মোহাম্মদ নাসিম আর নেই

আপডেট : ১৩ জুন ২০২০, ২৩:১৫

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের সমন্বয়ক, খাদ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মোহাম্মদ নাসিম এমপি আর নেই। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর ব্রেইন স্ট্রোকে সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছিল সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের জীবন, সেই সংকট আর কাটল না। বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় আট দিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গতকাল শনিবার বেলা ১১টা ১০ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি...রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। তিনি স্ত্রী, তিন পুত্রসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

পিতা জাতীয় চার নেতার একজন শহিদ এম মনসুর আলীর রাজনীতির ধারায় অবিচল থাকা সাহসী ও আপসহীন রাজনীতিক মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অঝোরে কাঁদলেন প্রধানমন্ত্রী ও আাাওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। মৃত্যুর খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমবেদনা জানাতে ফোন করেন মোহাম্মদ নাসিমের জ্যেষ্ঠ পুত্র তানভির শাকিল জয়কে।

গতকাল রাতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের মর্গে মরদেহ রাখা হয়েছে। আজ রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় বনানী কবরস্থান মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।  সেখানে জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। করোনা ভাইরাসের কারণে জনগণের স্বাস্থ্যবিধি ও স্বাস্থ্যসচেতনতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মরদেহ জন্মভূমি সিরাজগঞ্জে নেওয়া হচ্ছে না।

মোহাম্মদ নাসিমের স্ত্রীর নাম মিসেস লায়লা আরজুমান্দ। গতকাল শনিবার রাত ১২টায় মোহাম্মদ নাসিমের ছোটো ছেলে তন্ময় মনসুরের আমেরিকা থেকে দেশে ফেরার কথা রয়েছে। মেজো ছেলে তমাল মনসুরও আমেরিকায় থাকেন। মোহাম্মদ নাসিমের তিন ছেলের মধ্যে বড়ো ছেলে তানভির শাকিল জয় ২০০৮ সালের নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। দাদা ও বাবার দেখানো পথ ধরে জাতীয় সংসদে প্রবেশ করেন নাসিমের ছেলে তানভীর শাকিল জয়ও। জাতীয় সংসদে তিন প্রজন্মের নেতৃত্বের উদাহরণ বলতে গেলে বাংলাদেশে বিরল। রাজনীতিতে তাদের পরিবারের ভূমিকা নিয়ে ‘সংসদে তিন প্রজন্ম’ নামের একটি বইয়ের সম্পাদনাও করেছেন মোহাম্মদ নাসিম।

আওয়ামী লীগবিরোধী দলে থাকতে দলটির যে কয়েক জন নেতাকে রাজপথে বলিষ্ঠ ভূমিকায় দেখা যায়, তাদের একজন মোহাম্মদ নাসিম ১৪ দলের রাজনৈতিক তত্পরতায়ও ছিলেন সামনের কাতারে। হাসপাতালের শয্যায় শুয়েও তিনি জাতীয় এই সংকট থেকে  উত্তরণের পথ খুঁজতে ভার্চুয়াল আলোচনা সভা করার পরিকল্পনা করেছিলেন। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এ তথ্য জানিয়ে বলেন, করোনা ভাইরাসের মধ্যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ১৪ দলের একটি ভার্চুয়াল কনফারেন্স হওয়ার কথা ছিল। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মোহাম্মদ নাসিম এ বিষয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। কয়েক দিন আগে তিনি যখন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন, তখন তার সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়েছিল।

মোহাম্মদ নাসিম সংসদে ষষ্ঠবারের মতো সিরাজগঞ্জ-১ আসনের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য থাকার পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিও ছিলেন তিনি। বেশ কয়েক দিন ধরে অসুস্থ মোহাম্মদ নাসিম গত ১ জুন হাসপাতালে ভর্তির আগে একবার করোনা ভাইরাস পরীক্ষা করালে ফল ‘নেগেটিভ’ আসে। ঐ সময় তার স্ত্রী ও এক গৃহকর্মীর করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে। পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও জ্বর-কাশিসহ অন্যান্য অসুস্থতা বাড়তে থাকায় ১ জুন হাসপাতালে ভর্তি হন মোহাম্মদ নাসিম। সেখানে করোনা ভাইরাস পরীক্ষার জন্য তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। রাতে ঐ পরীক্ষার ফল ‘পজিটিভ’ আসে। এরপর তিন দিনে শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও ৫ জুন সকালে তার ব্রেইন স্ট্রোক হয়। ঐ দিনই জরুরিভাবে তার মস্তিষ্কে অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পর চিকিত্সকেরা তাকে ৪৮ ঘণ্টার নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছিলেন। পরে গত ৬ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ১৩ সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। বিকালে মেডিক্যাল বোর্ড সভা করে তার শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করে। চিকিত্সকদের বোর্ড তাকে ৭২ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেন। ঐ সময়ের মধ্যে তার অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে ডিপ কোমায় রাখা হয়। পরে আরো ৭২ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। এর আগে ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী সময় কারাবন্দি অবস্থায় স্ট্রোক করেছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। এবার ছিল তার দ্বিতীয় দফায় স্ট্রোক। গত ৮ জুনের পর দুই দফা তার করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষায় ফল ‘নেগেটিভ’ এলেও লাইফ সাপোর্ট সরানো সম্ভব হয়নি। খবর শুনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও মন্ত্রীরা হাসপাতালে ছুটে যান। বৃষ্টি উপেক্ষা করে সেখানে হাজার হাজার নেতাকর্মী ভিড় করেন।

বাবার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন জয়

গতকাল দুপুরে মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে তানভীর শাকিল জয় সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা জানেন, আপনাদের সকলের প্রিয় মানুষ আমার পিতা মোহাম্মদ নাসিম মৃত্যুবরণ করেছেন। আমার বাবা আমার দাদার মতোই সারাজীবন মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন। আমাদের পরিবারের সকলে মিলে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যে মানুষটি দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন, সে মানুষটির মৃত্যুর পরও দেশের মানুষের কোনো ক্ষতি হোক এ রকম কোনো কিছু আমরা হতে দিতে পারি না। তাই করোনা মহামারির কারণে সিরাজগঞ্জের লাখ লাখ মানুষের চোখের জল উপেক্ষা করে হলেও আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আজ রবিবার ওনার জানাজা বনানী জামে মসজিদে করা হবে। আমি সকলকে অনুরোধ করব, আপনারা আপনাদের নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মন থেকে দোয়া করবেন, দূর থেকে দোয়া করবেন।’

শোকবিহ্বল সিরাজগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গন

মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুর খবর শুনে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই সিরাজগঞ্জ শহরের এসএস রোডের জেলা আওয়ামী লীগ, কাজীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালসহ সমগ্র জেলার নেতাকর্মীরা তাদের দলীয় অফিসে ভিড় জমাতে থাকেন। এ সময় নেতাকর্মীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও শোকের ছায়া নেমে আসে। তার মৃত্যুতে সিরাজগঞ্জ রাজনৈতিক অভিভাবক হারাল বলে জানিয়েছেন দলীয় নেতা ও সাধারণ মানুষ। জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জেলাব্যাপী সাত দিনের শোকসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।  আগামী তিন দিন মোহাম্মদ নাসিম এমপির রুহের মাগফেরাত ও শান্তি কামনায় জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে পবিত্র কোরআনখানির আয়োজন করা হয়েছে।

জন্ম :২ এপ্রিল ১৯৪৮                            মৃত্যু :১৩ জুন ২০২০