আজ ১২ জুন পালিত হচ্ছে বাংলাদেশে প্রথম আন্তর্জাতিক ন্যাশ দিবস। প্রথম বছর বিশ্বের ২৫টি শহরে উদ্যাপিত হয়েছিল দিবসটি। দ্বিতীয় বছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০টিতে। এ বছর আরো বড়ো পরিসরে পালিত হওয়ার কথা ছিল দিবসটির। সবচেয়ে বড়ো কথা, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে আমাদের প্রস্তাবে এ বছর দিবসটি ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক ন্যাশ দিবস’ হিসাবে উদ্যাপনে সাদরে সম্মতি জানিয়েছিলেন দিবসটির উদ্যোক্তা সংগঠন ‘গ্লোবাল লিভার ইনস্টিটিউট’। অবশ্য কোভিড-১৯-এর ডামাডোলে এখন তা সংকুচিত হয়ে ভার্চুয়াল জগতে কম্পিউটারের পর্দায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফ্যাটি লিভার এখন ঘরে ঘরে, মুখেমুখে। এ রোগের কথা প্রথম শোনা যায় ১৯৬২ সালে। রোগ হিসেবে ফ্যাটি লিভারের ব্যাপ্তি ব্যাপক। লিভারে সাধারণ চর্বি জমা থেকে শুরু করে এর কারণে লিভার সিরোসিস, এমনকি লিভার ক্যানসারও হতে পারে। ইদানীং পৃথিবীর আরো অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, যেসব রোগীর লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারের মূল কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না, তাদের অনেকেই আসলে ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত।
পাশ্চাত্যে ফ্যাটি লিভারের মূল কারণ অ্যালকোহল। তবে আমাদের মতো দেশগুলোতে মেদ-ভুঁড়ি, ডায়াবেটিস, ডিজলিপিডেমিয়া বা রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, হাইপারটেনশন বা অতিরিক্ত রক্তচাপ, আর হাইপোথাইরয়েডিজম আর মহিলাদের পলিসিস্টিক ওভারি ফ্যাটি লিভারের মূল কারণ। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি খুবই বেশি। আমেরিকায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ৩৩ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগীর ফ্যাটি লিভার রয়েছে। অন্যদিকে আমাদের উপমহাদেশে ৪৯ শতাংশ মানুষ যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তারা পাশাপাশি ফ্যাটি লিভারেও আক্রান্ত।
হেপাটাইটিস ভাইরাসগুলোর মধ্যে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস অনেক সময়ই ফ্যাটি লিভার করে থাকে। কর্টিকোস্টেরয়েড, টেমোক্সিফেন ইত্যাদি ওষুধ দীর্ঘদিন সেবনেও ফ্যাটি লিভার হতে পারে।
তবে ফ্যাটি লিভারের অন্যতম প্রধান কারণ খাদ্যাভ্যাস ও লাইফ স্টাইল। সিডেন্টারি বা আয়েশি জীবনযাপন আর অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট বা ফ্যাটযুক্ত খাবার খেলে লিভারে চর্বি জমতে পারে। আমাদের দেশে ইদানীং খুবই জনপ্রিয় ’ফাস্ট-ফুড’ কালচার এদেশে ফ্যাটি লিভারের বাড়তি প্রাদুর্ভাবের সম্ভবত একটি বড়ো কারণ। সারা বিশ্বেই ফ্যাটি লিভারের দেখা মেলে। শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ আমেরিকান অ্যাডাল্ট ও ১০ ভাগ শিশু ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। জাপান ও ইতালিতে মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ থেকে ৫৮ শতাংশর ফ্যাটি লিভার রয়েছে।
ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত অনেকেরই লিভারে ক্রনিক হেপাটাইটিস বা দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ দেখা দিতে পারে যাকে আমরা বলি স্টিয়াটো হেপাটাইটিস বা সংক্ষেপে ‘ন্যাশ’। পাশাপাশি এটিও এখন সুপ্রতিষ্ঠিত যে, ফ্যাটি লিভার লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ। ভারতীয় উপমহাদেশে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত রোগীদের শতকরা ১৬ ভাগের ফ্যাটি লিভার রয়েছে। আন্তর্জাতিক মেডিক্যাল জার্নালগুলো ঘাঁটলে দেখা যায়, যে সমস্ত রোগীর স্টিয়াটো হেপাটাইটিস আছে, তাদের প্রায় ৩০ শতাংশ পরবর্তী সময়ে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হতে পারেন। আর তাদের কারো কারো এমনকি লিভার ক্যানসারও হতে পারে। ফ্যাটি লিভার থেকে একবার লিভার সিরোসিস হলে, ১৫ শতাংশ রোগী সাত বছরের মধ্যে আর ২৫ শতাংশ ১০ বছরের মধ্যে মৃত্যুবরণের ঝুঁকিতে থাকেন।
ফ্যাটি লিভারের রোগীদের রোগ নির্ণয়ের জন্য ইদানীং উপকারী পরীক্ষাটি হচ্ছে ফাইব্রোস্ক্যান। এটি অনেকটা আলট্রাসনোগ্রামের মতো হলেও আসলে আলট্রাসনোগ্রাম নয়। এই মেশিনের সাহায্যে খুব সহজেই লিভারে ফাইব্রোসিস বা স্থায়ী ক্ষতির মাত্রা জানা যায়। অর্থাত্ জানা যায়, লিভারে সিরোসিস হবার ঝুঁকি কতখানি। আর এটিই একমাত্র পরীক্ষা যা দিয়ে লিভারে চর্বিও পরিমাপ করা যায়।
ফ্যাটি লিভারের চিকিত্সায় সর্বশেষ যে ওষুধটি ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে তা হলো ওবিটাকলিক অ্যাসিড। এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে তা থেকে আমরা আশাবাদী—এই ওষুধটি যে শুধু লিভারে চর্বির পরিমাণই কমিয়ে থাকে তাই নয়, বরং এটিই একমাত্র ওষুধ যা দিয়ে সম্ভবত লিভারের স্থায়ী ক্ষত বা ফাইব্রোসিসও কমিয়ে আনা যায়, অর্থাত্ ঠেকিয়ে দেওয়া যেতে পারে লিভার সিরোসিস এমনকি লিভার ক্যানসারও। খুবই খুশির কথা এই যে, বাংলাদেশেও এই ওষুধটি তৈরি এবং বাজারজাত করা হচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন ধারণা করা হতো—হার্ট বা ব্রেনে চর্বি জমে হার্ট-অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো মারাত্মক রোগের সৃষ্টি করলেও লিভারের ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়; কিন্তু বিগত দশকে সেই ধারণার আমূল পরিবর্তন এসেছে। এটি আজ প্রমাণিত যে, ফ্যাটি লিভার, লিভারের অন্যতম প্রধান রোগ। সঠিক সময়ে এ রোগ নির্ণয় ও চিকিত্সার জন্য চিকিত্সক ও রোগী—সবারই ব্যাপক সচেতনার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
n লেখক :চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, ফোরাম ফর দি স্টাডি অব দি লিভার বাংলাদেশ
