নবীন সেনাদের ভবিষ্যৎ পথচলায় সেনাপ্রধানের নির্দেশনা

আপডেট : ১৯ জুন ২০২০, ১৫:০৭

ক্যাডেট কমিশন লাভ করা ২৫৫ সেনা অফিসারকে দেশপ্রেম ও সাহসিকতার সাথে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে কাজ করার নির্দেশনা প্রদান করেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির (বিএমএ) ৭৮ তম বিএমএ দীর্ঘ মেয়াদী কোর্স এবং ৫৩তম বিএমএ স্পেশাল কোর্সের অফিসার ক্যাডেটদের কমিশন প্রাপ্তির অনাড়ম্বর এ অনুষ্ঠানে অদম্য পরিণত মেধাবী নবীন কর্মকর্তাদের পথনির্দেশকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ।

পথ নিদর্শক এই বক্তব্যে যুক্তিবোধ, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার নিরবচ্ছিন্ন চর্চার আলোকেই সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথ ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ একটি শক্তিশালী ও সক্ষম বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত প্রায়।’ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন কমিশন প্রাপ্তদের উদ্দেশ্যে সাবলীলভাবে দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্যই উপস্থাপন করেন সেনাপ্রধান।

তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মূর্ত প্রতীক হিসেবেই সর্বদাই দেশপ্রেম ও সাহসিকতার সাথে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে কেউ হুমকির মুখে ফেলে তাহলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার সমুচিত জবাব দেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত এবং সক্ষম।’

আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, এ কুচকাওয়াজের মাধ্যমে ৭৮তম বিএমএ দীর্ঘ মেয়াদী কোর্স এবং ৫৩ বিএমএ স্পেশাল কোর্সের ২৫৫ জন অফিসার ক্যাডেট কমিশন লাভ করেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত অফিসারদের মধ্যে ২৩১ জন পুরুষ ও ২৪ জন মহিলা অফিসার রয়েছেন, যারা সেনাবাহিনীর চলমান ‘অপারেশন কোভিড শিল্ড’-এ উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবেন।

বক্তব্যে বাংলাদেশে মিলিটারি একাডেমির উদ্বোধনকে ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার কঠিন সংগ্রামের মধ্যেও দেশের জন্য একটি আধুনিক সেনাবাহিনী গড়ে তোলার উপর জোর দেন। একটি স্বাধীন দেশের সেনাবাহিনী কোন মূল্যবোধকে ধারণ করে গড়ে উঠবে সে ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর সেই দিক নির্দেশনাসমূহ সঠিকভাবে অনুধাবন করা এবং সেই অনুযায়ী সেনাবাহিনীকে গড়ে তোলা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ১৯৭৪ সালে, কুমিল্লা সেনানিবাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির শুভ উদ্বোধন করেন; যা ছিল এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ঘটনা।’

ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১১ জানুয়ারি, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রথম প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বিদায়ী ক্যাডেটদের পেশাগতভাবে দক্ষ, নৈতিক গুণাবলী সম্পন্ন ও দেশপ্রেমের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মনিয়োগ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছিলেন, যা তোমরা কিছুক্ষণ আগেই শুনেছ। তোমাদের মনে রাখতে হবে যে, বঙ্গবন্ধু কেবল স্বপ্নদ্রষ্টাই নন, স্বপ্ন বাস্তবায়নেও তাঁর দক্ষতা দৃষ্টান্তমূলক। তাই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, কেবল কথা নয় বরং মহান এই নেতার দিক নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করা সম্ভব।’

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত জানিয়ে সেনাপ্রধান বলেন, ‘দেশপ্রেম, প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম এবং দৃঢ় সাংগঠনিক ভিত্তিতে বলীয়ান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মেনেই সেনাবাহিনীর অভিযান পরিকল্পনায় জনগণকে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে যা আমাদের সমরনীতির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য।’

তিনি বলেন, "১৯৭১ সালে রণাঙ্গনেই অভ্যুদয় হয়েছিল আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর। জাতির পিতার নির্দেশনায় প্রণীত হয় ‘প্রতিরক্ষা নীতি-১৯৭৪’ এবং পরবর্তীতে এই নীতির উপর ভিত্তি করেই ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ ও জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি ২০১৮ প্রণীত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথ ধরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আমাদের সেনাবাহিনী আজ একটি শক্তিশালী ও সক্ষম বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত প্রায়।"

দেশপ্রেম ও সাহসিকতার সমন্বয় ঘটাতে হবে এমন মন্তব্য করে ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে সেনাপ্রধান বলেন, ‘অফিসার হিসেবে নিজের মধ্যে দেশপ্রেম, সাহসিকতা, শৃঙ্খলা, সত্যনিষ্ঠা ও পেশাগত জ্ঞানের সঠিক সমন্বয় ঘটাতে হবে। তাহলেই কেবল একজন অফিসার প্রকৃতপক্ষেই আদর্শ নেতৃত্ব প্রদান করতে পারবে। তবে এই গুণাবলীসমূহের সমন্বয় কোন সহজ কাজ নয়। এজন্য তোমাদের প্রত্যেককে নিজেদের দুর্বলতা ও সক্ষমতা সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন করতে হবে।’

পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের পিতামাতা ও পরিবারের সদস্যদের প্রতিও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে জানিয়ে সেনাপ্রধান বলেন, 'আমরা সেনাবাহিনীর সদস্যগণ এই দেশেরই বৃহত্তর সমাজের অংশ। তাই আমাদের সার্বিক কর্মকাণ্ডে সর্বদাই আদর্শ, মানবিকতা ও সহমর্মিতার প্রতিফলন থাকতে হবে।'

ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, 'তোমরা যদি নিজেদেরকে যোগ্য করে গড়ে তোল তাহলেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অতীতের মতো ভবিষ্যতেও দেশের সকল সঙ্কটে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারবে।'

ইত্তেফাক/আরএ