ফরিদপুরের ভাঙ্গা পৌরসভায় বিশেষ ওএমএস কার্ডে অনিয়মের অভিযোগ

আপডেট : ২৬ জুন ২০২০, ১৭:২৩

ফরিদপুরের ভাঙ্গা পৌর এলাকায় করোনা দুর্যোগকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেয়া বিশেষ ওএমএস কার্ড বরাদ্দে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা জানান, তালিকায় ও কার্ডে নাম থাকলেও কোন চাল সহায়তা পাননি তারা।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা পৌরসভা করোনার অধিক সংক্রমণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। ইতিমধ্যে সেখানে রেডজোন ঘোষণা করে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আবারো কর্মহীন হয়ে পড়েছে দিন এনে দিন খাওয়া পরিবারগুলো। সেখানে সরকার প্রধানের দেয়া বিশেষ সহায়তা কার্ডে নাম থাকার পরেও চাল পাননি অনেক পরিবার।

সম্প্রতি ওএমএস কার্ডের চাল দেয়ার সময় কার্ড একজনের, কিন্তু চাল তুলতে অন্য একজন আসলে বিষয়টি জনসম্মুখে আসে। দেখা যায় পৌর এলাকার কাফুরা সদরদী গ্রামের মিতু আক্তারে নামে কার্ড নিয়ে চাল নিতে আসেন অন্য এক যুবক। অথচ মিতু আক্তার জানেনই না যে তার নামে কার্ড বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

খবর পেয়ে মিতু আক্তারের স্বজন চাল বিতরণের স্থানে উপস্থিত হয়ে ওই কার্ডটি নিয়ে আসে। এ সময় স্থানীয়রা এধরনের আরো বেশ কয়েকটি কার্ড জব্দ করে। দেখা গেছে কার্ডগুলোতে ভাঙ্গা পৌর মেয়র আবু রেজা মো. ফয়েজ এর সীল ও স্বাক্ষর এবং স্থানীয় কাউন্সিলর টুটুল ফকিরের সিল দেয়া রয়েছে। যদিও কাউন্সিলর স্বাক্ষর করার পরে মেয়রের স্বাক্ষর করার নিয়ম, কিন্ত সেখানে কাউন্সিলরের কোন স্বাক্ষরই ছিল না।

মিতু আক্তারের মত একই অভিযোগ মো. শওকত মুন্সী, চাদ মিয়া মুন্সী, সোহেল শেখ, অনিক মুন্সী, নাসির মুন্সী, সজিব শেখ, পারুলী বেগম, মো. আজীম মুন্সী, আক্কাস মুন্সীসহ আরো অনেকের। তালিকায় তাদের নাম রয়েছে, রয়েছে কার্ডও, কিন্তু অদ্যবদি তারা কোন খাদ্য সহায়তা পাননি।

চাল পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে শওকত মুন্সী আক্ষেপের সুরে বলেন, চাল তো পাইইনি, এই কথা ইউএনওসহ কয়েক জায়গায় বলাতে কাউন্সিলর তাকে বকাঝকা করেছেন।

অপরদিকে আমেনা বেগম, সালেহা বেগম ও পলি আক্তার নামে তিনজনের নামে কার্ড বরাদ্দ দিয়েছে পৌরসভা। কিন্তু তারা পার্শ্ববর্তী আলগী ইউনিয়নের বাসিন্দা।

উল্লেখ্য, দেশে করোনা দুর্যোগ শুরু হলে বিনামূল্যে খাদ্য সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বিশেষ ওএমএস চালু করা হয়। সেখানে ১০ টাকা কেজি মূল্যে ৩০’শ টাকার বিনিময়ে ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হয় কার্ডধারীদের।

স্থানীয় বাসিন্দা ইসমাইল মুন্সী জানান, ৯ নং ওয়ার্ডেই আমরা ৩০/৪০ জনকে চিহ্নিত করেছি যারা অন্যের কার্ডে চাল নিচ্ছেন। চিহ্নিত করতে পারেনি এমন রয়েছে আরো অনেকে। শুধু মাত্র এই ১টি ওয়ার্ড না, পুরো পৌরসভার সব জায়গাতেই একই ভাবে জালিয়াতি হয়েছে।

পৌরসভার  ৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর টুটুল ফকির জানান, অনেক কার্ডের ভিতর ২/১ টায় ভুল হতে পারে, সেটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ভুল। তিনি আরো জানান, অনেক সময় দেখা যায় একই বাড়ির বা পাশাপাশি বাড়ির ১০ জনের কার্ড একজনের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসছি সবাইকে দেয়ার জন্য। যার কাছে দিয়েছি সে কার্ডগুলো বিতরণ করে নাই এমনও হয়েছে। তিনি দাবী করেন, তিনি তার কাজ সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও সততার মাধ্যমে করেছেন।

পৌর  মেয়র আবু ফয়েজ মো. রেজা অভিযোগের বিষয়ে বলেন, পৌরসভার ২৭ গ্রামে ৪২’শ কার্ড বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কার্ড গুলো বরাদ্দ দেয়া হয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর ও আওয়াম লীগ নেতৃবৃন্দের দেয়া তালিকা থেকে যাচাই বাছাই করে। সেখানে কাফুরা সদরদীতে কিছু অভিযোগ উঠেছে, বিষয়টি তদন্ত করতে প্যানেল মেয়র লিয়াকত মোল্যাকে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। যদি সেখানে কাউন্সিলর বা পৌরসভার কারো গাফলতির প্রমাণ পাওয়া যায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এই বিষয়ে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, আমাদের কাছে কয়েকটি জায়গা থেকে অভিযোগ আসছে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে আলফাডাঙ্গাতে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি। ভাঙ্গার বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। যদি জালিয়াতি, স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতি হয়ে থাকে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জেলা প্রশাসক আরো জানান, এখন থেকে ওএমএস এর কার্ডেও আমরা কিউআর কোড বসিয়ে দেব, যাতে করে এক জনের কার্ড অন্য কেউ ব্যবহার করতে না পারে। কোড বসানো হয়ে গেলে এই নিয়ে জালিয়াতি করার কোন সুযোগ থাকবে না।

এই বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন বলেন, 'দেশের এই দুর্যোগ কালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশক্রমে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অসহায় মানুষের পাশে দাড়িয়ে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করছে সবাই। সেখানে দুর্যোগের মধ্যে কার্ড বিতরণে অনিয়ম খুবই দুঃখজনক ঘটনা। ভুক্তভোগীরা আমার কাছেও এসেছিল। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে দাবি থাকবে বিষয়টি যেন অতিসত্বর খতিয়ে দেখা হয়, দোষীদের আইনের আওতায় আনা হয় এবং বঞ্চিত দরিদ্রদের কার্ড বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়।

ইত্তেফাক/আরএ