‘ভোটের আগের রাতেই ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরে রাখা হয়েছে’- জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভোটগ্রহণ পরবর্তী এই অভিযোগের পক্ষে বাস্তবভিত্তিক কোনো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়নি। বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কোনো প্রার্থীও ভোটেরদিনে দেশের কোথাও কোনো কেন্দ্রে তথ্য-প্রমাণসহ এমন অভিযোগ দেখাতে পারেননি। ফলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এ ধরনের অভিযোগের বাস্তবতা এবং সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে।
৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের কয়েকদিন আগে থেকেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের প্রার্থী ও পোলিং এজেন্টদের সকাল-সকাল কেন্দ্রে গিয়ে স্বচ্ছ ব্যালটবাক্স খালি আছে কি-না তা পরীক্ষা করে দেখার নির্দেশনা বা পরামর্শ দিয়েছিল। তবে দেশের ৪০ হাজার ১৮৩টি কেন্দ্রের কোথাও ঐক্যফ্রন্টের কোনো প্রার্থী বা তার এজেন্ট ব্যালটবাক্স পরীক্ষা করেছেন, অথবা পরীক্ষা করে বাক্সে আগে থেকে সিলমারা ব্যালট পেপার দেখেছেন- এমন কোনো অভিযোগ করতে পারেননি। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলাকালে ঐক্যফ্রন্টের কোনো প্রার্থী প্রমাণসহ এরকম কোনো অভিযোগ করতে সক্ষম হননি।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যম কর্মী ও রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা নিজ নিজ আসনে শতাধিক ভোটকেন্দ্রের সবগুলোতে সম্ভব না হলেও অন্তত ২/৩টা কেন্দ্রে গিয়ে ভোটগ্রহণ শুরুর আগে স্বচ্ছ ব্যালটবাক্স পরীক্ষা করতে পারতেন। অথবা প্রার্থীদের এজেন্টরাও কেন্দ্রে উপস্থিত থেকে বাক্স পরীক্ষা করতে পারতেন। কিন্তু তারা সেটি পরীক্ষা করে আগে থেকে সিলমারা ব্যালট ভর্তি বাক্স দেখেছেন বলে কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ঐক্যফ্রন্টের কোনো প্রার্থী বা তার এজেন্ট যদি স্বচ্ছ ব্যালটবাক্স পরীক্ষা করে আগে থেকে সিল মারা ব্যালট পেপার দেখতে পেতেন এবং তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদ করতেন তাহলে নিশ্চয়ই দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে তা উঠে আসতো। কিন্তু বাস্তবে সেই ধরনের কোনো খবর না পাওয়ায় বরং এখন এই প্রশ্ন উঠতে পারে যে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা ড. কামাল হোসেন বা মির্জা ফখরুলের নির্দেশনা-পরামর্শ শোনেননি।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, ভোটারকে ব্যালট পেপার দেওয়ার আগে ব্যালটের অপর পৃষ্ঠায় অফিসিয়াল সিলের ছাপ দিতে হয়। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ব্যালটের পেছনে অনুস্বাক্ষর করেন। এই সিলের একটি কোড বা গোপন সংকেত নম্বর থাকে। ব্যালট পেপারের মুড়িপত্রে ভোটার তালিকায় প্রদত্ত ভোটারের ক্রমিক নম্বর লেখা থাকে। ব্যালট পেপারের মুড়িপত্রে ভোটারের স্বাক্ষর বা টিপসইও নেওয়া হয়। তারপর মুড়িপত্রে অফিসিয়াল সিল দ্বারা ছাপ দিতে হয়। এরপর ভোটার গোপন বুথে গিয়ে পছন্দের প্রতীকে বর্গাকৃতির রাবার স্ট্যাম্প দ্বারা ছাপ দেন। অর্ধ শতাধিক সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন আইন যথাযথ অনুসরণ করেই ভোটগ্রহণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে ব্যালট পেপারের অপর পৃষ্ঠায় অফিসিয়াল সিলের ছাপ ও তাদের অনুস্বাক্ষর রয়েছে। কোনো আসনে ৩ লাখ, কোথাও ২ লাখ, কোথাও লক্ষাধিক ভোটার রয়েছেন। ভোটের ফলাফলের যে চিত্র তাতে নির্বাচনী আইন অনুযায়ী এতগুলো প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আগের রাতে এত বিপুল সংখ্যক ব্যালট পেপারে সিল মারা শুধু অবাস্তবই নয়, কল্পনাতীতও বটে।
