আমাদের টেলিভিশন মিডিয়ায় ২০১৮ সালে প্রচারিত হয়েছে অসংখ্য নাটক, টেলিফিল্ম ও অনুষ্ঠান। দর্শকদের কাছে কেমন ছিল এসব নাটক ও অনুষ্ঠান কিংবা চ্যানেলগুলো তাদের প্রচারিত অনুষ্ঠান দিয়ে দর্শকদের কতটুকু আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন, তারই হিসাব-নিকাশ নিয়ে এবারের আয়োজন। লিখেছেন আনন্দ বিনোদন-এর বিভাগীয় সম্পাদক খালেদ আহমেদ
আমাদের দেশের সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো গত বছরে বেশ কিছু ভালো নাটক ও অনুষ্ঠান প্রচারের মধ্য দিয়ে গত বছরটি পার করেছে। গত বছরের সেরা কাজের মধ্যে দুই ঈদের নাটকগুলো বেশ ভালো ছিল। তবে ২০১৮ সালে ভালো নাটকের সংখ্যা একটু কম ছিল। ধারাবাহিক নাটকের চেয়ে গত বছর এক খণ্ডের নাটকের দর্শক ছিল বেশি। গল্প ও নির্মাণশৈলী সুন্দর না থাকায় বেশিরভাগ ধারাবাহিক নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন দর্শক। অন্যদিকে অতিরিক্ত সময় ধরে বিজ্ঞাপন প্রচারের কারণে পাশ কাটিয়ে দর্শকের মনোযোগ আকর্ষিত হয়েছে কয়েকটি ধারাবাহিক নাটক। আবার তরুণ অভিনয়শিল্পীদের অনেকেই টেলিভিশন নাটক থেকে চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। এতেও নতুন ধরনের সংকটে পড়েছেন নির্মাতারা। নতুন শিল্পীদের সুযোগ না দিয়ে এক খণ্ডের নাটকগুলোয় ঘুরেফিরে কয়েকজন অভিনয়শিল্পীকেই বেশি দেখা গেছে। যা টিভি নাটকের জন্য শুভকর নয়। ছোটপর্দার জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী চঞ্চল চৌধুরী, মোশাররফ করিম, সজল, আফরান নিশো, নাঈম, তাহসান, তৌসিফ, জোভান, মম, মেহজাবিন, তানজিন তিশা, সাবিলা নূর, সাফা কবির, শারলিন ফারজানাকে নিয়ে এক খণ্ডের নাটক বেশি প্রচারিত হয়েছে এ বছর। নুসরাত ইমরোজ তিশা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য নাটকে সেভাবে ব্যস্ত ছিলেন না। গতানুগতিক কিছু নাটকেই তাকে অভিনয় করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে বড় পর্দা থেকে এসে ইমন, নিরব এ বছর বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করেছেন। শখকে খুব কম নাটকে অভিনয়ে দেখা গেছে। ব্যক্তিগত জীবন নিয়েই বেশি ব্যস্ত থেকেছেন এ মডেল অভিনেত্রী। সংসার ও উচ্চতর গবেষণা কাজে সময় দেওয়ার জন্য এ বছরও অভিনয়ে কম দেখা গেছে সুমাইয়া শিমুকে। নাদিয়াকে নৃত্যশিল্পের চেয়ে অভিনয়েই বেশি দেখা গেছে। দীর্ঘ ধারাবাহিক নাটকের প্রযোজক হিসেবে এ বছর আত্মপ্রকাশ করেছেন মোশাররফ করিম। চঞ্চল চৌধুরী বেশ কিছুদিন সিনেমায় অভিনয়ের কারণে নাটকে অনুপস্থিত ছিলেন। তবে বছরের শেষভাগে নাটকে এসে ফিরেছেন পুরোনো ছন্দে। মাহফুজ আহমেদ বছরজুড়ে অভিনয়ে সময় দিয়েছেন খুবই কম। জাহিদ হাসান অভিনয়ের পাশাপাশি উপদেষ্টা পরিচালক হিসেবে ব্যস্ত ছিলেন। অভিনেত্রী ঈশিতা গত ঈদে ২টি নাটকে অভিনয় করেছিলেন। এ ছাড়া বছরের শেষ দিকে এসে মিউজিক ভিডিওতে দেখা গেছে তাকে। আনিসুর রহমান মিলন সিনেমার কাজের জন্য নাটকে খুব বেশি নিয়মিত ছিলেন না। বছরের শেষ প্রান্তে বুদ্ধিজীবী দিবসের নাটকে অভিনয়ে দেখা গেছে শমী কায়সারকে। একটি ধারাবাহিক নাটক ছাড়া সেভাবে আর ছোট পর্দায় ছিলেন না সোহানা সাবা। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় বেশ কিছু ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখেছেন দর্শক। এ বছরের হানিফ সংকেতের ‘ইত্যাদি’র চারটি পর্ব প্রচারিত হয়েছে। দর্শকপ্রিয়তায় এটিই ছিল সেরা। পাশাপাশি আনজাম মাসুদের উপস্থাপনায় ‘পরিবর্তন’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানটিও দর্শকের কাছে সমাদৃত হয়েছে। শাইখ সিরাজের কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘হূদয়ে মাটি ও মানুষ’ ও ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ প্রশংসিত ছিল। শিশুতোষ অনুষ্ঠান প্রচার করে এ বছরও বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে দুরন্ত টিভি। অন্যদিকে নির্মাণগুণে দর্শকের পছন্দের শীর্ষে ছিল মাসুদ সেজানের পরিচালনায় ‘চরিত্র স্ত্রী :চরিত্র স্বামী’, ‘হিরো কেন ভিলেন’ ও ‘গরিব কেন কাঁদে’ নাটকগুলো। সালাউদ্দিন লাভলুর পরিচালনায় ‘মায়াজাল’, ‘ফেসবুকে বিবাহ’, ‘চিরকুমার মনে মনে’ ও ‘বুকের ভেতর নূপুর বাজে’ নাটকগুলো প্রশংসিত হয়েছে। সাগর জাহানের পরিচালনায় ‘ফ্যাটম্যান ফ্যান্টাস্টিক’, ‘মাধবীলতা, ‘সোনালি ইলিশের গল্প’ ও ‘কথা রেখেছিলাম’ নাটকগুলোও দর্শক মনে দাগ কেটেছে। দুই ঈদে সাজ্জাদ সুমন পরিচালিত ‘কলুর বলদ’ নাটকটি দেশি এবং প্রবাসী দর্শকরা আগ্রহ নিয়ে দেখেছেন। তরুণ নির্মাতা মাহমুদ দিদারের ‘এই শহরে আমাদের কোনো ঘর নাই’, ‘ইতি সিনেমা’, ‘শরতের বিহবল পাখিগুলো’ ও ‘গল্পের সব চরিত্র সম্পর্কে জানতে নেই’ নাটকগুলো তরুণ দর্শকদের কাছে সাড়া জাগিয়েছে। আফজাল হোসেনের পরিচালনায় ‘ছোটকাকু’ ধারাবাহিক নাটকের সব পর্বই, বিশেষ করে শিশু দর্শকরা আগ্রহ নিয়ে দেখেছে। আমাদের টিভি মিডিয়ায় গত বছর বেশকিছু ঘটনা ছিল, যা আলোচিত বলা যায়। