চট্টগ্রামে পাহাড়ে অবৈধ বসতি ‘ভাঙাগড়ার খেলা’ চলছেই

আপডেট : ২৬ জুন ২০২০, ০৩:০৩

চট্টগ্রামে বর্ষা মৌসুমসহ বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রবল বর্ষণের ফলে প্রায়ই পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। নগরীর পাহাড়গুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখনো হাজার হাজার মানুষ বসবাস করছে। ভূমি দখলদাররা সরকারি-বেসরকারি পাহাড় দখল করে স্বল্প আয়ের লোকজনের কাছে ভাড়া দিয়েছে।

বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা এই সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন সময়ে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পাহাড়ে অবৈধ বসতি সমস্যা এখনো রয়েই গেছে। প্রতি বছর ঠিক বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে পাহাড়ে বসবাসকারীদের সরিয়ে দিতে একধরনের ‘রুটিন ওয়ার্ক’ শুরু করে প্রশাসন। অবৈধ কিছু বাড়িঘর উচ্ছেদ করে দিনকয়েক ঢাকঢোল পিটিয়ে কিছু লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে রাখা হয়। অভিযানের তোড়জোর কমে গেলে আবার পাহাড়ে গড়ে তোলা হয় অবৈধ বাড়িঘর এবং আশ্রয়কেন্দ্র থেকে আবার সেখানে ফিরে যায় লোকজন।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মূলত কতিপয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের একশ্রেণির অসাধু কর্মকতা-কর্মচারীর কারণে পাহাড়ে অবৈধ বসতি সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। পাহাড়ে কাঁচা-পাকা বাড়িঘর তৈরি করে ভাড়াটিয়া বসিয়ে ভাড়া আদায়ের পাশাপাশি এসব অবৈধ বাসায় গ্যাস, বিদ্যুত্ ও পানির অবৈধ সংযোগ দিয়ে এরা নিয়মিত মাসোহারা পায়। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসের কারণে প্রতি বছরই পাহাড় ধসে কোথাও না কোথাও মানুষ মারা যায়। যার মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জুনের ঘটনাটি ছিল ভয়াবহতম। সে বছর স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় ১২৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল চট্টগ্রামে। সরকারি হিসাবে চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি ২৮টি পাহাড়ে ৮৩৫টি পরিবার ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। তবে বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা আরো কয়েক গুণ বেশি বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, পাহাড়ে অবৈধ জনবসতি গড়ে ওঠা রোধ করতে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, সিটি করপোরেশনসহ কোনো সংস্থার মধ্যে সমন্বয় নেই। প্রশাসনের নজরদারির অভাবে সরকারি বেসরকারি পাহাড়গুলোতে কর্তৃত্ব করছে কিছু জনপ্রতিনিধি নামধারী ভূমিদখলদার ও স্থানীয় মাস্তান। এরা প্রথমে নানা কৌশলে ভাড়াটিয়া বসিয়ে পাহাড় দখল করে। পরবর্তীকালে রাতের অন্ধকারে পাহাড় কেটে সমতল করে ফেলে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের ২৮টি পাহাড়ের মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় আছে ১৭টি। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মালিকানাধীন সাতটি পাহাড়ে ৩০৪টি পরিবার এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০টি পাহাড়ে ৫৩১টি পরিবার অবৈধভাবে বসবাস করছে। অবৈধভাবে বসবাস করা পরিবারগুলোর মধ্যে রেলওয়ের লেকসিটি আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড়ে ২২ পরিবার, পূর্ব ফিরোজ শাহ ১ নম্বর ঝিলসংলগ্ন পাহাড়ে ২৮ পরিবার, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মালিনাকানাধীন কৈবল্যধাম বিশ্ব কলোনি পাহাড়ে ২৮টি পরিবার, পরিবেশ অধিদপ্তর সংলগ্ন সিটি করপোরেশন পাহাড়ে ১০ পরিবার, রেলওয়ে, সওজ, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও ওয়াসার মালিকানাধীন মতিঝর্ণা ও বাটালি হিল পাহাড়ে ১৬২ পরিবার, ব্যক্তি মালিকানাধীন এ কে খান পাহাড়ে ২৬ পরিবার, হারুন খানের পাহাড়ে ৩৩ পরিবার, পলিটেকনিক কলেজসংলগ্ন পাহাড়ে ৪৩ পরিবার, মধুশাহ পাহাড়ে ৩৪ পরিবার, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটসংলগ্ন পাহাড়ে ৩৩ পরিবার, মিয়ার পাহাড়ে ৩২ পরিবার, আকবর শাহ আবাসিক এলাকাসংলগ্ন পাহাড়ে ২৮ পরিবার, আমিন কলোনি সংলগ্ন টাংকির পাহাড়ে ১৬ পরিবার, লালখান বাজার জামেয়াতুল উলুম মাদ্রাসাসংলগ্ন পাহাড়ে ১১ পরিবার, ভেড়া ফকিরের পাহাড়ে ১১ পরিবার, ফয়’স লেক আবাসিক এলাকাসংলগ্ন পাহাড়ে ৯ পরিবার এবং এম আর সিদ্দিকী পাহাড়ে আটটি পরিবার বসবাস করছে।

এদিকে, বরাবরের মতো এবারও বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। গত বুধবার ফৌজদারহাট-বায়েজিদ লিংক রোডে একযোগে প্রায় ৭ কিলোমিটার জুড়ে ১৬টি পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে ৩৫০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। অভিযানে বাধা দেওয়ায় ১০ জনকে গ্রেফতার করে সাত দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযানে ৩০টি বৈদ্যুতিক মিটার জব্দ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, নবনির্মিত লিংক রোডের দুই ধারে গত এপ্রিল-মে মাসে পাহাড় কেটে ব্যক্তিগত ও সরকারি জমিতে প্রচুর নতুন ঘরবাড়ি তোলা হয়েছে, যেগুলো চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বৈদ্যুতিক মিটারগুলো কীভাবে এসব অবৈধ বাসায় গেল তা তদন্ত করে দেখা হবে।

ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলাম আরো জানান, করোনা পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য এবার আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা দ্বিগুণ বাড়িয়ে ১৯টি করা হয়েছে। মাইকিং করে লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানানো হলেও তারা আত্মীয়স্বজনের বাসায় চলে যাচ্ছেন।

ইত্তেফাক/আরকেজি