নির্বাচন কমিশনের হিসাব মতে, মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে সাধারণ ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৪ জন সদস্য মোতায়েন ছিলেন। এরমধ্যে অস্ত্রসহ পুলিশ ১ জন, অস্ত্রসহ আনসার ১ জন, অস্ত্র/লাঠিসহ আনসার ১ জন, লাঠিসহ আনসার সদস্য ১০ জন (পুরুষ ৬ জন ও মহিলা ৪ জন) ও গ্রাম পুলিশ ১ জন। মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অস্ত্রসহ পুলিশ ২ জন, অস্ত্রসহ আনসার ১ জন, অস্ত্র/লাঠিসহ আনসার ১ জন, লাঠিসহ আনসার সদস্য ১০ জন (পুরুষ ৬ জন ও মহিলা ৪ জন) ও ২ জন গ্রামপুলিশ মোতায়েন ছিলেন। আর মেট্রোপলিটন এলাকায় সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৫ জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিলেন। এর বাইরে সশস্ত্র বাহিনী, র্যাব ও পুলিশের টহলও ছিল।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ১ জন প্রিজাইডিং অফিসার, প্রতি বুথে ১ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও প্রতি বুথে ২ জন করে পোলিং অফিসার নিযুক্ত ছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কেন্দ্রে প্রতিটি বুথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রত্যেক প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট থাকবেন। তবে কারও এজেন্ট না থাকলেও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচনী কর্মকর্তার সকল কার্যক্রম আইনসিদ্ধ বলে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে কোনো প্রার্থী কিংবা তার এজেন্টরা ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত না থাকলে সেটির দায়-দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন কিংবা অন্য কোনো প্রার্থীর নয়।
আইন অনুযায়ী ভোটগ্রহণকারী দলের সদস্যরা ব্যালট পেপার, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, সিল, প্যাডসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম নিয়ে ভোটের আগের রাতে কেন্দ্রে অবস্থান নেন। ব্যালট বাক্স খালি আছে কি-না, ভোট গ্রহণ শুরুর আধা ঘণ্টা আগে প্রিজাইডিং অফিসার তা নিশ্চিত করবেন। প্রিজাইডিং অফিসার খালি বাক্স উপস্থিত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের নির্বাচনী এজেন্টদের দেখাবেন এবং দেখানোর পর সিলগালা করে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম শুরু করবেন।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি ভোটকেন্দ্রে যে পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা থাকেন, ভোটগ্রহণ কার্যক্রমের সঙ্গে যে সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিযুক্ত থাকেন এবং ভোটকেন্দ্রের বাইরেও একটি আসনে যে পরিমাণ টহল থাকে- এতকিছু উপক্ষো করে আগেই ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে রাখা প্রায় অসম্ভব বিষয়। তা ছাড়া বিএনপি বা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা নিজেদের এজেন্ট দেননি। দিলেও এজেন্টরা ভোটকেন্দ্রে যাননি। এখন এটার দায় তো নির্বাচন কমিশন কিংবা অন্য প্রার্থী নিতে পারেন না। ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী নিজে কিংবা তার এজেন্ট কোনো কেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন তবে সংশ্লিষ্ট প্রিজাইডিং অফিসার তাদেরকে ভোট শুরুর আগে খালি ব্যাল্ট বাক্স দেখাননি- এমন কোনো অভিযোগও কেউ শোনেনি।
