যে কোনো কর্মকাণ্ড যার বিনিময়ে তাত্ক্ষণিক বা ভবিষ্যতে কিছু রিটার্ন পাওয়া যায় তাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বলা যায়। অর্থনীতির অভিধায় নৈতিক-অনৈতিক, ভালো-মন্দ সব কাজেরই একটা অর্থনৈতিক গুরুত্ব আছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। রাষ্ট্র বা সমাজের মানদণ্ডে তা নৈতিক-অনৈতিক, ন্যায়-অন্যায়, বৈধ-অবৈধ ইত্যাদি অভিধা পেতে পারে। সেজন্যই মদ-সিগারেট ইত্যাদি প্রস্তুতিকরণ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত যত কর্মকাণ্ড সবই জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
করোনা বিশ্বস্বাস্থ্য, বিশ্ববাণিজ্য কিংবা বিশ্ব অর্থনীতি পর্যুদস্ত করেছে এবং আরো করবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আইএমএফ বলছে, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ইউরোপের দেশগুলোর প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ২.৩, ০.৭ এবং ১.২ শতাংশ। আর ২০২০ সালে তাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে যথাক্রমে মাইনাস ৫.৯, মাইনাস ৫.২ এবং মাইনাস ৭.৫ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৯ সালে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, পাকিস্তান ও রাশিয়ার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৭.৯, ৪.২, ৬.১, ৩.৩ ও ১.৩ শতাংশ। আর এ দেশগুলোর ২০২০ সালের প্রবৃদ্ধি ধারণা করা হয়েছে যথাক্রমে ২.০, ১.৯, ১.২, মাইনাস ১.৫ এবং মাইনাস ৫.৫ শতাংশ। অবশ্য ২০২১ সালের এসব দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ২০১৯ সালের চেয়ে বেশি হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ এবং চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৯.৫ এবং ৯.২ শতাংশ হবে বলে আইএমএফ ইঙ্গিত দিয়েছে। অনেকের ধারণা, বাংলাদেশে কৃষি পরিচর্যা সঠিকভাবে করা গেলে অর্থাত্ কৃষিকে ঝুঁকিমুক্ত ও সমস্যামুক্ত রাখা গেলে আমাদের অর্থনীতিতে খুব বেশি মন্দাভাব দেখা দেবে না। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধায় আমাদের অবস্থা দৃঢ়ই থাকবে। তবে বৈদেশিক বাণিজ্য আর অর্থ আহরণের ক্রমধারায় যে একটি বড়ো ধরনের আঘাত সমাসন্ন তা সহজেই অনুমেয়। এ সময়ে প্রাজ্ঞ পরিকল্পনা আর কর্মধারা সম্ভাব্য দুর্ভোগের মাত্রা হ্রাস করতে পারে অনেকাংশে।
সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ আর জলোচ্ছ্বাস যেমন উপকূলের বাসিন্দাদের সাহসী করে তোলে, কিংবা বন্যা-পরবর্তী পলিমাটি জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে দ্বিগুণ ফসল দেয়, মহামারি করোনা কি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমাদের অর্থনীতিকে কোনোভাবে আনুকূল্য দিচ্ছে বা দেবে—এ প্রশ্ন করাই যায়। আবার করোনার ফলে অনিবার্য বিকল্প কোনো অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে এবং অর্থনীতিকে সম্ভাব্য খাদ থেকে টেনে তুলে ধরছে, সেটাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, গতিময়তা, দুর্নীতি রোধ, আর্থিক সাশ্রয় ইত্যাদি লক্ষ্যে সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ও কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। করোনা ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এখন সরকারি-বেসরকারি প্রায় অধিকাংশ কর্মকাণ্ড অনলাইনে বা ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় হচ্ছে। অনলাইন বেচাকেনা, এটিএম বুথ, মোবাইল