংক্রমণের দিকে উর্ধ্বমুখী। যেমন: কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা।

চিত্র: ২ জেলার পুনরায় উর্ধ্বমুখী সংক্রমণ গ্রাফ
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে , বর্তমানে বাংলাদেশের প্রতিটা জেলায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হলেও সংখ্যার বিচারে তা বেশ আলাদা। যেহেতু বাংলাদেশ তার সংক্রমণের ৯০ দিন অতিক্রম করে ফেলেছে এবং এ দীর্ঘ সময়ের সংক্রমণ তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে; তাই তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একমাত্রিক কোন তথ্য ব্যবহার না করে বরং আমাদের দেশের ক্ষেত্রে প্রাপ্ত তথ্যকে বহুমাত্রিক পরিবর্তনশীল তথ্যের আলোকে বিশ্লেষণ করে নীতি নির্ধারকরা তাদের সিদ্ধান্ত নিলে বেশ কার্যকরী উপায়ে করোনা মোকাবেলা সম্ভব।

লেখক: বিএসসি, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, বুয়েট।
ইত্তেফাক/আরএ
