মো. তানভীর মাসুদ
জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত বৈশ্বিক হুমকির মুখে বিশেষ করে উন্নত দেশগুলো বর্তমানে নবায়নযোগ্য ও বিকল্প জ্বালানি আবিষ্কার ও ব্যবহারের ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। বাংলাদেশের জলবিদ্যুতের সম্ভাবনা সীমিত। কাপ্তাই জলবিদ্যুেকন্দ্র থাকলেও অত্যধিক পলিমাটি জমার কারণে নাব্য না থাকায় উত্পাদন সীমিত। তবে সূর্যালোক ও বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনা বিশাল। কেননা গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চল বিধায় এখানে সূর্যালোকের কোনো অভাব নেই। অন্যদিকে সুবিশাল ও প্রলম্বিত সমুদ্রসৈকত বায়ুবিদ্যুতের এক অফুরন্ত উত্স হতে পারে।
বায়ুবিদ্যুতের কথা বলতে গেলে বায়ুবিদ্যুত্ সম্পর্কে কিছু বিষয় জানতে হবে। একটি বায়ুবিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের প্রধান ও পূর্বশর্ত হচ্ছে বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাব্যতা যাচাই বা উইন্ড রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট। কোনো স্থানে বিগত ১০ বছর ধরে বায়ুর গতিপ্রকৃতি কেমন বা পরবর্তী ১০ বছরের আবহাওয়ার সম্ভাব্য পরিবর্তন বিবেচনা করে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। এই উইন্ড রিসোর্স অ্যাসেসমেন্টের কাজে বাংলাদেশ বরাবরই বিদেশি দাতা সংস্থাদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু স্রেডা প্রতিষ্ঠার পর বায়ুবিদ্যুত্ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব জনবল গড়ে উঠছে। বায়ুবিদ্যুত্ বিষয়ে আলোচনার শুরুতেই তাই জানতে হবে উইন্ড রিসোর্স অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রমে কী কী ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
বায়ুবিদ্যুতের জন্য সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে প্রথমেই দেখতে হবে একটি দেশের গত ২০-৫০ বছরের বায়ুর তথ্য যা বিভিন্ন ওপেন সোর্স প্ল্যাটফরম যেমন :মেটাডাটা, গ্লোবাল উইন্ড এটলাস, এনআরইএল ম্যাপ ইত্যাদি ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া যায়। এসব প্ল্যাটফরম থেকে প্রাপ্য তথ্য পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের বায়ুবিদ্যুতের জন্য সম্ভাব্য এলাকাগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব।
প্রাথমিকভাবে সম্ভাব্য এলাকাগুলো চিহ্নিত করার পর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয় সাইট স্পেসিফিক তথ্য আহরণের জন্য। যেমন: মেটাডাটা হতে দেখা যায় বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা (কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, খুলনা, পটুয়াখালী, ভোলা ইত্যাদি) বায়ুবিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য বিশেষ উপযোগী। সাইট স্পেসিফিক তথ্য আহরণের জন্য প্রয়োজন হয় সাইট শর্টলিস্টিং। এক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয় এলাকাসমূহের কাঠামোগত অবস্থা (Infrastructure development), জাতীয় গ্রিডলাইনের প্রাপ্যতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, জনবসতি ইত্যাদি। সাইট শর্টলিস্টিং এরপর রিমোট সেন্সিং যন্ত্রপাতি যেমন: সোডার, লাইডার ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট এলাকার ৪০-১২০ মিটার উচ্চতায় বায়ুর গতিবেগ, দিক, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ইত্যাদি তথ্যাদি অন্তত দুই বছর আহরণ করা হয় এবং এসব তথ্যাদি কোনো একটি সার্ভারে সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষিত করা হয়। এই তথ্য আহরণের সময় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড IEC-614001 অনুসরণ করা না হলে বায়ুর তথ্য আহরণের সম্পূর্ণ কার্যক্রমটিই ব্যর্থ বলে গণ্য হতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্যাদি সার্ভারে সংরক্ষণের পাশাপাশি চলতে থাকে প্রাপ্ত তথ্যাদি মানসম্পন্ন কি না (Quality Control) তা যাচাই করা। বায়ুবিষয়ক তথ্য আহরণে অনেক ধরনের ক্রটি ধরা পড়ে যা অভিজ্ঞ প্রকৌশলী কর্তৃক প্রতিদিন যাচাই করা হয় ও মান নিশ্চিত করা হয়। এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিনিয়োগকারীদের রিস্ক অ্যাসেসমেন্টের প্রধান একটি অংশ হচ্ছে বায়ুর তথ্যাদির মান (Bankability of Data)। প্রাপ্ত তথ্যাদির মান নিশ্চিতকরণের পর শুরু হয় উইন্ড ফার্ম মডেলিং বা কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় কোন মডেলের উইন্ড টারবাইন ব্যবহার করে সর্বোচ্চ পরিমাণ বায়ুবিদ্যুত্ উত্পাদন সম্ভব, তা নির্ণয় করা। এটি বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রমের বড়ো একটি অংশ। উইন্ড ফার্ম মডেলিংয়ের পর নিশ্চিত একটা ধারণা পাওয়া যাবে কোন এলাকায় বায়ুবিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন বিনিয়োগকারীদের জন্য কতটা নিরাপদ।
উপরি-উক্ত ধাপ তিনটি ব্যতীত কোন এলাকায় বায়ুবিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করা অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার শামিল।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত অনেক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বায়ুর তথ্য আহরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে কিন্তু এসব তথ্য আহরণ কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড IEC-614001 অনুসরণ করা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। বিগত ২০১৪ সালে বিদ্যুত্ বিভাগের উদ্যোগে এবং USAID-এর কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশে প্রথমবারের মত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বায়ুবিদ্যুতের তথ্য আহরণ করা শুরু হয়, যা ২০১৭ পর্যন্ত চলমান ছিল। ২০১৮ সালে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা আমেরিকার ন্যাশনাল রিনিউঅ্যাবল এনার্জি ল্যাবরেটরি (NREL) কর্তৃক বিদ্যুত্ বিভাগ বরাবর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয় এবং তিন বছরে প্রাপ্ত সব তথ্যাদি ব্যবহার করে একটি জাতীয় উইন্ড ম্যাপ প্রস্তুত করা হয়, যা ওপরে বর্ণিত তিন ধাপ কার্যক্রমের প্রথম ধাপ হিসেবে যথেষ্ট মানসম্পন্ন। ঐ ম্যাপটি একটি ওপেন প্ল্যাটফরম যা https://maps.nrel.gov/rede-bangladesh ওয়েবসাইটে দেখা যাবে। অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও আশার বাণী হচ্ছে বিগত পাঁচ বছরে বায়ুবিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনে যেসব ধাপ অতিক্রম করা উচিত সেসব বিষয়ে সে ডা তথা বিদ্যুত্ বিভাগের দক্ষ জনবল গড়ে উঠছে। সে ডার নিজস্ব সার্ভারে লম্বা সময়ের জন্য তথ্য সংরক্ষণ, সম্ভাব্যতা যাচাই ও কাঠামোগত উন্নয়ন এখন নিজস্ব জনবলের মাধ্যমেই সম্ভব বলে প্রতীয়মান হয়। আশা করা যায়, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের বায়ুবিদ্যুিবষয়ক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে এবং দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমে আসবে।
n লেখক : সহকারী পরিচালক (উইন্ড অ্যান্ড আদার্স), সে ডা, বিদ্যুত্ বিভাগ