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো গত বছর ছোট পর্দার দুই অভিনয়শিল্পী অ্যালেন শুভ্র ও সারিকাকে নিষিদ্ধ করে ডিরেক্টরস গিল্ডসহ টেলিভিশন নাটক নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলো। অ্যালেন শুভ্রর বিরুদ্ধে নাট্য পরিচালক নিয়াজ মাহবুবকে ইট দিয়ে আঘাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে তিন মাসের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা গত ১০ মে থেকে কার্যকর করা হয়েছিল। তিন মাস পর অ্যালেন অভিনয়ে নিয়মিত হন। এদিকে ‘অশিল্পীসুলভ আচরণ’-এর জন্য অভিনয় শিল্পী সংঘের সদস্য সারিকা সাবরিনকে ছয় মাসের জন্য নিষিদ্ধ করে টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রোডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টেলিপ্যাব)। গত ১ আগস্ট থেকে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। গত ১০ এপ্রিল সারিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন প্রযোজক মোহাম্মদ বোরহান খান। পরে সারিকা ক্ষমা চাইলে শাস্তি বাতিল করা হয়। অতঃপর কাজে ফেরেন সারিকা। ফেসবুকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গত ৪ আগস্ট আটক হন টেলিভিশন ও বড় পর্দার অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদ। উত্তরায় শুটিং স্পট থেকে আটক করা হয় তাকে। জিগাতলায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিষয়ে ফেসবুক লাইভে এসেছিলেন নওশাবা। পরে তিনি জামিনে ছাড়া পান। দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় টেলিভিশন নাট্য নির্মাতাদের সংগঠন ডিরেক্টরস গিল্ডের। গত ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন অভিনেতা ও নির্মাতা সালাহউদ্দিন লাভলু এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এসএ হক অলিক। আগামী দুই বছর নাট্য পরিচালকদের নেতৃত্ব দেবেন তারা। ছোট পর্দার অভিনেত্রী শ্রাবন্তী যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। সংসার করছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আলমের সঙ্গে। দীর্ঘদিনের সংসার ভেঙেছে এ বছর। তালাকের নোটিশ পেয়ে দেশে এসে সংসার জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে গত অক্টোবর আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেছেন তিনি। ১৮ ডিসেম্বর ছোটপর্দার অভিনেত্রী শবনম ফারিয়ার বিয়ে সম্পন্ন হয়। একটি বেসরকারি বিপণন সংস্থার জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হারুনুর রশীদ অপুকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন এ তারকা। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে সংসার ভেঙে গেছে লাক্স তারকা ইশরাত জাহান চৈতির। ৩ বছরের মাথায় স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবনের ইতি টানলেন ছোটপর্দার এই অভিনয়শিল্পী। এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে শোবিজ অঙ্গনের অনেকেই নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়নপত্র কিনেন। এরই মধ্যে বেশিরভাগই পছন্দের দল থেকে মনোনয়ন পাননি। অল্প কয়েকজন আছেন যারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। নতুন বছরে প্রত্যাশা হলো—আমাদের নতুন নতুন অনেক ভালো নির্মাতা আছেন। কিন্তু বাজেটের সমস্যার কারণে তারা ঠিকঠাক কাজ করতে পারেন না। তাই সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষতা আর আমাদের মেধা দিয়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। যাতে করে জীবনের নানামুখী চাপ সামলে মানুষ একটু স্বস্তি পান এবং দর্শকরা সুস্থ বিনোদনে বিনোদিত হতে পারেন।
