বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে জীববৈচিত্র্য হলো উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীবসহ পৃথিবীর গোটা জীবসম্ভার— তাদের অন্তর্গত জিন ও সেগুলোর সমন্বয়ে গঠিত বাস্তুতন্ত্র। একটি প্রজাতিকে পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে অন্য প্রজাতির ওপর নির্ভরশীল হতে হয়—এই নির্ভরশীলতাই হচ্ছে জীববৈচিত্র্যের মূল বিষয়। প্রাণিজগতের কোনো প্রাণীই চিরকালের জন্য পৃথিবীতে বিরাজ করতে আসেনি। প্রাকৃতিকভাবেই বিবর্তনের একটি অন্যতম ধাপ হলো প্রজাতির বিলুপ্তি। পৃথিবীর আদি থেকেই অসংখ্য প্রজাতি আলোর মুখ দেখেছে আবার কালের গহ্বরে হারিয়েও গিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, একেকটি প্রজাতি পৃথিবীতে অন্তত পাঁচ থেকে ১০ লাখ বছর টিকে থাকতে পারে। এ সময়েই এরা বিবর্তিত হয়ে নতুন প্রজন্মের উন্মেষ ঘটায়।
আইইউসিএন অনুসারে প্রায় ১০% উদ্ভিদ এরই মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় বাংলাদেশে, কিছু এখনো বিশ্বের অন্যান্য অংশে রয়েছে তবে দেশীয় প্রজাতিগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ১৭টি প্রজাতির মেরুদণ্ডী প্রাণী হারিয়ে গিয়েছে এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে ৭৯৯টি প্রজাতি বিলুপ্ত। চরম জলবায়ু সংক্রান্ত ঘটনা, আবাসস্থল হ্রাস, বন উজাড়করণ ইত্যাদির ফলে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। আইইউসিএন আরো বলেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০% জীববৈচিত্র্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
জীববৈচিত্র্য হ্রাসের জন্য অনেকগুলো হুমকি রয়েছে যার মধ্যে কিছু প্রত্যক্ষ ও গতিশীল এবং অন্যগুলো পরোক্ষ। হুমকিগুলোর মধ্যে রয়েছে—দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন, বন ও জলাভূমিকে কৃষিক্ষেত্রে রূপান্তর বা ভূমি ব্যবহারের অন্যান্য রূপ, দুর্লভ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জনসংখ্যার চাপ, বায়ু এবং জলদূষণের বিভাজন, জলবিদ্যুত্ ব্যবস্থার পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত সংগ্রহ। সেই সঙ্গে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার করে খাদ্যশস্য উত্পাদন বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অঞ্চল বা প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ হস্তক্ষেপ, জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন (যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চল, কক্সবাজার এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপ), জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
জীববৈচিত্র্য কৃষি, ফিশারি, গবাদি পশু, বনজ এবং প্রকৃতিভিত্তিক পর্যটনের ক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। দেশের জিডিপিতে এ পাঁচটি সেক্টরের সম্মিলিত অবদান প্রায় ২৫ শতাংশ। বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য—সুন্দরবন অর্ধমিলিয়ন পরিবারের জন্য জীবিকা এবং কর্মসংস্থান সরবরাহ করে। প্রতিদিন ৬০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ জলজ সম্পদের ওপর নির্ভর করে এবং দেশের ৬০ শতাংশ প্রোটিনের প্রয়োজনীয়তা মাছের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। জলাভূমি ইকোসিস্টেম (হাওর, বাঁওড়, বিল এবং প্লাবন সমভূমি) মাছ এবং ধান উত্পাদনসহ স্থানীয় মানুষকে বিস্তৃত অর্থনৈতিক সুবিধা প্রদান করে। যেমন গরু, মহিষ এবং হাঁস পালন, ঘাস এবং অন্যান্য গাছপালা সংগ্রহ ইত্যাদি।
বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্ম বেঁচে থাকার জন্য জীববৈচিত্র্যের প্রয়োজন। আর তাই এটির ভারসাম্য বজায় রাখতে সঠিক সংখ্যায় সব প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতির বেঁচে থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে বুঝাতে হবে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় না থাকলে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব কতটুকু ভয়াবহ হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে— জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিকল্প নেই, আর তা করতে হবে মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই।
n লেখক :শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
