ভাটা পড়লে জোয়ার তো আসবেই। বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের ক্ষেত্রেও তেমনি এক জোয়ারের বছর ২০১৮ সাল। বছরটিতে প্রায় পঞ্চাশটির মতো নতুন নাটক মঞ্চে এনেছে বাংলাদেশের নাট্যদলগুলো। নতুন নাটকে যেমন মৌলিক রচনা ছিল, তেমনি ছিল বিদেশি নাটকের অনুবাদ-রূপান্তর আবার সরাসরি ইংরেজি নাটকের মঞ্চায়নও ছিল। পুরাতন নাটকের নতুন স্বাদ দিতে দলের নন্দিত প্রযোজনা নতুন আঙ্গিকে মঞ্চে আনাও ছিল উল্লেখ্য। কিছু কিছু দলের উত্সব আয়োজন নিয়মিত ঘটনা। পদক প্রদান ও প্রাপ্তিতেও ঘটেছে নতুনত্ব। দলগুলোর দেশের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশকে নাটকের মাধ্যমে উপস্থাপন ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটারের ভূমিকাও ছিল প্রশংসনীয়। বলতে গেলে বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের জন্য শুভ ছিল ২০১৮ সাল। সারা বছরের খেরখাতা তৈরি করা একটি জটিল কাজই বটে। এতে মনক্ষুণ্নতা যেমন তৈরি হয়, তেমনি আনন্দও আছে। মনঃক্ষুণ্নতা ঝেড়ে ফেলে আনন্দ বাড়িয়ে তুলতেই এবারের লেখা। মৌলিক রচনা বোধকরি আমাদের জন্য সব থেকে আনন্দময় উপলব্ধি। তাই এবারে আমার দেখা দেশের পাঁচটি নন্দিত, আলোচিত ও সমালোচিত নাটকের উল্লেখ করতে চাই।
হাছনজানের রাজা
প্রাঙ্গণেমোর বাংলাদেশের অন্যতম নন্দিত নাট্যদল। তাদের ২০১৮-এর ব্যতিক্রমী প্রযোজনা মরমী সাধক হাছন রাজার জীবনী নিয়ে শাকুর মজিদের রচনা হাছনজানের রাজা। একজন মদ্যপ জমিদারের জীবন কিভাবে শিল্পের আলোর দুয়ারে এলো তারই মর্মকথা কাব্যের ঢঙে লেখা এই নাটকটির নির্দেশনা দেন দলের অন্যতম প্রধানব্যক্তি অনন্ত হিরা। অভিনয়শিল্পীদের প্রাঞ্জল অভিনয় আলোচনায় নিয়ে আসে নাটকটিকে। এর মধ্যেই বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন জায়গায় নাটকটির সফল মঞ্চায়ন নজর কাড়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বোদ্ধাদের। এপ্রিলের ২০ তারিখে মঞ্চায়নের পর দিনে দিনে প্রশংসিত হচ্ছে হাছনজানের রাজা।
রুধিররঙ্গিণী
‘রুধিররঙ্গিণী’ এক ভাগ্যাহত নারীর গল্প। ১৫ মে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নাটকের সফল উদ্বোধনী মঞ্চায়ন সম্পন্ন হয়। গল্পের বয়ান করেছেন নাট্যকার শুভাশিস সিনহা। কাব্যের ঢঙে গল্পের বয়ানের পাশাপাশি নির্দেশনার কাজটাও তিনিই করেছেন। নাটকের ভাঁজপত্রে তিনি মিথ বা ইতিহাসের উল্টোবাখান বা অ্যান্টিথিসিসের কথা বলেছেন যার আলোচনা বা পর্যালোচনা প্রশ্ন রেখে দেয় দর্শক মনে। আবার প্রতিবাস্তবতা বা অ্যান্টিরিয়েলিটির পথ ধরে গ্রন্থিত বলে ভাঁজপত্রে যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন নাট্যকার তাও কতটা যুক্তিযুক্ত সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ করে। সেই সঙ্গে নাটকে দর্শকের সুযোগ হয়েছে তিন প্রজন্মের তিনজন গুণী অভিনয় আজাদ আবুল কালাম, রোকেয়া রফিক বেবী ও জ্যোতি সিনহাকে এই নাটকে অভিনয় করতে দেখার।
ভাগ্যাহত নারী দুইবার স্বামী হারানোর পর তৃতীয় একজনের জন্য ব্যাকুল। সে একজন বংশীবাদক। মেয়েটি তার মায়ের সঙ্গে জড়িয়ে পরে নানা তর্ক-বিতর্কে। সে ছুটে যায় সেই বংশীবাদককে পাওয়ার জন্য। ছুটে যায় শঙ্খনদীতীরে এক বংশীবাদকের কাছে। যে বংশীবাদকের কাছে সে ছুটে যায় সবকিছু উপেক্ষা করে সে তাকে প্রত্যাখ্যান করতে চায়। কারণ সেও এক ভাগ্যাহত পুরুষ যে কিনা নিজ হাতে হত্যা করেছে নিজেরই পিতাকে। রুধিররঙ্গিণী নাটকের মাধ্যমে নতুন একটি রেপার্টরি হূত্মঞ্চ আবির্ভাব হয় বাংলাদেশে।
রূপসুন্দরী
