তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বিরাজ করছে সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে। হিমালয়ের পাদদেশ থেকে আসা উত্তরের হিমেল হাওয়ায় এখানে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। গত ৬ দিন ধরে এখানে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করছে। অব্যাহত সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এ জেলার জনজীবন।
গত ৬ দিন ধরে পঞ্চগড়ে ৫ থেকে ৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করছে। যা দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। তীব্র শৈত্যপ্রবাহের ফলে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিনই কমছে তাপমাত্রার পারদ। কনকনে শৈত্য প্রবাহের ফলে জুবুথুবু হয়ে পড়েছে জীবন যাপন।
শীতের তীব্রতায় জন জীবন অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। চলমান শৈত্যপ্রবাহকে এখানকার মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখছে। দুঃস্থ-অসহায় মানুষ শীতের এই তীব্রতাকে অভিশাপ হিসেবে দেখছে। শীতের প্রকোপে গ্রাম-শহর সব এলাকার মানুষ বিপাকে পড়েছে। উত্তরের হিমেল হাওয়ার কারণে প্রয়োজন ছাড়া অনেকেই ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছে।
আগাম প্রস্তুতি ও পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না থাকায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে মানুষ। শীতবস্ত্র ও গরম কাপড় না থাকায় দরিদ্র অসহায় ছিন্নমূল দিনমুজুর শ্রেণীর মানুষ কাজে যেতে পারছে না। হাঁড় কাঁপানো শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে খড়খুটো জ্বালিয়ে মানুষ শীত নির্বারণের চেষ্টা করছে। শীতের কারণে রাতে ঘুমোতে পারছে না মানুষ। অসহায় ছিন্নমূল মানুষ গরম কাপড়ের অভাবে মারাত্মক দুর্ভোগে পড়েছেন। যানবাহনগুলোও হেডলাইট জ্বালিয়ে সাবধানে যাতায়াত করছে।
গত বছর কুয়াসা দেখা গেলেও এবার কুয়াশা নেই। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যে জানা যায় কুয়াশা থাকলে শীত কম থাকে। এবার কুয়াশা না থাকার কারনেই ঘনিভূত হয়েছে শীতের প্রকোপ। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে শীতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দিনের বেলা রোদ উঠলেও শির শির বাতাসে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা অনূভূত হচ্ছে।
তেতুলিয়ায় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রহিদুল ইসলাম জানান, 'গত ৬ দিন ধরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করছে পঞ্চগড়ের তেতুলিয়ায়। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। যা দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। হিমালয় কাছে হওয়ায় হিমালয়ের হিমশীতল বাতাস এ এলাকায় আসায় এখানে তাপমাত্রা প্রতিনিয়ত কমছে। এবার ঘনকুয়াশা না থাকায় স্বাভাবিক তাপমাত্রা থাকছে না। কুয়াশা না থাকায় শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এ কারণে তাপমাত্রাও কমছে।'
জেলা শহরের ইসলামবাগ এলাকার সাইফুল ইসলাম বলেন, 'শীতের কারণে স্কুল প্রাইভেট যাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে। শৈত্যপ্রবাহের কারণে ঘরের বাইরে বের হতে গরম কাপড় টুপি পড়তে হচ্ছে।'
জেলা শহরের নিমনগর এলাকার দিনমজুর আনোয়ার হোসেন জানান, 'সকাল ১০টা পর্যন্ত শীতল বাতাস হচ্ছে। এ কারণে বাসা থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। আবার আমাদের তো ঘরে বসে থাকাও যায় না। কাজ না করলে খাবারও জুটবে না। কাজ না করলে অনাহারে থাকতে হবে।'
জেলা শহরের মসজিদপাড়া এলাকার রিপন হোসেন জানান, 'গত এক সপ্তাহ ধরে শৈত্যপ্রবাহ চলছে। ঘর থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। গরম কাপড়ের অভাবে দুঃস্থ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে।'
শহরের নতুন বস্তি এলাকার রিকশাভ্যান চালক সলেমান জানান, 'সকালে বের হলে কিছু টাকা হয়। কিন্তু গত ৫/৬ দিন ধরে সকালে এত বেশি ঠাণ্ডা করছে যে রিকশা চালানো যাচ্ছে না। রাস্তাঘাটেও লোকজন তেমন চলাচল করছে না। যাত্রী না থাকলে আয় ইনকামও হয় না। আয় করতে না পারলে গোটা পরিবারের কষ্ট হয়।'
