পার্লার শিল্প: করোনায় পুঁজি হারিয়ে ফতুর গারো নারীরা 

আপডেট : ২০ জুন ২০২০, ০৯:৩৩

টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী-বহরমপুর সড়কের বংশাই নদীর সরু ব্রিজ পেরুলেই ওপাড়ে পাহাড়ি উঁচুটিলা। লালমাটির ছোটছোট টিলা জুড়ে আনারস, কলা আর গাছগাছালীর সমাহার। সবুজ গাছপালার ফাঁকে ছবির মতো সাজানোগোছনো মাটির ঘর। এ শান্ত সুনিবিড় ঘরবাড়িতে যারা বসবাস করেন তারা গারো। টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। যারা নিজেদের আদিবাসী পরিচয়ে স্বাছন্দবোধ করেন। এটি মধুপুর উপজেলার একটি পাহাড়ি জনপদ। এ গ্রামের মেয়ে মাধুরী দালবৎ। মা গিলিতা দালবৎ। বাবা স্বর্গীয় তনেত নকরেক।

মাতৃতান্ত্রিক পরিচয়ে অভ্যস্ত গারোরা মায়ের উপাধি গ্রহণ করেন। সাত ভাইবোনের মেঝ মাধুরী। পীরগাছা খৃস্ট মিশন হাইস্কুল থেকে ২০০০ সালে এসএসসি পাশ করেন। এতোসব ভাইবোনের টানাটানির সংসারে লেখাপড়া আগায়নি। মধুপুর বনাঞ্চলে ১৯৮৬ সালে বনশিল্প উন্নয়ন সংস্থা প্রায় ৭ হাজার একরে রাবার বাগান করেন। সেই বাগানে ধরাটি গ্রামের সাড়ে চারশ একর পাহাড়ি জমি কেড়ে নেয়া হয়। যেসব গোষ্ঠী বা মাহারীর জমি রাবার বাগান গিলেছে এর মধ্যে মাধুরীর গোষ্ঠীও ছিল।

যাই হোক, বেঁচে থাকার তাগিদে মাধুরীকে আয়রোজগারের পথে নামতে হয়। এতো অল্প লেখাপড়ায় ভালো চাকরি জোটানো ছিল দুঃসাধ্য। তাই এক আত্মীয়র হাত ধরে যান সিলেট। সেখানে বানথাই পার্লারে বিউটিশিয়ান হিসাবে কাজ নেন। ৬ মাস ছিলেন শিক্ষানবিশ। 

এরপর টানা এক যুগ সৌন্দর্য চর্চার কাজে হাত পাকান। কালক্রমে হয়ে উঠেন অলরাউন্ডার বিউটিশিয়ান। ২০১৪ সালে পার্লারের চাকরি ছাড়েন। নিজেই ব্যবসা দাঁড়ানোর চিন্তা করেন। নিজের কিছু জমি বন্ধকী ও বিক্রি, হাতে জমানো সামান্য পুঁজি এবং অনেকটা ধারকর্জ করেই সিলেট শহরে আরম্ভ করেন পার্লার ব্যবসা। এভাবেই ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তার খাতায় নাম লিখেন মাধুরী।

বর্তমানে সিলেট শহরের নয়া সড়কে ইমেজ বিউটি পার্লার নামে দুটো শাখার মালিক মাধুরী। দশজন আদিবাসী গারো মেয়ে এখানে কাজ করেন। মাধুরীর দেখাদেখি বছর তিনেক আগে মধুপুর উপজেলার বেড়িবাইদ গ্রামের প্রতিভা সিংসাম সিলেট শহরের কুমার পাড়ায় ‘ফ্যাসান কেয়ার বিউটি পার্লার’ এবং ভেদুরিয়া গ্রামের অর্চনা নকরেক ‘অর্চনা বিউটি পার্লার’ চালু করেন। সিলেট শহরে মোট ১২টি বিউটি পার্লারের মালিক এখন গারো মেয়েরা। সবাই পার্লারের চাকরিতে হাত পাকিয়ে তারপর ব্যবসা দাঁড় করান। এজন্য সবাইকে গ্রামের জমিজমা বন্ধকী, বিক্রি বা ব্যাঙ্ক ঋণ নিতে হয়। সিলেটের এসব পার্লারে মধুপুর ছাড়াও শেরপুর, ময়মনসিংহ এবং নেত্রকোনার দুই শতাধিক গারো, হাজং ও কোচ মেয়েরা বিউটিশিয়ানের কাজ করেন। এখন এটিই তাদের জীবনজীবিকা।

মাধুরী আরো জানান, নারী তাও আবার আদিবাসী, এমন ভাগ্য বিড়ম্বিত জনগোষ্ঠীর মানুষ হিসাবে তাকে অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়। মোকাবেলা করতে হয় অনেক চ্যালেঞ্জ।  কথাটা বলতে যতোটা সহজ স্বাধীনভাবে পথ চলাটা অতো সহজ ছিলনা। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী হওয়ায় অনাত্মীয় শহরে ব্যবসার শুরুটা ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। শুধুমাত্র নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রমকে পুঁজি করে তিনি সফলতার মুখ দেখেন।

