মত্স্য মারিব খাইব সুখে—ইহা মধ্যযুগের শ্লোক। মাছে-ভাতে বাঙালি হিসাবে মত্স্য উত্পাদনে আমরা আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ। হালদা নদীতে যখন মা-মাছ ডিম পাড়িবার আয়োজন করে, তখন তাহার জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকার সর্বদা সচেষ্ট থাকে। ইলিশের ডিম ছাড়িবার পক্ষকালব্যাপী মত্স্যনিধন নিষিদ্ধ থাকে। জাটকা মাছ যাহাতে না ধরিতে পারে, তাহার জন্য প্রশাসন পূর্বের তুলনায় এখন অনেক বেশি কঠোর। জেলেদের মধ্যেও তুলনামূলক সচেতনতা আসিয়াছে; কিন্তু তাহার পরেও কতিপয় লোভী ও অসচেতন মত্স্যশিকারির জন্য এই বর্ষার সময় মা-মাছ নিধন করা হয় নির্বিচারে। এমনটি ঘটিতেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মত্স্যভান্ডার হিসাবে খ্যাত চলনবিলের বিভিন্ন পয়েন্টে।
বর্ষার নূতন পানি আসিতেছে চলনবিলে। অথই পানিতে ঢেউ আছড়াইয়া পড়িবার অপূর্ব দৃশ্য সৃষ্টি হইতেছে দ্বীপের মতো জাগিয়া থাকা ছোট্ট ছোট্ট গ্রামে। মাছ-পাখিদের লুকোচুরি আর দিগন্তবিস্তারী জলের বিস্তরণের অপূর্ব শোভা প্রকাশ পায় এই বর্ষার সময়; কিন্তু বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় গত সপ্তাহ ধরিয়া এই মর্মে সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে যে, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার আটটি উপজেলা লইয়া গঠিত দেশের সর্ববৃহত্ বিলাঞ্চলে এখন চলিতেছে অবৈধ নানা উপায়ে মা-মাছ শিকারের উত্সব। সাধারণত জুন-জুলাই মাসে ডিম ছাড়ে মা-মাছ। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, এই সময়টিতে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ১৯৫০ সালের মত্স্য আইন অনুযায়ী ডিম এবং মা-মাছ শিকার আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা হইয়াছে; কিন্তু বিলে পানি আসিবার সঙ্গে সঙ্গে মাছ শিকারে নামিয়া পড়িয়াছে লোভী ও অসচেতন মত্স্যশিকারিরা। ইহাতে জেলেদের জালে ধরা পড়িয়া নষ্ট হইতেছে ডিম। প্রকাশিত সংবাদে জানা গিয়াছে, গুমানী, চিকনাই, বড়াল, আত্রাই নদী এবং বিলের বিভিন্ন পয়েন্টে বাদাই, কারেন্ট, খরা জালসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়া ডিমে ভরপুর দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মা-মাছ অবাধে নিধন করা হইতেছে। এই সকল মা-মাছ শিকার করিয়া হাটবাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি করিলেও কেহই নাকি দেখিবার নাই! বিভিন্ন হাটবাজারে তাড়াশ ও সিংড়া মত্স্য আড়তে দেখা গিয়াছে, পেটে ডিম ভরপুর ট্যাংরা, বাতাসি, পুঁটি, মলা, বোয়াল, শোল, মাগুরসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছ। এইগুলি বিক্রিও হইতেছে প্রকাশ্যে।
এই সকল ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রথমে মাইকিং করিয়া সতর্ক ও সচেতন করিয়া থাকে; কিন্তু এখনো তাহা করা হয় নাই। মাইকিংয়ের পর অসাধু মত্স্যশিকারিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করিতে হইবে। কারেন্ট জাল বিক্রির বিরুদ্ধেও অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন। জানা গিয়াছে, এই মা-মাছ নিধনে এলাকার একশ্রেণির অসচেতন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিও জড়িত। তাহাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা লইতে হইবে। দুঃখের সহিত বলিতে হয়, দুই দশক পূর্বেও এই অঞ্চলের নদী-বিল ও জলাশয়ে প্রায় আড়াই শত প্রজাতির মিঠাপানির মাছের দেখা মিলিত। ইতোমধ্যে ৩৯ প্রজাতির মাছের বিলুপ্তি ঘটিয়াছে। আরো প্রায় ৫০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। সুতরাং, চলনবিলে মা-মাছ রক্ষা করিতেই হইবে। ইহার কোনো বিকল্প নাই।