নাইট কোচ চালক আব্বাস আলী জানান, 'শীতের সময় গাড়ি চালাতে কষ্ট হয়। কোন কোন দিন কুয়াশা বেশি হয়। এর ফলে ধীরে ধীরে গাড়ি চালাতে হয়। এতে সময় বেশি লাগে। অধিকাংশ সময় দিনের বেলা হেডলাইট জ্বালিয়ে যাতায়াত করতে হয়।'
অনেকে শীতকে বরণ করতে নিতে শুরু করেছে নানান প্রস্তুতি। জেলার বিভিন্ন এলাকার গরম কাপড় মার্কেটেও শীতবস্ত্র বেচা-কেনা শুরু হয়েছে। শীতের কারণে লেপ তোষক, কাঁথা বানানো ও কম্বল কেনাও শুরু হয়েছে। গরম কাপড় ও লেপ তোষকের দোকানে ভিড় বেড়েছে। বেড়েছে বেচাবিক্রিও। জেলার প্রায় দুই লাখ দুঃস্থ্য মানুষ এই শীতে দূর্বিষহ জীবনযাপন করছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাও আবার শিশু কিশোরদের জন্য কোন শীতবস্ত্র বিতরণ করা হচ্ছে না।
পঞ্চগড় পৌরসভার মেয়র তৌহিদুল ইসলাম জানান, 'পৌর এলাকায় প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি অসহায় ছিন্নমূল ও দুঃস্থ মানুষ বসবাস করে। হঠাৎ শীত জেঁকে বসেছে। সামান্য কম্বল পেয়েছি, তা ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। প্রতিদিন কয়েক শত শীতার্ত লোক পৌরভবন ও বাসায় ভিড় করছে।'
শৈত্যপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন শিশু ও বৃদ্ধরা। শীতের তীব্রতা বাড়ার কারণে প্রতিদিনই বাড়ছে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। প্রতিদিন এই হাসপাতালে শীতজনিত রোগীরা ভর্তি হচ্ছেন। গত দুদিনে প্রায় ৫০ জন শিশু ও বৃদ্ধ পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এরকম চিত্র উপজেলার অন্য হাসপাতালগুলোতেও।
জেলার বোদা উপজেলার আমতলা কাজীপাড়া এলাকার গৃহবধূ জোসনা বেগম কোলের শিশুকে নিয়ে এসেছেন পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে। দুইদিন ধরে পাতলা পায়খানা হচ্ছে। একারণে চিকিৎসক তাদের হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেছেন। শিশুর নিউমোনিয়ার কারণে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি আছেন জেলার সদর উপজেলার হাড়িভাসা এলাকার গৃহবধূ আকলিমা বানু।
অতিরিক্ত শীতের কারণে সন্তানের শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। জরুরী বিভাগে নিয়ে এলে তাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। তাই গত দুদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন জেলার সদর উপজেলার ধাক্কামারা এলাকার আমেনা বেগম।
পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. প্রতীক কুমার বনিক জানান, 'শৈত্যপ্রবাহের ফলে এখানে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ শীতজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। ফলে অন্যান্য সময়ের তুলনায় এখন হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। শিশুদের বাঁশি খাবার পরিহার করা, পরিষ্কার ও ফুটন্ত পানি পান করানোর জন্য অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি এই শীতে শিশু ও বৃদ্ধদের গরম রাখবার জন্য পরিবারের সদস্যদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, 'জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ২৪ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। আরও শীতবস্ত্রের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। শীতের প্রকোপ মোকাবেলায় বেসরকারি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে শীতার্তদের বাঁচাতে এগিয়ে আসার আহবান জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ আগৈলঝাড়ায় গৃহবধূর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার
উল্লেখ্য, গত বছর জানুয়ারিতে পঞ্চগড়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পঞ্চগড়ের ইতিহাসে তো বটেই দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল এটি। ৫০ বছর আগে ১৯৬৮ সালে দেশের শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২ দশমিক ৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস।
ইত্তেফাক/নূহু