নাট্যলোক সিরাজগঞ্জ বছরের শুরুর দিকে—ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখে বাংলাদেশের মঞ্চে এনেছে তাদের নতুন প্রযোজনা রূপসুন্দরী। প্রাচ্য আয়োজিত পুবের নাট্যগাথা শিরোনামে তারা আয়োজন করে বাংলাদেশের পাঁচটি মৌলিক নাটকের। সেখানে অংশ নেয় নাট্যলোকের রূপসুন্দরী নাটক। এ ছাড়াও বাংলাদেশে অনির্বাণ একুশে নাট্যমেলা এবং নাট্য নিকেতনের উত্সবে নাটক প্রদর্শনীর পর নন্দিত হয় নাট্যলোকের ৭ম প্রযোজনা ‘রূপসুন্দরী’।
পুণ্ড্রে প্রায় হাজার বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র শীলাদেবী। সতীত্ব রক্ষার জন্য খরস্রোতা করতোয়া নদীর জলে আত্মাহুতি দেয়। একসময় তার লাশ ভেসে ওঠার স্থানে পূণ্যস্নান ও বান্নির মেলার আয়োজন হয়। আবার এ ঘটনের ঐতিহাসিক ভিত্তি ক্ষীণ স্পষ্ট। ঘটনা যাই হোক, নাট্যকারের মনের পীড়া ছিল শীলাদেবীর আত্মাহুতি; তাও আবার সতীত্ব রক্ষার জন্য! সেই পীড়া দমনের নিমিত্তে আরও প্রায় নয় শ বছর এগিয়ে এসে ব্রিটিশ শাসনের ক্রান্তিলগ্নের সময়কে আশ্রয় করে একটি গল্পের রূপায়ণ করেছেন নাট্যকার মাহবুব আলম—তার নাম রূপসুন্দরী। নাট্যকার মাহবুব আলম শীলাদেবীর এক পরিবর্তিত রূপ নির্মাণের চেষ্টা করেছেন ভিন্ন প্রেক্ষাপট রচনার মধ্যে দিয়ে। ‘রূপসুন্দরী’ নাটকে তিনি তুলে ধরেছেন নারীর চিরায়ত একটি নির্যাতনের চিত্র। আর নির্দেশক অনিক কুমার সাহার নির্দেশনার গুনে সেই চিত্র আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
শ্রাবণ ট্র্যাজেডি
বাংলাদেশের অন্যতম গুণী নাট্যকার আনন জামানের একটি বিশেষ মৌলিক নাটক শ্রাবণ ট্রাজেডি। বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যার যে নীল নকশা মোস্তাক আহমেদ ও তার সহচররা রচনা করেছিল এবং তাদের সেই পরিকল্পনার সফলতায় বাংলাদেশ হারিয়েছিল তার সূর্য সন্তান। শ্রাবণ মাসের সেই ট্র্যাজেডিকে কাব্যকথায় লিপিবদ্ধ করেছেন গুণী এই নাট্যকার। নাট্যকারের চিত্র আরও প্রাণবন্ত করে মঞ্চে তুলে ধরেছেন নির্দেশক আশিকুর রহমান লিয়ন। বঙ্গবন্ধু বা তার পরিবারের এমন ট্র্যাজেডি নিয়ে বাংলা সাহিত্যে এই প্রথম মঞ্চ নাটক হওয়ায় তা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান করে নেয়। সাংস্কৃতিককর্মীসহ নানা মহলে মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের শ্রাবণ ট্রাজেডি সমাদৃত হয় বেশ ভালো ভাবেই। ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হয় নাটকটি।
মহাস্থান
কাল পরিক্রমায় করতোয়া নদীর অববাহিকায় সমতল ভূমিতে গড়ে ওঠে একটি জনপদ। নাম তার পুণ্ড্র। নানা কারণে আজ সে মহাস্থান নামে পরিচিত। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রযোজনা প্রত্ননাটক ‘মহাস্থান’-এর রচয়িতা ড. সেলিম মোজাহার এবং পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। বাংলাদেশে এত বড় পরিসরে আর কোনো নাটক হয়নি। ‘মহাস্থান’ নাটকের মোট শিল্পী ৩৫০ জন। নাটকের উপস্থাপন অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ছিল বলে দর্শক বেশ উপভোগও করেছেন। প্রায় দুই বছরের মহড়া শেষে বছরের শেষের দিকে নাটকটি প্রদর্শিত হয় বগুড়া জেলার প্রত্ন অঞ্চল ভাসুবিহারে। দীর্ঘ দিনের মহড়া, নাটকের কলাকুশলীর সংখ্যা, বাজেট, নামকরণ বিভিন্ন কারণে মহাস্থান নাটক ছিল আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রে। বহু আলোচনার অবসান ঘটিয়ে নাটকটির উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হয় গত ২৩ নভেম্বর সন্ধ্যায়।
উল্লেখযোগ্য
ইংরেজি নাটক :অ্যান ইন্সপেক্টর কলস (যাত্রিক)
রূপান্তর নাটক :ওপেন কাপল (নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়)
অনুবাদ নাটক :ডিয়ার লায়ার (নাট্যম রেপার্টরি)
নব মঞ্চায়ন :সঙক্রান্তি (আরণ্যক), গ্যালিলিও (নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়)
