বজ্রপাত রক্ষায় ‘কৃষকের নিরাপদ ছাউনি’

আপডেট : ১৮ জুন ২০২০, ২১:৫৮

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব নানানভাবে পড়িতে শুরু করিয়াছে। বিশ্বের উষ্ণায়নের ফলে বৃদ্ধি পাইয়াছে বজ্রপাতের সমস্যা। সাধারণত এক ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাইলে বজ্রপাত বৃদ্ধি পায় ১২ শতাংশ। বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরিয়া বজ্রপাতের প্রকোপ তাত্পর্যপূর্ণ হারে বাড়িয়াছে। এই জন্য ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়াছে। বাংলাদেশে জলবায়ুর পরিবর্তন যেমন নানান ক্ষেত্রে প্রকট হইতেছে, তেমনি গ্রামাঞ্চলে আগে খেতখামারের মধ্যেও উঁচু গাছ থাকিত, যাহা বর্তমানে ব্যাপক হারে হ্রাস পাইয়াছে। সকল কিছু মিলাইয়া বজ্রপাত এখন গ্রামাঞ্চলে, বিশেষ করিয়া খেতখামারে কাজ করা কৃষকের নিকট সাক্ষাত্ মৃত্যুদূত হইয়া উঠিয়াছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী ২০১০-২০১৯ এই এক দশকে দেশে বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ৮১। হাওর অঞ্চলে ইহার তীব্রতা ও সংখ্যা বেশি হইলেও উত্তরবঙ্গে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ছিল বেশি।

বজ্রপাত কেবল আমাদের সমস্যা নহে, সমগ্র বিশ্বেই প্রচুর বজ্রপাত ঘটে। কিছু গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে গড়ে প্রতি বত্সর আড়াই সহস্রাধিক বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বত্সর ইহার চাইতে শতগুণ অধিক বজ্রপাত হয়, অথচ ঐ দেশটিতে বজ্রপাতে মৃত্যু হয় ৪০-৫০ জনের। আমাদের দেশে বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি ও জীবনহানির ঘটনা অন্যান্য দেশ অপেক্ষা অধিক হইবার প্রধান কারণ অসচেতনতা এবং বজ্রপাত হইতে সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাব। প্রকৃতপক্ষে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দেশে পরীক্ষিত মডেল থাকিলেও বজ্রপাত ব্যবস্থাপনা এখনো গড়িয়া উঠে নাই। যদিও বজ্রপাতের প্রভাব হ্রাসে দেশব্যাপী তালগাছের চারা রোপণ কর্মসূচির আওতায় ইতিমধ্যে ৩৮ লক্ষ চারা রোপণ করা হইয়াছে। তবে উহার ফল পাইতে অনেক বত্সর অপেক্ষা করিতে হইবে। আমরা দেখিয়াছি, টাওয়ার নির্মাণ করিয়া ভিয়েতনামে এবং বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বজ্রপাতের মৃত্যুর হার ৯০ শতাংশ কমাইয়া আনিয়াছে। বাংলাদেশে বজ্রপাতে যাহারা মৃত্যু বরণ করেন, তাহাদের অধিকাংশই জমিতে কাজ করা কৃষক, জেলে, মত্স্যজীবী ও ঘর-গৃহস্থালির কাজ করা মানুষ। তাহারা অনেকেই জানেন না, বজ্রপাতে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করিতে হইবে। সম্প্রতি গাইবান্ধায় বজ্রপাত হইতে কৃষকদের রক্ষার জন্য ‘কৃষকের নিরাপদ ছাউনি’ নির্মাণে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ লইয়াছে ঐ জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস। তাহাদের এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। গত বত্সরও সমগ্র দেশে বজ্রপাতে ২৩৩ জন কৃষকের মৃত্যু হইয়াছে। সুতরাং ‘কৃষকের নিরাপদ ছাউনি’ আইডিয়া প্রতিটি উপজেলায় বাস্তবায়িত হইলে তাহা অনেক জীবন বাঁচাইবে নিঃসন্দেহে।

জানা যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে দেশের বিভিন্ন মাঠ, প্রান্তর ও রাস্তার পাশে চুম্বকীয় পিলার/শলাকা পুঁতিয়া রাখা হইত। ইহা কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়িয়া বজ্রনিরাপত্তা দিত। উঁচু উঁচু বৃক্ষ রোপণের পাশাপাশি এই ধরনের পিলার বা শলাকা পুনরায় স্থাপন করা যাইতে পারে। ইহার পাশাপাশি, বজ্রপাতের সময় কী করিতে হইবে আর কী করিতে হইবে না—তাহা লইয়া রেডিও, টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় প্রতিনিয়ত সতর্কতার বার্তা প্রচার করা প্রয়োজন।