আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহর মৃত্যুতে সর্বসম্মতিক্রমে শোকপ্রস্তাব গৃহীত হয়েছে জাতীয় সংসদে। গতকাল রবিবার সংসদে এ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার আগে শোকপ্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিতে গিয়ে একাধিকবার বাকরুদ্ধ হয়ে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বক্তব্য দিতে গিয়ে অন্তত দুইবার তিনি থেমেও যান। এ সময় তাকে চোখ মুছতে দেখা যায়। বলেন, ‘আমার খুব কষ্ট হচ্ছে বলতে। অনেক কষ্ট বুকে নিয়ে আজ এখানে দাঁড়াতে হচ্ছে। এভাবে সবাইকে হারানো খুবই দুঃখজনক।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ আমি সংসদে আসব। কিন্তু অনেক জায়গা থেকে আমাকে সংসদে আসতে নিষেধ করা হয়েছিল। ভীষণভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, না না আপনি যাবেন না। তা আমি বললাম—হুমকি, গুলি, বোমা, গ্রেনেড কত কিছুই তো মোকাবিলা করে করে এ পর্যন্ত এসেছি। এখন কী একটা অদৃশ্য শক্তির ভয়ে ভীত হয়ে থাকব! পার্লামেন্টের মেম্বার, আমাদের আওয়ামী লীগের পরিবারের একজন সংসদ সদস্য—তাকে হারিয়েছি, আমাদের কেবিনেটের একজন সদস্য তাকেও হারালাম। আর সেখানে আমি সংসদে যাবো না, এটা তো হয় না।’
মরহুম মোহাম্মদ নাসিম ও শেখ আবদুল্লাহকে স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, একই দিনে পরপর দুই জনের মৃত্যু খুবই কষ্টকর। আমাদের এই সংসদে বারবার শোক প্রস্তাব আনতে হচ্ছে। আমি দেশে ফেরার পর রাজনীতি করার মত ছিল না। পদে পদে আমাকে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এ সময় যে দুই জনকে আমি সবসময় পাশে পেয়েছি, একই দিনে তাদের হারালাম।
আবেগাপ্লুত প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাত্র ১০ তারিখে আমরা পার্লামেন্ট শুরু করলাম। তখন একজন সংসদ সদস্য মৃত্যুবরণ করেছেন। শোক প্রস্তাব নিয়েছি। কয়েকটা দিন গেল। আজ ১৪ তারিখ। আমরা হারালাম আমাদের সংসদের সদস্য মোহাম্মদ নাসিমকে। সকালে পেলাম তার মৃত্যুর খবর, আর রাতে ১০টা সাড়ে ১০টায় আবদুল্লাহ সাহেবের কথা শুনলাম অসুস্থ। হাসপাতালে নিতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে না গিয়ে নিয়ে যাওয়া হল সিএমএইচে। যাওয়ার পথে জাহাঙ্গীর গেট পার হতে না হতে একটা অ্যাটাক হলো। খুব অল্প সময়ের মধ্যে পরপর তিনটা অ্যাটাক। একই দিনে দইু জনের মৃত্যু। আমাদের জন্য এত কষ্টকর!
মোহাম্মদ নাসিমকে নিয়ে আলোচনাকালে শেখ হাসিনা তার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহিদ মনসুর আলীর প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, ‘পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক মনসুর আলী সাহেবকে ডেকে নিয়ে মন্ত্রী করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেছিলেন, তোমার হাতে বঙ্গবন্ধুর রক্ত, তুমি কী করে ভাবলা তোমার কেবিনেটে আমি আসবো! তারপর তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।’ নাসিমকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদ নাসিম রাজনৈতিক নেতা হিসেবে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। ১৯৮১ সালে আমি যখন দেশে ফিরে আসি, তখন আমার একটা প্রচেষ্টা ছিল শহিদ পরিবারের যারা ছিল, তাদের একসঙ্গে করে সাথে নিয়ে আসা। আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং আরো শক্তিশালী করে গড়ে তোলা। সেই কাজটি করতে গিয়ে সবসময় নাসিম ভাইকে পাশে পেয়েছি। নাসিম ভাই অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। তিনি যে কোনো অবস্থা মোকাবিলা করতে যেতেন। আর এটা করতে গিয়ে বারবার তার ওপর হামলা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোহাম্মদ নাসিমের ওপর জিয়াউর রহমানের আমলে অত্যাচার হয়েছে। জেনারেল এরশাদ সাহেব যখন ক্ষমতায় তখনও। এরপরে খালেদা জিয়ার আমলে অত্যাচারের সীমা ছিল না। তারপর ওয়ান-ইলেভেনে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই সময় তার ব্রেইন স্ট্রোক করে। তিনি ব্রেইন স্ট্রোক করে পড়েছিলেন। ঐ সময় কারাবন্দি সালমান এফ রহমানের জন্য তার ছেলে একটি অ্যাম্বুলেন্স সবসময় জেলগেটে রাখত। নাসিম ভাইকে হাসপাতালে নিতে ঐ অ্যাম্বুলেন্সে ঠাঁই দেওয়া হয়েছিল। তখন সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পেরেছিল বলেই সে যাত্রায় নাসিম ভাই বেঁচে গিয়েছিলেন। ঐ ব্রেইন স্ট্রোকে তার একটা দিক প্যারালাইজড হয়ে যায়। ঐ সময় অ্যাম্বুলেন্স টানা পাওয়া না গেলে, হাসপাতালে না নেওয়া গেলে তিনি মরে পড়ে থাকতেন।
প্রয়াত ধর্ম প্রতিমন্ত্রীকে স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমি দেশে আসার পর থেকে আব্দুল্লাহ সাহেবকে পেয়েছি। তিনি মনি ভাইয়ের সঙ্গে ছিলেন। শুধু আমার নির্বাচন পরিচালনাই নয়, আমার নির্বাচনি এলাকার সবকিছু তার দেখাশোনা করতে হতো। রাজনীতিতে গোপালগঞ্জবাসী কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন। জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া যখন যে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের যেন একটি লক্ষ্যই ছিল গোপালগঞ্জের ওপর হাত দেওয়া। আমাদের বহু নেতাকর্মী নির্যাতিত হয়েছেন। সে সময়গুলোতে সংগঠনকে ধরে রাখা, নেতা-কর্মীদের দিকে নজর দেওয়া এই কাজগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আব্দুল্লাহ সাহেব করে গেছেন। আমি সরকার বা বিরোধী দল যেখানেই থাকি না কেন, আমার নির্বাচনি এলাকা আব্দুল্লাহ সাহেব দেখতেন। তার মৃত্যু আমাদের জন্য বিরাট ক্ষতি।
তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসা কয়েকটি ভাগে বিভক্ত ছিল। সেগুলোকে এক করে তাদের একটি সনদ দেওয়া, নীতিমালা ও আইন করা, সেই আইন পাশ করার জন্য আমি আব্দুল্লাহ সাহেব ও আমার মিলিটারি সেক্রেটারি জয়নাল আবেদিন সাহেবকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। তারা দুজনই ঠান্ডা মাথার লোক, সুন্দরভাবে কাজটি করেছেন। আজ সেই দুজনই নেই।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আওয়ামী লীগের যে কোনো একজন কর্মী মারা গেলে ছুটে গিয়েছি। জানাজায় অংশ নেওয়া, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো, পরিবারের সঙ্গে দেখা করা—এটা ঐতিহ্য। কিন্তু এখন এমন একটা অস্বাভাবিক পরিবেশ, সেটা আর করতে পারছি না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একটু দেখা করা, তাদেরকে একটু সান্ত্বনা দেওয়া- সেই সুযোগটা পেলাম না কেন, এটা সব থেকে কষ্টকর।
করোনার ভয়ে মানুষকে না খাইয়ে মারতে পারি না
করোনা ভাইরাসের মহামারির মধ্যে বিধিনিষেধ শিথিল করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করার কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা তো বাস্তবতা- করোনার ভয়ে তো আমরা মানুষকে না খাইয়ে মারতে পারি না। তাদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থাটা আমাদের নিতে হবে।
তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসের আতঙ্কটা এমন পর্যায়ে চলে যাচ্ছে যেটা সত্যি খুব দুঃখজনক। এখানে উন্নত দেশ, অনুন্নত দেশ বা উন্নয়নশীল দেশ, অস্ত্রের দিক থেকে শক্তিশালী, অর্থের দিক থেকে শক্তিশালী অথবা দরিদ্র রাষ্ট্র- কোনো ভেদাভেদ নেই। সব যেন এক হয়ে গেছে এক করোনা ভাইরাসের ভয় এবং আতঙ্কে। সব জায়গায় কিন্তু একই অবস্থা। একটা আতঙ্ক-ভয়-ভীতি, মৃত্যু আতঙ্ক যেন সারা বিশ্বকে পেয়ে বসেছে। এটাই হচ্ছে অদ্ভুত ব্যাপার। এ ধরনের পরিবেশ আগে আমরা আর কখনো দেখিনি।
অন্যরা যা বললেন
শোক প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেন, মোহাম্মদ নাসিম শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত রাজনীতিতে ছিলেন, সংগ্রামে ছিলেন। সংকটে কখনো ভেঙ্গে না পড়লেও তিনি পরাস্ত হয়েছেন মৃত্যুর কাছে। জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা জি এম কাদের বলেন, মোহাম্মদ নাসিম ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল, বিনয়ী, ভদ্র ও সদালাপী। প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা এক জন মানুষ ছিলেন। জাপার জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, এক এক করে আমরা অনেককে হারিয়ে ফেলছি। করোনার কারণে আমরা তাদেরকে শেষ দেখাটাও দেখতে পারছি না। কি ভয়ংকর অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করে আমাদেরকে বাঁচতে হচ্ছে। শোক প্রস্তাবের ওপর অন্যদের মধ্যে আওয়ামী লীগের মৃণাল কান্তি দাস ও ডা. হাবিবে মিল্লাত এবং ওয়ার্কার্স পার্টির মুস্তফা লুত্ফুল্লাহ আলোচনায় অংশ নেন। পরে প্রয়াত দুই নেতার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে সংসদে মোনাজাত করা হয়। এর আগে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া মোনাজাত পরিচালনা করেন। পরে সংসদের বৈঠক আজ সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
