নির্বাচনী বছরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ কমেছে

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:৩৬

জাতীয় নির্বাচনের আগে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করে থাকে। এছাড়া নির্বাচনী বছরে নতুন করে কোনো উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করতে চান না। তারা কেবল তাদের চলমান ব্যবসা চালিয়ে নেন। অন্যদিকে গত বছরের জুন থেকে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহার কমানোর কথা বললেও বাস্তবে তেমন না কমায় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা ঋণ কম নিয়েছেন। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের ধারা নিম্নমুখী হয়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত নভেম্বর শেষে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১৪ দশমিক ০১ শতাংশ। আর আগের মাস অক্টোবরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। গত নভেম্বর মাসে নয় লাখ ৪২ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা ঋণ বেসরকারি খাতে গিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত জানুয়ারিতে ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) কমানো এবং সুদ হার কমানোর সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংক খাতে তারল্যের (নগদ টাকা) সংকট হয়েছে। তারা বলছেন, আমদানি বৃদ্ধিসহ কিছু কারণে গত বছরের মাঝামাঝি থেকে ঋণ চাহিদা ব্যাপক বাড়তে থাকে। ফলে তারল্যের ওপরও চাপ পড়ে। এক অঙ্কের নিচে নেমে আসা ঋণের সুদহার বেড়ে দুই অঙ্ক হয়ে যায়। অনেক ব্যাংক ১০ শতাংশের বেশি সুদে আমানত নিতেও শুরু করে। এর মধ্যে গত ৩০ জানুয়ারি ব্যাংক খাতের এডিআর কমিয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি গতবছরের ২০ জুন সুদহার কমানোর বিষয়ে এক বৈঠক করে। সেখাতে তারা ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ এবং ৬ শতাংশ সুদে আমানত নেওয়ার ঘোষণা দেন। এরপর থেকে আশানুরূপ হারে আমানত পাচ্ছে না অধিকাংশ ব্যাংক। কারণ, ব্যাংকের আমানতের চেয়ে বেশি সুদ পাওয়া যাচ্ছে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে। ফলে মানুষ ব্যাংকের রাখা আমানত তুলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে। অবশ্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সমঝোতায় সরকারী অর্থ যাতে বেসরকারি ব্যাংকগুলো পায় সেজন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সে অনুযায়ী নগদ অর্থও পেয়েছে ব্যাংকগুলো।

বর্তমানে যেসব ব্যাংকের এডিআর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে, নানা উপায়ে তারা তা সমন্বয়ের চেষ্টার ফলে নতুন করে ঋণ বিতরণ করতে পারছে না। এডিআর যেন বেড়ে না যায় এ জন্য লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে থাকা ব্যাংকগুলোও সতর্কতার সঙ্গে ঋণ বিতরণ করছে। সব মিলিয়ে ব্যাপক চাপে পড়ে ব্যাংকগুলো আগের মতো আর ঋণ বাড়াতে পারছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এডিআর কমানো ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে সুদহার নির্দিষ্ট করে দেওয়ার কারণে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। সুদহার বেধে দেওয়ায় আমানতের সুদহারও কমে গিয়েছে। ফলে ব্যাংকিং খাতের আমনত না থাকায় তারা বিনিয়োগ করতে পারেনি। তিনি বলেন, বেসরকারি খাত জিডিপি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেলে তাতে জিডিপি’র লক্ষমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে থাকে। এতে কর্মসংস্থানও কমে যাবে বলে তিনি মনে করেন।

বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো বলছে, এখন ব্যাংকের আমানত অনেক কমে গিয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচনের বছরে উদ্যোক্তারাও যেমন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় আনে তেমনই ব্যাংকগুলোও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করে।

প্রসঙ্গত, বাজেটে ঘোষিত সরকারের রাজস্ব নীতির সমর্থন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কাঙ্খিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ছয় মাস অন্তর আগাম মুদ্র্রানীতি ঘোষণা করে থাকে। যাতে মুদ্রা ও ঋণ সরবরাহ সম্পর্কে একটি ধারণা দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ ১৬ দশমিক ৮০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।