নিউমোনিয়া শিশুমৃত্যুর অন্যতম কারণ। বিশ্বে নিউমোনিয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় দুই লাখ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। এদের মধ্যে প্রায় ২০ হাজার শিশু মারা যায়। ২০১৭ সালের তথ্য মতে, শুধু ঢাকা শিশু হাসপাতালে প্রায় সাড়ে ৩ হাজারের বেশি শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়। যাদের মধ্যে শতকরা ৪ জন শিশু মৃত্যুবরণ করে। তবে সচেতন হলে সহজেই এই রোগ প্রতিরোধ, প্রতিকার ও চিকিত্সার মাধ্যমে প্রতিহত করা সম্ভব বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। বিদায়ী বছর ২০১৮ সালে কেবল ঢাকা শিশু হাসপাতালেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ২ হাজার ৬০৫ শিশু চিকিত্সা নেয়। এরমধ্যে শেষ দুই মাসে অর্থাত্ নভেম্বরে এই সংখ্যা ছিল ৩৭১ শিশু এবং ডিসেম্বররে ছিল ২৫৬ শিশু।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের একাডেমিক পরিচালক ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ সফি আহমেদ বলেন, শীত বাড়ার পর শিশুদের শীতজনিত নানা রোগ দেখা দেয়। এর মধ্যে ঠান্ডা লেগে সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া বেশি হয়। তবে ঠিকমতো যত্ন না নিলে এসব থেকে হতে পারে আরও বড় কিছু। শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। শিশুকে ঠান্ডা লাগা থেকে বিরত রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
ঢাকা শিশু হসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে কথা হয় মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর থানা থেকে আসা ২ মাস ২২ দিন বয়সী সিনহার মা রিক্তা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রথম পাতলা পয়খানা আর বমি হয়, এরপর বাচ্চা কিছুই খায় না এবং বাচ্চার শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, তখন গ্রামের ডাক্তার এখানে আনার পরামর্শ দেন। আজ তিন দিনে বাচ্চা এখনো সুস্থ হয়নি। মোহাম্মদপুর থেকে আসা এক বছর ৫ মাস বয়সী শিশু হাবিবুর রহমান। তার বাবা মিজানুর রহমান বলেন, বাচ্চার পেট ব্যথা, জ্বর, কাশি ও বুকে শব্দ এই সমস্যা নিয়ে আমরা হাসপাতালে আসি। জ্বর এখনো আছে অল্প। একই ওয়ার্ডে ভর্তি আশুলিয়া থেকে আসা ১৫ মাস বয়সী মারিয়া। মারিয়ার মা মরিয়ম আক্তার বলেন, এর আগেও আড়াই মাস বয়সে একবার বাচ্চার এমন শ্বাসকষ্ট হইছিল। এখন কাশতে কাশতে বমি করে ফেলে।
এসডিজি পূরণে ২০৩০ সালের মধ্যে অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সী শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৫ জনের নিচে কমানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ নিউমোনিয়াজনিত শিশু মৃত্যু হার অবশ্যই কমাতে হবে। আশার কথা হলো, নিউমোনিয়া এমন একটি রোগ- যা প্রতিরোধ, প্রতিকার ও চিকিত্সার মাধ্যমে প্রতিহত করা সম্ভব বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে প্রতি বছর ৯৩ লাখ ৫০ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়। নিউমোনিয়ার ঝুঁকিতে থাকা দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। ঢাকা শিশু হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে আসা রোগীদের ওপর যৌথভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে ঢাকা শিশু হাসপাতালের মাইক্রো বায়োলজি বিভাগ ও বাংলাদেশ চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, গত ৩ বছরে গড়ে প্রায় ৫০ হাজার শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শিশু হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে এসেছে। তাদের মধ্যে প্রায় পাঁচশত শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫ সালে বিশ্বে ৯ লাখ ২২ হাজার শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়। এই সংখ্যা মোট শিশুমৃত্যুর ১৬ ভাগ। এদের মধ্যে ৫ ভাগ শিশু নবজাতক। তবে আশার কথা হচ্ছে, ২০০০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে নিউমোনিয়ার বিরুদ্ধে সচেতনতা বেড়েছে। ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই ১৫ বছরের মধ্যে আগের তুলনায় ৫১ ভাগ শিশু নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ ও ঢাকা শিশু হসপিটালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার সরকার বলেন, মানুষের মধ্যে এই রোগ সম্পর্কে অসচেতনতা, সময়মতো চিকিত্সা না করা এবং সঠিক চিকিত্সার অভাবে আমরা এখনো নিউমোনিয়ায় শিশু মৃত্যুর হার আশানুরূপ কমাতে পারিনি। তিনি শিশুদের নিউমোনিয়া প্রতিরোধে নবজাতক শিশুদের ছয়মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ পান, যথা নিয়মে হাত ধোয়া এবং সময়মতো নিউমোনিয়ার টিকা দেওয়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, সঠিক সময়ে চিকিত্সার মাধ্যমে শিশুকে নিউমোনিয়া থেকে রক্ষা করা যায়। তবে দুর্ভাগ্য যে, বাংলাদেশে এখনো মাত্র ৪০ শতাংশের মতো শিশু নিউমোনিয়ার চিকিত্সা পায়। সরকার স্বাস্থ্য সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র চালু করেছে, যে কারণে প্রতিনিয়ত নিউমোনিয়ার রোগী শনাক্ত হচ্ছে।
