জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ গাছের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাত্ মানুষ ও উদ্ভিদ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উদ্ভিদের নির্গত অক্সিজেন মানুষ শ্বাস হিসেবে নেয়। আর মানুষের নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড উদ্ভিদ গ্রহণ করে। এমন কিছু উদ্ভিদ, ফল, সবজি রয়েছে, যা মানুষ এবং মানুষের বিভিন্ন অঙ্গসদৃশ। এই সাদৃশ্যতার ওপর ভিত্তি করে চিকিত্সাবিজ্ঞানে Doctrine of Signature (DOS) theory, Theory of Similarity (TOS), Law of Similarity এবং Organ by Organ Therapy সৃষ্টি হয়েছে। Doctrine of Signature (DOS) বা মানুষের অঙ্গসাদৃশ্য ভেষজ থেরাপির মূল বক্তব্য হলো, যদি কোনো উদ্ভিদ, প্রাণী ও খনিজের কোনো একটি বৈশিষ্ট্য মানুষের কোনো অঙ্গের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়, তবে সেই অঙ্গের রোগ নিরাময়ে কাজ করে। জিনসেং ও আদমবৃক্ষ মানব শরীরসদৃশ, রসুন হার্টসদৃশ, শিমের বীজ কিডনিসদৃশ, সজনে ডাটা ও বরবটি মেরুদণ্ডসদৃশ, ডালিম রক্তসদৃশ ইত্যাদি। অতএব, এসব অঙ্গের রোগ নিরাময়ে অঙ্গসদৃশ উদ্ভিদের প্রয়োগ DOS Theraphy এর মূল বক্তব্য। হারবাল, কবিরাজি ও আয়ুর্বেদিক চিকিত্সা সম্পূর্ণই উদ্ভিদনির্ভর। গ্রীষ্মকালে যখন ঘর্মাক্ত মানুষের শরীর দিয়ে ঘাম ঝরে, তখনই তরমুজ, তাল, লিচু, আম, আনারস, কাঁঠাল ইত্যাদি রসালো ফলের মৌসুম চলে।
অতএব, মানুষের সঙ্গে উদ্ভিদ জগতের যে গভীর পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান, তা সহজেই অনুমেয়। আসমানি গ্রন্থ পবিত্র তাওরাত শরিফের বর্ণনামতে, আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির তৃতীয় দিনে উদ্ভিদজগত্ সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র তাওরাত শরিফে দুনিয়া সৃষ্টির বিবরণ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে, ‘তারপর ঈশ্বর বললেন, ভূমির ওপরে ঘাস গজিয়ে উঠুক, আর এমন সব শস্য ও শাক-সবজির গাছ হোক, যাদের নিজের নিজের বীজ থাকবে। ভূমির ওপর বিভিন্ন জাতের ফলের গাছও গজিয়ে উঠুক, যেগুলোতে তাদের নিজের ফল ধরবে। আর সেই সব ফলের মধ্যে থাকবে তাদের নিজের নিজের বীজ আর তা-ই হলো। ভূমির মধ্যে ঘাস, নিজের বীজ আছে এমন বিভিন্ন জাতের শস্য ও শাক-সবজির গাছ এবং বিভিন্ন জাতের ফলের গাছের জন্ম হলো; আর সেই সব ফলের মধ্যে তাদের নিজের বীজ ছিল। ঈশ্বর দেখলেন তা চমত্কার হয়েছে। এভাবে সন্ধ্যাও গেল সকালও গেল, আর সেটাই ছিল তৃতীয় দিন।’ (পয়দায়েশ:১১-১৩)
উদ্ভিদজগত্ সৃষ্টি সম্পর্কে সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থ আলকোরআনে কয়েকটি আয়াত রয়েছে। যেমন : ‘তিনিই আল্লাহ আকাশ হতে বারি বর্ষণ করেন; তাতে তোমাদিগের জন্য রহিয়াছে পানীয় এবং তা থেকে জন্মায় উদ্ভিদ, যাহাতে তোমরা পশু চারণ করিয়া থাক। তিনি তোমাদিগের জন্য জন্মান শস্য, জয়তুন, খর্জুর বৃক্ষ, দ্রাক্ষা এবং সর্বপ্রকার ফল।’ (সুরা-১৬ :নাহল ১০-১১) ‘তিনিই (আল্লাহ) আকাশ হতে বারি বর্ষণ করেন, অতঃপর তা দ্বারা তিনি সর্বপ্রকার চারা উদ্গম করেন; অনন্তর তা হতে সবুজ পাতা উদ্গম করেন, পরে তা হতে ঘন সন্নিবিষ্ট শস্যদানা উত্পাদন করেন এবং খেজুর বৃক্ষের মাথি হতে ঝুলন্ত কাঁদি নির্গত করেন আর আঙুরের উদ্যান সৃষ্টি করেন এবং জয়তুন ও ডালিমও; এগুলো একে অন্যের সদৃশ এবং বিসদৃশও যখন তা ফলবান হয় এবং ফলগুলো পরিপক্ব হয় তখন তাদের দিকে লক্ষ্য করো; বিশ্ববাসী সম্প্রদায়ের জন্য তাতে অবশ্য নিদর্শন রয়েছে। (সুরা-৬, আল-আনআম-৯৯) “আকাশ হতে আমি বর্ষণ করি উপকারী বৃষ্টি এবং তা দ্বারা আমি সৃষ্টি করি উদ্যান, শস্য, সবজি ও সমুন্নত খর্জুর বৃক্ষ, যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর। আমার বান্দাদের জীবিকাস্বরূপ। বৃষ্টি দ্বারা আমি সঞ্জীবিত করি মৃত ভূমিকে। এভাবেই পুনরুত্থান ঘটবে।’ (সুরা ৫০ :ক্বাফ :৯-১১) ‘তুমি ভূমিকে দেখ শুষ্ক, অতঃপর তাতে আমি বারি বর্ষণ করলে তা শস্যশ্যামল হয়ে আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদ্গত হয় সর্বপ্রকার কল্যাণকর উদ্ভিদ।’ (সুরা :৩১ :লুকমান :১০)
উদ্ভিদ মানুষের সবচেয়ে ভালো ও উপকারী বন্ধু। সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের জন্য উদ্ভিদের ওপর নির্ভশীল। উদ্ভিদ আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
lলেখক :প্রভাষক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, টিঅ্যান্ডটি কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা
