বাজেট বাস্তবায়নে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা জরুরি

আপডেট : ১৯ জুন ২০২০, ২১:১২

করোনা রোগ সংক্রমণের পর দেশের সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি উঠতে থাকে। এর মধ্যে আসে বাজেট। বিশাল মাপের বাজেটে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে যে, দেশের যে বিনিয়োগ পরিস্থিতি তাতে এই লক্ষ্য পূরণ কতটুকু সম্ভব হবে। আর্থিক  খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা না হলে বাজেটে প্রস্তাবিত আয়-ব্যয় প্রশ্নবিদ্ধ হবে। আর কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগটাও আসবে না।   

বিনিয়োগ দুই ধরনের হয়। সরাসরি বিনিয়োগ, অপরটি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ। সরাসরি বিনিয়োগ তারাই করতে পারে—যাদের ব্যবসা শিল্প গড়ার সুযোগ আছে,সামর্থ্য আছে। আর যাদের সেই সামর্থ্য নেই, তারা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। পৃথিবীর যত পুঁজিবাদী দেশ আছে, এমনকি ইরান বা চীনের মতো আদর্শবাদী সরকার পরিচালিত দেশগুলোতেও এই শেয়ারবাজার রয়েছে। শেয়ারবাজারে শেয়ার ছেড়ে দেশি-বিদেশি ছোটো বড়ো কোম্পানি পুঁজি সংগ্রহ করে। আর সেই পুঁজির যোগান দেয় ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ। বিশ্বের অনেক দেশেই শতভাগ সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ করা যায় না। যেহেতু সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোম্পানিগুলো অর্থ সংগ্রহ করে, তাই সব দেশের সরকারের দায়িত্ব থাকে এইসব মানুষের বিনিয়োজিত অর্থের সুরক্ষা দেওয়া। সরকারের পক্ষ থেকে সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন সেই দায়িত্বটা পালন করে। আমেরিকা এমনকি  ভারতেও তাই যতগুলো সরকারি কমিশন কাজ করে, তার মধ্যে এই সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশনের গুরুত্ব থাকে সর্বাধিক। আমাদের দেশেও এমন একটি কমিশন রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এই কমিশন আজ অবধি বিনিয়োগকারীদেরকে সেই অর্থে সুরক্ষা দিতে পারেনি। এজন্যই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে আমাদের বিনিয়োগকারীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদের মধ্যে বারবার আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

আমাদের দেশের শেয়ারবাজারে সব থেকে আধিক্য রয়েছে ব্যাংক খাতের শেয়ারের। তাই ব্যাংক খাত যখন শক্তিশালী অবস্থানে থাকে, তখন শেয়ারবাজারও চাঙ্গা থাকে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর যাবত্ ব্যাংক খাতের শেয়ারগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। কেন এমন অবস্থা? মূল কারণ হলো এই খাতে রয়েছে সুশাসনের অভাব। ব্যাংকের ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপী ঋণ’ এমন অস্বাভাবিক অবস্থায় পৌঁছেছে যে, গোটা ব্যাংকিং সেক্টর এখন ধুঁকছে। এছাড়া এই খাতের আর যে প্রধান সমস্যা রয়েছে তাহলো ব্যাংক খাতের লোকদের সঙ্গে শক্তিধর দুষ্টচক্রগুলো কারসাজি করে বড়ো বড়ো অংকের ঋণ নেয়, আর সেই ঋণের টাকা প্রস্তাবিত শিল্প ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে অন্যত্র, এমনকি বিদেশেও পাচার করে। এটাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে ব্যাংকিং সেক্টরের। এই অবস্থার উত্তরণ জরুরি। আর তা কেবল ব্যাংক বাঁচানোর জন্যেই নয়, শেয়ারবাজারটাকে বাঁচাতে হলেও এই অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। তার জন্য ব্যাংকের পরিচালন ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার আনতে হবে। প্রশ্ন হলো  কীভাবে তা করা সম্ভব হবে?

কিছুদিন আগে ব্যাংক কোম্পানি আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এই আইনে বলা হয় যে, এক পরিবার থেকে চার জন ব্যক্তি একটানা ৯ বছর পরিচালনা বোর্ডে অবস্থান করতে পারবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত হয়ে যায়। অথচ একটা ব্যাংকের যে সম্পদ, তার সিংহভাগ হচ্ছে জনগণের আমানত। অনিয়ম সংঘটিত হলে ব্যাংকগুলোতে মানুষের আমানতই যে কেবল ঝুঁকিতেই পড়ে তাই নয়, শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর শেয়ারের দামও পড়ে যায়। এই মুহূর্তে অনেক ব্যাংকের শেয়ারের দাম ফেসভ্যালুর নিচে অবস্থান করছে। এর অবসানকল্পে আর ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে অবিলম্বে—১) পরিচালন বোর্ড থেকে বিতর্কিত ব্যক্তিদেরকে সরিয়ে সরকারি তত্ত্বাবধানে জবাবদিহিতামমূলক পরিচালন বোর্ড গঠন করতে হবে। কোন অর্থ আত্মসাত্কারী আর অর্থপাচারকারী বলে চিহ্নিত ব্যক্তি পরিচালন বোর্ডে থাকতে পারবে না। ২) বেশ কয়েকটি ব্যাংক একত্র করে মার্জার করতে হবে। এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত বিধান। সামপ্রতিক কালে ভারতে ছাব্বিশটি ব্যাংককে মার্জারের আওতায় নেওয়া হয়েছে আর তার মাধ্যমে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

 শেয়ারবাজার পরিস্থিতির উত্তরণে বাজেটে ১০ শতাংশ কর দিয়েই অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ধারণা করা যায়, সরকারের উদ্দেশ্য হলো এই টাকাগুলোকে অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসা। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলে সামান্য অংকের কর পরিশোধ করে যেমন কালো টাকা বৈধ করা যাবে  আবার শেয়ারবাজারের পাশাপাশি ব্যাংকে আমানত করলে বা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করলেও এই সুযোগ মিলবে। প্রশ্ন হলো একজন সাধারণ মানুষ এই সব বিকল্পের মধ্যে কোন্টা বেছে নেবে? ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে এখন সামান্য নামমাত্র হারে সুদ দিচ্ছে। আগামীতে এটা আরো কমে যাবে। অর্থনীতিতে মন্দার কারণে রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ লোকসান বয়ে আনতে পারে। এর বিপরীতে বর্তমানের হিসেবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি। এখন শেয়ারবাজারে বিদ্যমান শেয়ারগুলোর দাম তলানিতে। আমাদের শেয়ারবাজারে আস্থার ঘাটতি আছে। নতুন কমিশনে যারা নিয়োগ পেয়েছেন, শেয়ারবাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠায়—এই আস্থা ফেরত আনাটাই হবে তাদের প্রধান কাজ। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কমিশন যদি মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফেরত দিতে পারে, তবে লোকে শেয়ারবাজারেই বিনিয়োগ করবে। অন্যত্র যাবে না। এর জন্যে সর্বাগ্রে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।

 

লেখক : সভাপতি, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস ওনার্স

অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