পুরোনো ঢাকার চকবাজার এলাকার বহুল আলোচিত হাজি আব্বাস হত্যাকাণ্ডের রহস্য সাত বছর পর উদ্ঘাটিত হয়েছে। চকবাজার থানা পুলিশ, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর তদন্ত করেও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি। সর্বশেষ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তদন্তে বের হয়েছে হত্যার নেপথ্য কাহিনি। হাজি আব্বাসের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকার বাসিন্দা আশ্রাফ উদ্দিন সম্প্রতি গ্রেফতারের পর গত রবিবার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের পর এই আশ্রাফ উদ্দিনই লাশ কার্টন ও বস্তায় ভরে ফেলে দিয়েছিলেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার জীবন কান্তি সরকার জানিয়েছেন, নিহত আব্বাসের বন্ধু মো. মিলন, গোডাউন মালিক (যে গোডাউনে আব্বাসকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়) মো. জামাল নাসের, লাশ বহনকারী আশ্রাফ উদ্দিনসহ চার জনকে আসামি করে চার্জশিট দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। উল্লেখ্য ২৫/এ, লালবাগ রোডের বাসিন্দা মৃত খলিলুর রহমানের ছেলে নিহত হাজি আব্বাস।
সেদিন কি ঘটেছিল
মামলার তদন্ত সূত্র জানায়, পুরোনো ঢাকার একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ছিলেন হাজি আব্বাস। ২০১৪ সালের ১৮ থেকে ২৫ জুনের যে কোনোদিন তিনি ঐ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু টাকা নিয়ে মালিকের বাসায় যাবার পথে ছিনতাই হয়। কিন্তু এ টাকা ছিনতাইয়ের পর হাজি আব্বাসের বন্ধু মো. মিলনের ধারণা যে, এ টাকা হাজি আব্বাস নিজেই মেরে দিয়ে ছিনতাই নাটক সাজিয়েছেন। আর এ অবস্থায় মো. মিলন টাকার ভাগ পেতে হাজি আব্বাসকে পুরোনো ঢাকার হরনাথ ঘোষ রোডে মো. জামাল নাসেরের গোডাউনে নিয়ে যান এবং টাকার ভাগ দাবি করেন। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে মিলন ও জামালসহ কয়েক জন মিলে হাজি আব্বাসকে বেদম প্রহার করলে তিনি ঘটনাস্থলে মারা যান। পরে হাজি আব্বাসের লাশ কার্টন ও বস্তায় ভরে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড অফিস সংলগ্ন একটি ডাস্টবিনে ফেলে রাখে। ঐ বছরের ২৭ জুন চকবাজার থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে নিহতের স্ত্রী রুমানা আক্তার চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার তদন্ত
দীর্ঘদিন চকবাজার থানা এবং ডিবি পুলিশ তদন্ত শেষে মো. মিলন ও মো. জামাল নাসেরের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে আদালতে দায়সারাগোছের একটি অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। কিন্তু মামলার বাদীর (নিহতের স্ত্রী) নারাজীর প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে পিবিআই অধিকতর তদন্ত করে। ২০১৭ সালে পিবিআই আসামি মো. মিলন ও জামালদের বিরুদ্ধে পূর্ববত্ একটি সম্পূরক অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। কিন্তু দাখিলকৃত এই অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে সন্তোষজনক না হওয়ায় অধিকতর তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
সিআইডি সূত্র জানায়, চকবাজার থানা, ডিবি এবং পিবিআই যে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে দাখিল করেছিল তাতে যে সুস্পষ্ট সাক্ষী এবং ঘটনাস্থল (যেখানে আব্বাসকে হত্যা করা হয়) নিশ্চিত করতে পারেনি। কিন্তু সিআইডি হত্যার মূল ঘটনাস্থল ৭০, হরনাথ ঘোষ রোড চকবাজারের ঠিকানাটি সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে ঘটনাস্থলটির মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণাধীন। তবে আগের স্থাপনায় বসবাসকারী লোকজন ও ব্যবসায়ীদের সন্ধান করে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের খুঁজে বের করতে সক্ষম হয় সিআইডি। আর সাক্ষীদের দেওয়া তথ্য মোতাবেক আসামি আশ্রাফ উদ্দিনকে গত ১৮ জুন গ্রেফতার করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার জীবন কান্তি সরকার বলেন, আসামি মো. মিলন ও মো. জামাল নাসের ইতিপূর্বে গ্রেফতার হলেও তারা জামিনে রয়েছেন। পলাতক অপর আসামিকে গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে।
মামলার তদারককারী সিআইডির (ঢাকা মেট্রো) অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ মো. রেজাউল হায়দার জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃত আশ্রাফ উদ্দিনের দেওয়া তথ্য মোতাবেক অন্য আসামিদের গ্রেফতার ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহপূর্বক অচিরেই চাঞ্চল্যকর আব্বাস হত্যা মামলাটি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।
