মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সারা বিশ্বই বিপর্যস্ত। বিশ্বের উন্নত দেশসমূহ যেইখানে ইহার মোকাবিলায় নাস্তানাবুদ হইতেছে, সেইখানে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রসঙ্গ না টানাই বাঞ্ছনীয়। এই সময় সবচাইতে জরুরি জাতীয় ঐক্য। দলমতনির্বিশেষে জনগণকে রক্ষার কর্মসূচিতে সকলের ঝাঁপাইয়া পড়া প্রয়োজন। এই সময় বিবাদ ও বিভেদের কোনো অবকাশ নাই; কিন্তু দীর্ঘদিনের চর্চার কারণে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন পর্যায়ে উপনীত হইয়াছে যে, এই সময়ও আমরা বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করি। বিরোধী মতের কণ্ঠস্বরকে দমানোর চেষ্টা করি। এমনকি তাহাদের মানবিক কর্মসূচিতেও বাধা দেই। ইহা নিঃসন্দেহে ন্যক্কারজনক। পৃথিবীর অনেক উন্নত ও গণতান্ত্রিক দেশে এই দেশের মানুষের বসবাস এবং উন্নত শিক্ষাদীক্ষা ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে অবারিত জ্ঞান আহরণের সুযোগের কারণে বাংলাদেশের মানুষের মননশীলতা ও চেতনার জগতের ক্রমেই উন্নতি হইতেছে। এই অবস্থায় রাজনীতিতে পালটাপালটি আক্রমণ বা সহিষ্ণুতার অভাবকে তাহারা মোটেও ভালো চোখে দেখেন না। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে একটি রাজনৈতিক দলের ত্রাণবহরে যে হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়াছে তাহা অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার বয়স প্রায় অর্ধশত বত্সর হইতে চলিয়াছে। পাকিস্তান আমলে আমরা ২৩ বত্সর পরাধীন ছিলাম। সব মিলাইয়া ১৯৪৭ সাল হইতে আজ অবধি সাত দশকেরও অধিক সময় অতিবাহিত হইয়াছে; কিন্তু এত বত্সর পরও এবং অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পরেও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির তেমন কোনো পরিবর্তন হইল না। এই ব্যাপারে আমরা যেই তিমিরে ছিলাম, সেই তিমিরেই রহিয়া গিয়াছি। ইহার চাইতে বড়ো আফসোসের বিষয় আর কী হইতে পারে! আমরা সেই পাকিস্তান আমল হইতেই দেখিয়া আসিতেছি—রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে মারামারি-হানাহানি চলিতেছে। যখন যাহারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকেন, তখন তাহারা প্রশাসনের যোগসাজশে বিরোধী মতকে দমনের চেষ্টায় লিপ্ত থাকেন। আবার বিরোধী দল যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তাহারা একই নিষ্ঠুর নীতি গ্রহণ করিয়া থাকেন। তাহারা হইয়া উঠেন প্রতিশোধপরায়ণ। এমনকি অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করিতে না পারিয়া অনেকে বিদেশে পাড়ি জমান। এভাবে পালটাপালটি সংঘাত-সংঘর্ষে প্রাণ যাইতেছে প্রচুর রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর যাহারা অনেক সময় ন্যায়বিচারও পাইতেছেন না। এখানে প্রশাসনের একচক্ষু নীতি অনুসরণের কথা নহে। তাহারা দেশের আইন ও বিধিবদ্ধ নিয়মকানুন দ্বারা পরিচালিত হইবেন। কিন্তু প্রশাসন আজ বড়ো অসহায় হইয়া পড়িয়াছে। বিশেষ করিয়া স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ সদা তটস্থ থাকেন। তাহাদের কথায় কথায় হুমকি-ধামকি দেওয়া হয়। আবার প্রশাসনে কিছু সুযোগসন্ধানী লোক রহিয়াছেন। তাহারা প্রমোশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য অথবা ট্রান্সফার বা অন্যত্র বদলির ভয়ে ‘জো হুকুম জাহাঁপনা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ক্ষমতার পালাবদল হইলে তখন তাহাদের আর দৃশ্যপটে দেখা যায় না। বা তাহারাও একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মতো নিজেদের ভোল পালটাইয়া ফালান।
এই পালটাপালটি সংঘাত-সংঘর্ষের শেষ কোথায়? কোথাও না কোথাও আমাদের থামিতে হইবে, দাঁড়ি দিতে হইবে। তাহা না হইলে দেশের মানুষ শান্তিতে বসবাস করিতে পারিবে না। রাজনৈতিক এই সংস্কৃতির প্রভাব বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সংস্থায়ও পড়িতে দেখা যায় যাহা আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দুর্বল করিবার জন্য যথেষ্ট। এই জন্য রাজনৈতিক দলগুলিকেই এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। যদি সরকারি দলের অভিযোগ অনুযায়ী ইহা অভ্যন্তরীণ বিষয় ও দুরভিসন্ধিমূলক হইয়া থাকে, তাহা হইলে তাহারও তদন্ত হওয়া দরকার। নতুবা রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে গভীর তিক্ততা, অবিশ্বাস ও অনাস্থা বাড়িতেই থাকিবে।