ব্যাঙ্কিং, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড অর্থনীতিতে স্থান পাকাপোক্ত করে নিয়েছে। অনেক দাপ্তরিক কার্যক্রম এখন ঘরে বসে অনলাইনে সম্পাদিত হচ্ছে। এই ডিজিটালাইজেশনের ফলে সবার আইটি দক্ষতা বাড়বে, সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে, স্বচ্ছতা বাড়বে, দুর্নীতি কমবে এবং পরিবেশ দূষণ কমবে। অন্যদিকে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারসহ আইটি সেক্টরে অনেক সরকারি বেসরকারি ফার্ম, প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি হয়েছে এবং হবে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার হবে।
লকডাউন, ঘরে থাকা, অনলাইন কর্মকাণ্ডের ফলে রাস্তাঘাটে ট্রাফিক জ্যাম হ্রাস পাবে। রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্টসহ বিভিন্ন স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হ্রাস পাবে এবং আয়ুষ্কালও বৃদ্ধি পাবে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণ হ্রাস পাবে এককথায় প্রকৃতি নির্মল, সবুজ হয়ে উঠবে।
এ সময় অধিকাংশ সভা, সেমিনার, কর্মশালা, কনফারেন্স, এমনকি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনলাইনে পরিচালিত হচ্ছে বিধায় হলরুম ভাড়া, পোস্টার, ব্যানার, যাতায়াত এবং আপ্যায়ন বাবদ কোনো ব্যয় হচ্ছে না। এতেও অর্থনীতিতে রাজস্ব বা উন্নয়ন ব্যয় হ্রাস পাবে অনেকাংশে। থমকে যাওয়া শিল্প বা ম্যানুফেকচারিং খাতকে কিছুটা হলেও সচল করে রেখেছে সীমিত আকারে চালু শিল্পকারখানা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জাম তথা হ্যান্ড সেনিটাইজার, মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, পিপিই, ওষুধ, সাবান, হ্যান্ডওয়াশ, ডিটারজেন্ট প্রস্তুতকারক, বাজারজাতকারী এবং সরবরাহকারী কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানগুলো। রোগ প্রতিরোধকারী ভেষজ, খাদ্য, মশলা, শাকসবজি ইত্যাদির বাজার রমরমা। অনেক কমেছে বিলাসদ্রব্যের ব্যবহার। ফ্যাশন সামগ্রীর প্রতি আকর্ষণ সাময়িকভাবে হ্রাস পেয়েছে। যদিও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মাস্ক, গ্লাভস ইত্যাদিতে ফ্যাশন ঢুকে পড়েছে এবং বিচিত্র ধরনের এসব মাস্ক, গ্লাভস বা পিপিইর দাম গগনচুম্বী। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে বা বাংলাদেশে এর প্রচলনে বেশ কিছুটা সময় লাগতে পারে। ভোগবিলাসের ক্ষেত্রে ব্যয় হ্রাসের এ প্রবণতা পরোক্ষভাবে সঞ্চয় বা বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
করোনা অর্থনীতিতে বিশেষ করে উন্নয়ন বাজেটে খাতভিত্তিক বরাদ্দের বিষয়ে কিংবা খাতভিত্তিক পরিচর্চা মাত্রা নির্ধারণে আরো কৌশলী হতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই স্বাস্থ্য এবং কৃষি খাতে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। আমরা লক্ষ্য করেছি বিষয়ের গুরুত্ব অনুধাবণ করে তথা খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে প্রথমবারের মতো সরকারি সাহায্য ও আনুকূল্যে কৃষক তার জমির বোরো ধান কর্তন করে ঘরে তুলেছে। অনুমান করা যায় বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশে পুরোপুরি স্বাভাবিক অর্থনীতির পুনরাগমন সময়সাপেক্ষ। আমাদের উচিত হতাশায় নিমজ্জিত না হওয়া। বরং স্বাভাবিক অর্থনীতির সঙ্গে বিকল্প অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত সম্মিলন ঘটিয়ে এগিয়ে যাওয়া।
n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত সচিব ও রেক্টর, বিসিএস প্রশাসন একাডেমি