বলা অনাবশ্যক, মধুপুর বনাঞ্চলের অধিকাংশ গারোই দরিদ্র। চিরায়ত জীবন ব্যবস্থাকে আকড়ে থাকার প্রবণতা তাদের মধ্যে প্রকট। শাল বন উজাড় হওয়ায় তাদের প্রাকৃতিক জীবন বাধাগ্রস্ত হয়। জীবনজীবিকা নিয়ে তাদের মধ্যে শুরু হয় টানাপেড়েন। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার দরুন সংসারের পরিবর্তিত চ্যালেঞ্জটাকে মেয়েদেরই সামলাতে হয়।

মাধুরী নিজের দুর্দশা জানাতে গিয়ে বলেন, করোনার কারণে টানা তিন মাস ধরে দোকান বন্ধ। সকল বিউটিশিয়ানকে গত মার্চে এক মাসের বেতন দিয়ে ছুটি দেয়া হয়। তারা সবাই গ্রামে চলে যায়। সেখানেও তাদের খুবই দুরবস্থা। পাহাড়ে দিনমজুরী করে আধপেটে দিন পার করছেন তারা। তিনি আশায় ছিলেন, হয়তো মে মাসে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। এজন্য সিলেট শহরেই থেকে যান। পার্লারের দুটি দোকান বাবদ ৪৮ হাজার, বাসা ভাড়া বাবদ ১০ হাজারসহ মোট ৫৮ হাজার টাকা মাসে পরিশোধ করতে হয়। লকডাউন শেষ হবার পর ধারণা করেছিলেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। শহরের ললনারা আবার সাঁজতে আসবেন। বিয়ে, পার্টি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণ চাঙ্গা হবে। তখন সাঁজুগুজুতে সরব হয়ে উঠবে পার্লার। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। তিন সপ্তাহ পার হলেও কেউ পার্লার মুখো হচ্ছেন না।

গারো নারী সংগঠন আচিক মিচিক সোসাইটির সভাপতি সুলেখা ম্রং জানান, গ্রাম থেকে নগরে গিয়ে বিরুপ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে যেসব গারো মেয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসাবে নিজকে প্র্রতিষ্ঠিত করেছেন তাদের প্রত্যেকের জীবন একেকটি সাফল্যেও গল্প। নিজের পায়ে দাঁড়াতে কেউ তাদের সহায়তা করেনি। এরা লড়াই করে শুধু নিজের পায়েই দাঁড়ায়নি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হতদরিদ্র শতশত মেয়ের কর্মসংস্থান ও সৃষ্টি করেছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সংগ্রামী এসব গারো মেয়েরা করোনায় এখন ক্ষতবিক্ষত। তাদের পাশে প্রণোদনা নিয়ে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

প্রখ্যাত গারো গ্রাফিক্স ডিজাইনার এবং আপসান এর কর্ণধার মুনমুন নকরেক জানান, গারোরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। এ সময় সরকারের দায়িত্ব গারো নারী উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানো। নইলে এ পেশায় তারা টিকতে পারবে না।

এদিকে গত ১৭ মে বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিডব্লিউসিসিআই) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিউটি পার্লার নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট মানবিক আবেদন জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, কোভিড -১৯ এর কারণে সারাদেশে প্রায় ১৫ হাজার বিউটি পার্লার বন্ধ হয়ে গেছে। এর সাথে ১৫ হাজার নারী উদ্যোক্তা জড়িত। একই সঙ্গে প্রায় দেড়লক্ষ নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে এতে জড়িত। এসব উদ্যোক্তাদের বাড়িভাড়া ভ্যাট, ইউটিলিটি, বেতন ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় ছয় মাসের জন্য ভ্যাট ট্যাক্স অব্যাহতির দাবি জানায় চেম্বার।

চেম্বারের এ দাবির প্রেক্ষিতে সরকার গত ৭ জুন এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশের বিউটি পার্লার তথা সৌন্দর্য সেবা খাতকে শিল্প খাত হিসাবে ঘোষণা দেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. সেলিম উল্লাহ মিডিয়াকে জানান, সরকার এ সেবা খাতের উন্নয়ন ও প্রসারে আগ্রহী। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে সৌন্দর্য সেবাখাত শিল্পখাতের মর্যাদা দেয়ায় সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। সিংহভাগ নারী চালিত এ অনানুষ্ঠানিক খাতকে মূল ধারায় নিয়ে এসে সরকার বিভিন্নভাবে সহায়তা করতে চায়। মো. সেলিম উল্লাহ আরো জানান, শিল্পখাতের মর্যাদা প্রাপ্তির ফলে সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পেতে সুবিধা হবে। এদিকে শিল্পখাতের মর্যাদা প্রদান করায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বিউটি সার্ভিস ওনার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট কানিজ আলমাস খান। তিনি দৈনিক ইত্তেফাককে জানান, প্রায় ৬ দশকের পথচলা সত্বেও এ শিল্পের সুনির্দিষ্ট অবকাঠামো বা স্বীকৃতি ছিলনা। দেশের অনগ্রসর ক্ষুদ্র জাতিসত্বার গারো নারীরা এখাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। তাদেরকে আরো দক্ষ জনশক্তি হিসাবে গড়ে তুলে এ খাতকে আরো চাঙ্গা করা যাবে।

ইত্তেফাক/আরকেজি