সৌরবিদ্যুতের ফল হইবে সুদূরপ্রসারী

আপডেট : ২২ জুন ২০২০, ২১:৫১

সূর্য এই পৃথিবীর সকল শক্তির উত্স। সবুজ বৃক্ষরাজি সালোক সংশ্লেষণের মাধ্যমে যে শর্করা উত্পাদন করে, তাহাই সার্বিকভাবে জীবজগতের সকলের খাদ্য সংস্থান করিয়া থাকে। যেই জীবাশ্ম জ্বালানির উপর ভর করিয়া এই বিশ্ব চলিতেছে—তাহারও অন্তর্নিহিত শক্তির উত্স ঐ সূর্যই; কিন্তু সূর্য হইতে যদি সরাসরি নবায়নযোগ্য উপায়ে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা যায়, তাহা হইলে তাহা বিশ্বের পরিবেশের জন্য সবচাইতে বড়ো বন্ধু হইয়া উঠিবে। কারণ, শিল্পবিপ্লবের পর হইতে সভ্যতার উন্নয়নধারা ও আধুনিক জীবন সচল রাখিতে জীবাশ্ম জ্বালানিই হইয়া উঠিয়াছে প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়া জীবাশ্ম জ্বালানি উপজাত গ্রিনহাউজ গ্যাসের বিপজ্জনক মাত্রায় নিরন্তর নিঃসারণে নড়িয়াচড়িয়া বসিয়াছে এই বিশ্ব। এই দিক হইতে বাংলাদেশের জন্য সুখবর হইল, পৃথিবীর অন্যতম সোলার হোম সিস্টেমের জন্য বিশেষ ক্যাটাগরিতে স্থান পাইয়াছে বাংলাদেশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে বিশ্বের প্রধান গবেষণা ও নীতিপ্রণেতা প্রতিষ্ঠান ‘রিনিউয়েবল এনার্জি পলিসি নেটওয়ার্ক ফর দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ (আরইএনএ-২১) এই প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছেন। প্রতিবেদনে বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুত্ ব্যবহারে শীর্ষ ছয়টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।

বাংলাদেশে রহিয়াছে সৌরবিদ্যুতের অপার সম্ভাবনা। কারণ, দেশটিতে বত্সরে গড়ে প্রায় ৩০০ দিন পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকে। সেই হিসাবে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কিলোওয়াট ঘণ্টা সৌরশক্তি এই দেশের প্রতি বর্গমিটার জমিতে আছড়াইয়া পড়ে। এই সৌরশক্তির মাত্র শূন্য দশমিক ০৭ শতাংশ শক্তিতে রূপান্তর করা গেলেই বাংলাদেশের সব বিদ্যুতের চাহিদা মিটাইয়া ফেলা সম্ভব। তাত্পর্যপূর্ণ তথ্য হইল, বাংলাদেশে সেচের কাজে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে বর্তমানে দেড় হাজার সেচপাম্প চালু রহিয়াছে। দেশের মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশ মানুষ বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুত্ ব্যবহার করিতেছে। সরকারের দিক হইতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সহিত দেখা হইতেছে। ইহা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক। সরকারের গুরুত্ব প্রদানের কারণেই পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ ‘সোলার হোম সিস্টেম’ ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ স্থান করিয়া লইয়াছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক নিরাপত্তা ও শিক্ষাক্ষেত্রেও অবদান রাখিতেছে এই সৌরবিদ্যুত্। যদিও সোলার প্যানেল বসাইতে এখনো যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়, তাহা গ্রামাঞ্চলের অনেক দরিদ্র মানুষের সাধ্যের বাহিরে। অপরদিকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনে খরচ পড়ে ৩০ হইতে ৩৫ কোটি টাকা। ইহার বিপরীতে গ্যাস বা ডিজেলের জেনারেটর বসাইতে ব্যয় হয় ১০ কোটি টাকারও কম। এই ক্ষেত্রে সোলার প্যানেলের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের উপর জোর দিতে হইবে সবচাইতে বেশি, যাহাতে সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া সম্ভব হয় এই পরিবেশবান্ধব বিদ্যুত্। নবায়নযোগ্য জ্বালানি হইতে বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্যে কাজ করিতেছে।

তবে শেষাবধি ২০৫০ সালের মধ্যে আমাদের এই সৌরশক্তির কাছে ফিরিয়া যাইতে হইবেই। সুতরাং ইহাকে আরো উন্নত প্রযুক্তিতে বিকশিত করাসহ সাশ্রয়ী করিয়া তোলা প্রয়োজন। তাহা হইলে ইহার ফল হইবে সুদূরপ্রসারী।