একবিংশ শতাব্দীতে আসিয়া ঘূর্ণিঝড় কিংবা সুনামির নিখুঁত পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। অথচ ভূমিকম্পের পূর্বাভাস প্রদানের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান এখনো তিমিরে ডুবিয়া রহিয়াছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে তিনটি ভূমিকম্প সংঘটিত হইয়াছে। এত ঘনঘন ভূমিকম্পে অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ জন্ম লইয়াছে। আশঙ্কা করা হইতেছে, ইহা বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কি না! যদিও এই বিষয়ে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলিতেছেন, এইগুলি হঠাত্ ভূমিকম্প নহে, এই লাইনে প্রতিনিয়তই ছোট ছোট ভূমিকম্প হইয়া থাকে। তাহার কারণ হিসাবে বলা হয়, ৭ কোটি বত্সর পূর্বে এশিয়ান ও ইউরেশিয়ান টেকটনিক প্লেটের প্রবল সংঘাতে সৃষ্টি হইয়াছিল হিমালয় পর্বত। এই দুইটি প্লেটের সংযোগস্থলটি একটি বিরাট এলাকা। ইহা বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ হাওর অঞ্চল, মেঘনা নদী হইয়া বঙ্গোপসাগরের নিচ দিয়া চলিয়া গিয়াছে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের দিকে। ইহা হইতেছে ইন্ডিয়া-বার্মা প্লেটের উপরের অংশের সংযোগ। সমগ্র অঞ্চলটিকেই বলা হয় সাবস্ট্রাকশন জোন। এই জোনের মধ্যে বাংলাদেশসহ পূর্ব ভারতের আসাম, মণিপুর, মিজোরাম ও মিয়ানমারে বড় ধরনের ভূমিকম্প হইবার আশঙ্কাকে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। এই ব্যাপারে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই অঞ্চলের টেকটনিক প্লেটে বিপুল শক্তির চাপ পূর্ণতা লাভ করিয়াছে। যেই শক্তি জমা হইয়াছে, তাহা যদি একবারেই রিলিজ হয়, তাহা হইলে অচিন্তনীয় ক্ষয়ক্ষতি হইবে। তবে এই শক্তি ধীরে ধীরে মুক্ত হইতে পারে ছোট ছোট ভূমিকম্পের মাধ্যমে।
মুশকিল হইল, বড় কোনো ঝড় বা সুনামির মতো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া যায় না। তবে দুর্যোগের স্থান হইতে স্থানান্তর ব্যতীত ঘূর্ণিঝড় কিংবা সুনামি হইতে রক্ষা পাইবার অন্য কোনো উপায় নাই। কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি মানিয়া ভূমিকম্পরোধী ভবন নির্মাণ করিলে জীবন ও সম্পদ বহুলাংশে রক্ষা করা সম্ভব হয়। তাহা ছাড়া, বড় ভূমিকম্পের পর যে আফতার শক হিসাবে আরো ছোট ছোট ভূমিকম্পের আঘাত আসে, তাহার দিনক্ষণও জানা সম্ভব হয় না। সুতরাং ভূমিকম্প পূর্বাভাসের প্রযুক্তি দিন দিন যতই উন্নতি হউক, নিজেদের জীবন-সম্পদ রক্ষার্থে ভূমিকম্পরোধী ভবন নির্মাণে সর্বাংশে গুরুত্ব আরোপ করিতে হইবে। কারণ, দেশি ও আন্তর্জাতিক ভূতত্ত্ববিদ এবং গবেষকরা ভূ-অভ্যন্তরের গঠন, ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত এবং কম্পিউটার মডেল বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায়—ইন্দোনেশিয়া ও চীনের পরই বাংলাদেশ রহিয়াছে ভূমিকম্পের রেড জোনে। বিশ্বের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ সংস্থা জানাইয়াছে— ভারতীয়, ইউরেশীয় ও মিয়ানমার টেকটনিক প্লেটের ভিতরে আটকাইয়া রহিয়াছে বাংলাদেশ। তাহা ছাড়া আশঙ্কা করা হয় যে, বড় ভূমিকম্পগুলি সাধারণত শত বত্সর পরপর একই জায়গায় সংঘটিত হয়। আমাদের এই অঞ্চলে ১৮৯৭ সালে রিখটার স্কেলে ৮ দশমিক ৭ মাত্রার প্রলয়ংকরী ভূকম্পন হয়, যা ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’ নামে বিখ্যাত। ঐ ধরনের কোনো দুর্যোগ কখনো সংঘটিত হইলে লক্ষ লক্ষ প্রাণহানির পাশাপাশি দেশের বৃহত্তর অংশ হয়তো ইট-সুরকির তলে চাপা পড়িবে। সুতরাং বড় ভূমিকম্পের জন্য আমাদের বড় প্রস্তুতি দরকার।
