আলোকপাত

কৃষি উত্পাদন ও বিপণন কার্যক্রমে ই-কৃষির ব্যবহার

আপডেট : ১৬ জুন ২০২০, ২১:২২

বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব আজ করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সামগ্রিকভাবে বিপর্যস্ত। বাংলাদেশেও দিনদিন বৃদ্ধি পেয়েই চলছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যা আমাদের সামাজিক মেলামেশায় ভীতির সঞ্চার করছে। এমতাবস্তায় স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিল্পখাতে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে। কৃষি উত্পাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে তথ্য আদানপ্রদানের গুরুত্ব বাড়ছে।

বাংলাদেশে মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ কর্মকর্তার সংখ্যা কৃষকের তুলনায় অতি নগণ্য। এদেশে কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট পরিবারের সংখ্যা দেড় কোটির মতো, অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার সংখ্যা মাত্র ১১ হাজার। করোনাকালীন বা পরবর্তী সময়ে দ্রুত কৃষিতথ্য ও পরামর্শ কৃষকের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ই-কৃষি সার্ভিস চালুকরণের মাধ্যমে দ্রুত সময়ে কৃষি তথ্য ও পরামর্শ বিনিময় করতে পারি। মোবাইল, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে চাষাবাদ ও বিপণন সম্পর্কিত কৃষিতথ্য, কৃষিসেবা ও কৃষিপ্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়াকে আমরা ই-কৃষি বলে থাকি। কৃষকেরা ই-কৃষি ব্যবহার করে কৃষি সম্পর্কিত যে কোনো সমস্যার দ্রুত সমাধান পেতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, আমাদের মাঠ পর্যায়ে কৃষকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী সম্প্রসারণ কর্মকতাদের তথ্য প্রযুক্তিবিষয়ক প্রশিক্ষণের অভাবে ই-কৃষিসেবা প্রদানে যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, কৃষি মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষিসংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ই-কৃষিসেবা চালু করেছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ৪৯৯টি কৃষিতথ্য ও যোগাযোগকেন্দ্র (এআইএসএস) স্থাপন করা হয়েছে যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিতথ্য বিস্তারের কাজ চলছে। এছাড়া কৃষি কল সেন্টার-১৬১২৩-এর মাধ্যমে কৃষকেরা কৃষি বিশেষজ্ঞদের সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেয়ে আসছে। কৃষকের জানালা, বালাইনাশক নির্দেশিকা, কৃষিকথা, ফসলি, ছাদকৃষি নামে বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে চাষাবাদ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। Bangladesh Institute of ICT in Development (BIID), গ্রামীণফোন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে ‘ই-কৃষক’ প্রকল্পটি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কৃষি সার্ভিসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মৃত্তিকাসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট জমিতে সারের পরিমাণ নির্ধারণে একটি সফটওয়্যার উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট নিজস্ব তত্ত্বাবধানে ‘Bangladesh Rice Knowledge Bank’ নামে যে ওয়েবসাইট তৈরি করেছে সেখানে বাংলাদেশে এপর্যন্ত উদ্ভাবিত সব জাতের ধান চাষাবাদের পদ্ধতি সম্পর্কিত তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করেছে।

বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ই-কৃষিসেবা বিস্তারে কিছু অন্তরায় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অধিকাংশ কৃষকের অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কারিগরি অদক্ষতা মাঠ পর্যায়ে ই-কৃষিসেবা বিস্তারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে; কিন্তু দেশের কৃষি অর্থনীতি সমৃদ্ধকরণে কৃষকদের ই-কৃষি ব্যবহারের সামর্থ্য অর্জনের মাধ্যমে গবেষক, সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও কৃষকদের সমন্বয় অতিব জরুরি। যেসব কৃষকের মাধ্যমে সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা বিভিন্ন কৃষিপ্রযুক্তি ও কৃষিতথ্য মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ করে সেসব কৃষককে ই-কৃষি বিষয়ে কারিগরি সহযোগিতার পাশাপাশি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট প্রদান করা হলে ই-কৃষি ব্যবহার অনেকাংশেই নিশ্চিত হবে। যা করোনাকালীন বা করোনা-পরবর্তী কৃষি অর্থনীতি সমৃদ্ধকরণ ও ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

n লেখক :শিক্ষক, কৃষি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়