সর্বাধিক মৃত্যু, সর্বাধিক আক্রান্ত

আপডেট : ১৩ জুন ২০২০, ০০:৩৬

একদিনে রেকর্ড ৪৬ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯৫ জন। গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৩ হাজার ৪৭১ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে, যা এক দিনের সর্বোচ্চ। এতে দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৫২৩ জন। দেশে করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার ৯৫তম দিনে আক্রান্তের সংখ্যা ৮০ হাজার ছাড়াল। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, এভাবে যদি রোগী সংখ্যা বাড়তে থাকে আর সংক্রমণ রোধ না করা যায়, তাহলে বড়ো ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। সামনের দুই মাস দেশের জন্য ভয়ংকর। স্বাস্থ্য বিধি না মেনে চলার চরম মাশুল দিতে হবে আমাদের।

তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের পর থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৮৫ দিনে মৃত্যু হয়েছে ৬৮৫ জনের। ঐ সময়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫১১৮৬ জন। অন্যদিকে চলতি জুন মাসের মাত্র ১২ দিনে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৪৫৬ জনের। এই সময়ে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৩৭০৮ জন।  

জুনের শুরু থেকে প্রতিদিন ২ হাজারের ওপরে কোভিড পজিটিভ রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এরমধ্যে ৩ হাজার ছাড়িয়েছে টানা গত তিন দিন। করোনার বিস্তার বন্ধ করতে বড়ো এলাকাজুড়ে পূর্ণ ও কঠোর লকডাউন প্রয়োজন বলে মনে করেও কোভিড-১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। আর তাই সারা দেশে আক্রান্ত ও ঝুঁকির মাত্রার ভিত্তিতে যতটা বড়ো এলাকায় সম্ভব জরুরি লকডাউনের সুপারিশ করেছেন কমিটির সদস্যরা। একইসঙ্গে রোগী বাড়তে থাকলে হাসপাতালগুলোতে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক  চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন,          এদেশের মানুষ নিয়ম মানে না, স্বাস্থ্য বিধি মানে না। এ কারণে সামনে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আরো বাড়বে। আপাতত কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়তে পারে। তিনি বলেন, লকডাউন কমানোর কোনো সুযোগ নেই। নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সত্যিকারের লকডাউন কার্যকর করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন বলেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সামনে আরো বাড়বে। ঈদের আগে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহর থেকে গ্রামে যাওয়া এবং ঈদের পর গ্রাম থেকে আবার শহরে আসার প্রেক্ষাপটে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। কারণ শহরে আক্রান্ত হার বেশি। তার গ্রামে গিয়ে তাদেরও ঝুঁকিতে ফেলেছে। তাই এখন যত বেশি পরীক্ষা করা হবে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা তত বাড়বে। মোট জনসংখ্যার ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ আক্রান্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে কমে আসবে। পাঁচ জনের  মধ্যে এক জন আক্রান্ত হলে বাকি চার জনের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যাবে। তিনি বলেন, শুরুতে যদি সত্যিকারের লকডাউন কার্যকর করা যেত তাহলে এই অবস্থার সৃষ্টি হতো না। 

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) সাবেক পরিচালক ও জাহাঙ্গীর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুর  রহমান বলেন, দেশে করোনার ঊর্ধ্বগতি সামনে থাকবে। বর্তমানে প্রতিদিন যা পরীক্ষা করা হচ্ছে তার মধ্যে ২০ থেকে ২৫ ভাগ করোনা শনাক্ত হচ্ছেন। ঢাকা শহরের দেড় কোটি মানুষের পরীক্ষা করা হলে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ মানুষ করোনা শনাক্ত হবেন। কিন্তু সেভাবে আমরা পরীক্ষা করতে পারছি না। আমাদের সেই সক্ষমতা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলছে, পরীক্ষা, পরীক্ষা, পরীক্ষা। তিনি বলেন, গার্মেন্টস খোলার নাম করে ঢাকায় শ্রমিক আনা হলো। পরে আবার বলা হলো চলে যাও, এখন বন্ধ। আবার ঈদের সময় মানুষ শহর থেকে গ্রামে গেছে আবার গ্রাম থেকে শহরে এসেছে। এতে ঝুঁকি বেড়েছে। তিনি বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সবার স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে হবে। বিশ্বের যেসব দেশ স্বাস্থ্য বিধি মেনেছে তার সফল হয়েছে। আমরা মানিনি, এ কারণে এর মাশুল দিতে হবে। মোট জনসংখ্যা ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ আক্রান্ত হলে কমতে শুরু করবে জানিয়ে তিনি বলেন, আতঙ্কিত বা ভয় পাওয়ার কারণ নেই। নিজের সুরক্ষা নিজে করবেন। কেউ রক্ষা করতে পারবে না। জ্বর, সর্দি, কাশির রোগীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দুই ঘণ্টা পর পর গরম পানি মুখে দিয়ে গর্গর করবেন। করোনা ভাইরাস গলায় থাকায় অবস্থায় তাকে মেরে ফেলতে দুই ঘণ্টা পর পর গরম পানি খেতে হবে। নিয়মিত বুলেটিনে যুক্ত হয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা শুক্রবার দেশে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, সারা দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে সুস্থ হয়েছেন আরো ৫০২ জন। সব মিলে এ পর্যন্ত মোট ১৭ হাজার ২৪৯ জন সুস্থ হয়ে উঠলেন। দেশে করোনা ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়েছিল ৮ মার্চ, তার দশ দিনের মাথায় ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর খবর আসে।