এম এ আলআমিন
চীন ও ভারতের সৈন্যরা হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে একে অন্যের রক্তপাত ঘটিয়েছে। সর্বশেষ দেশ দুটি যখন সীমান্ত সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল চীনের প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিং এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দুজনই তখন কিশোর বয়সি ছিলেন। ১৯৬২ সালে সীমান্ত যুদ্ধের পাঁচ বছর পর ১৯৬৭ সালে দুই দেশ ফের সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিল। এর এক বছর আগে চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটে। অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন সংঘর্ষ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কিন্তু সেটি হয়নি। সর্বশেষ ১৯৭৫ সালে দুই দেশের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ভারতের অরুণাচল প্রদেশের এক দুর্গম এলাকায় তখন চার ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়েছিল।
অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, লাদাখে সংঘর্ষে ৪৩ জন চীনা সৈন্য হতাহত হয়েছে। চীন এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি। কিছু ভারতীয় সৈন্য এখনো নিখোঁজ রয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী অবশ্য তাদের সব সদস্যেরই হিসাব থাকার কথা জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে ভারত দুই বার সীমান্ত অতিক্রম করে আক্রমণ করেছে। ১৭ জুন চীন গালওয়ান উপত্যকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করলেও ভারত সে কথা উড়িয়ে দেয়। সংঘর্ষের পর দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ফোনে কথা হয়। তারা উভয়ই পরিস্থিতি দায়িত্বশীলভাবে সামাল দেওয়ার ব্যাপারে একমত হন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রেমেনিয়াম জয়শঙ্কর ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওযাং ইর মধ্যে আলোচনার পর ভারতের পক্ষ থেকে চীনের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লাদাখ সীমান্তের ভারতীয় অংশে স্থাপনা নির্মাণ চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। অন্যদিকে চীন ভারতকে সব ধরনের উসকানিমূলক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায়।
চীন ও ভারত পরমাণু শক্তিধর দুই প্রতিবেশী। দেশ দুটিতে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের বসবাস। সীমান্ত বিরোধ তাদের মধ্যে নতুন কোনো ইস্যু নয়। কিন্তু করোনা মহামারির প্রভাবে মানুষের জীবনযাত্রা যখন স্থবির তখন এমন একটি গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে বলে কেউ আশা করেনি। মে মাসের ৫ ও ৯ তারিখ চীনা সৈন্যরা প্রথম লাদাখ সীমান্তের ভারতীয় অংশে ঢোকে। সংঘর্ষে দুই পক্ষের শতাধিক সৈন্য আহত হলেও কেউ নিহত হয়নি। চীন সম্ভবত বর্তমান পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইছে। একই সময় তারা হংকংয়ের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা আইনে পরিবর্তন এনেছে। এর আগে ২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দার সময় চীন বিভিন্ন দেশকে ঋণ দিয়ে নিজের আর্থিক প্রভাব বলয় তৈরি করেছিল। করোনা ভাইরাস চীনের উহান থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে, এটি এখন মিডিয়ার কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত সত্য। বিষয়টি চীনের জন্য কূটনৈতিকভাবে বিব্রতকর। তাই বেইজিং নতুন ইস্যুর দিকে দৃষ্টি দিতে পারে বলে কেউ কেউ বলছেন।
কাশ্মীরের লাদাখ সীমান্তে এখন যা হচ্ছে তার সঙ্গে ১৯৬৭ সালের ঘটনার মিল রয়েছে। বর্তমান উত্তেজনার মূলে আছে ভারতের কিছু নির্মাণ প্রকল্প। ১৯৬৭ সালে ভারত সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে নাকুলা পাশ এলাকায় সুড়ঙ্গ, কাঁটাতারের বেড়া, লাউড স্পিকার বসানোর মতো কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। কাশ্মীরে ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্তটি লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল নামে পরিচিত। দুই পক্ষের মধ্যে সর্বশেষ এ সংঘাতে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যাটি জানা যায়নি।
সংঘর্ষের পরেও দুই দেশের সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ওপর জোর দিচ্ছে। ১৯৬৭ এবং ৭৫ সালে অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে সংঘর্ষের পরও এ রকম হয়েছিল। অতীত ও বর্তমানের ঘটনাগুলোর মধ্যে আরো যেটি মিল আছে তা হলো ঘটনাস্থল খুবই দুর্গম এলাকায়। সেখানে সাংবাদিকদের যেতে দেওয়া হচ্ছে না। কোনো বেসামরিক প্রত্যক্ষদর্শীর উপস্থিতি নেই। দুই দেশ নিজেদের মতো করে ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরছে। এক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে ভারত। কারণ ভারতের গণমাধ্যম চীনের তুলনায় কিছুটা বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে। উভয় দেশই শাসন করছে দুটি কট্টর জাতীয়তাবাদী সরকার। গণমাধ্যমের ওপরও অনিবার্যভাবে যার প্রভাব পড়ছে।
১৯৬৭ সালের ঘটনার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির একটি পার্থক্য হলো এবারের সংঘর্ষে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র বা গোলাগুলি ব্যবহার করা হয়নি। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী তা করা হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে সংযত আচরণের রীতিটি দীর্ঘদিনে সেখানে গড়ে উঠেছে। এ থেকে স্পষ্ট যে কোনো পক্ষই সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে ইচ্ছুক নয়। উত্তেজনা নিরসনের মানসিকতা উভয় পক্ষই ধারণ করে। ১৭ জুন চীনে নিযুক্ত ভারতে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত সুন উইডং নয়াদিল্লীতে বলেন, ‘প্রতিরক্ষা ইস্যুটি অবশ্যই আমাদের দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ককে ছাপিয়ে যাওয়া উচিত নয়।’
