গতসংখ্যার পর
কিন্তু পুরোপুরিই কি বেরিয়ে আসেন? অথবা, সেই প্রখরতা, সেই ঝংকার, সেই ঘোষণা বদলে গিয়ে নতুন একটা স্বর হয়ে ওঠে যার ভেতরে আগেকার ওইসকল রয়ে যায় নিমজ্জিত— কিন্তু নিশ্চিহ্ন নয়; বলা যেতে পারে, দ্রবীভূত হয়েই। দ্রবীভূত হয়ে প্রখরতা দেখা দেয় গভীরতা হয়ে, ঝংকার বদলে যায় নিবিড়-কথনে যেনবা কানে কানে নিচুস্বরে, আর ঘোষণা সরিয়ে বাক্ হয়ে ওঠে উপলব্ধি। ঘনিষ্ঠ তাপ বইটিতেই একটি কবিতা রিক্শাওয়ালা-য় খবরটা আবিষ্কার করা যাবে। কবিতাটি আমি পুরোই বলছি : বলবার দরকার আছে অরুণ মিত্র-র কাজটিকে বোঝবার জন্যে। রিক্শাওয়ালা :
‘রিক্শার চাকা দুটো ঘুরতে ঘুরতে এইখানটায় এসে দাঁড়ায়। আমার বাড়ির সামনে অপেক্ষা করে। যে-লোকটা চালায় একদিনও তার কামাই নেই, এই বিষম ঠান্ডাতেও না। এমনিতে তাকে দেখে আমার চেনার কথা নয়, কারণ তার মুখটা যেন রোজই বদলায়। চাকা দুটোর ঘোরা থেকে চিনি।
সন্ধের পর ছেলেবউকে অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে সে বেরিয়ে পড়ে। কোন্ মহল্লা থেকে তা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। শুধু এইটুকু বুঝতে পারি, ভুতুড়ে আলোগুলো পার হয়ে গেলে এক প্রকাণ্ড যে শীতের রাত পড়ে তার ওপারে সে থাকে। যেখানেই থাকুক কিছু আসে যায় না। আমার বাড়িটা যে তার চেনা, আমাদের দু-জনের পক্ষে এটাই বড় কথা।
শীতের ঢেউ যে-সব রাস্তায় আছড়ে পড়ে সেই সব রাস্তা দিয়ে রিক্শা চড়ে আমি অনেকবার গিয়েছি। তখন মানুষটার মধ্যে আগুন গনগন করতে দেখেছি, মনে হয়েছে তার অস্থিমজ্জা জ্বলছে। আমার গায়ে সেই আঁচ এসে লেগেছে। তার সুতির ফতুয়াটা তখন তীব্রভাবে উড়তে থাকে এবং আমার ভয় হয় আমার গরম জামাকাপড় বুঝি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে। কিন্তু না, প্রত্যেকবারই সে ভুতুড়ে আলোগুলোর মধ্যে দিয়ে আমাকে আবার এইখানে ঠিকমতো পৌঁছে দিয়েছে। এমনকি তার বাড়িটা যে একসময় খুব কাছাকাছি এসে গিয়েছিল, এ অনুভূতিটাও আর লেশমাত্র থাকেনি। আজও সে আমাকে নিয়ে শীতের রাতের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং নিরাপদে আবার ফিরিয়ে আনবে।
খুব সম্ভব কোনো একদিন সে আসতে পারবে না। ভেতরের আগুনটা নিবে গিয়ে সে ঠান্ডায় জমে পাথর হয়ে কোথাও পড়ে থাকবে। কিন্তু তা বলে রিক্শার চাকা দুটো তো মাটিতে গেড়ে যাবে না। তারা আবার ঘুরবে এবং তাই থেকে আমি বুঝব সেই রিক্শাওয়ালা হাজির হয়েছে, এখন যেমন বুঝি। এটাই আমার কাছে এক স্বস্তি।’
আমরা কি লক্ষ করতে পারছি স্বরের বদল, চোখের বদল, কবিতা-ভাবনার বদল? শনাক্ত করতে পারছি কি মূলে উপকরণটা এক থেকে গেলেও দৃষ্টিকোণ এবং উপস্থাপনাটি কতই না ভিন্ন হয়ে গেছে? আমরা কি অনুভব করে উঠছি একজন ‘আমি’কে— জনতার সমস্বরের বিপরীতে? উত্তরটা নিজে না দিলেও, উত্তরটা পাওয়া যাবে অরুণ মিত্র-র এই কবিতাটির পরেপরেই সুকান্ত ভট্টাচার্য্যর ‘রানার’ কবিতাটি পড়ে দেখলেই। শ্রম ঘাম দারিদ্র্য— উপকরণটা এই। দুটো রচনারই। কিন্তু প্রতীকের ব্যবহারে ও বেদনার অনুরণনে কী আলাদাই না তারা।
ফরাসি কবি পল এল্যুয়র অরুণ মিত্র-র প্রিয় কবিদের একজন; এল্যুয়রকে তিনি লক্ষ করেছেন নিবিড়ভাবে, সম্ভবত, যেহেতু আমি ফরাসি ভাষা খানিক ছায়ার মতো জানি, কিন্তু রক্তমাংসে ঠিক ঠাহর করতে পারি না, তাই বলছি সম্ভবত— সম্ভবত এল্যুয়রের কবিতা থেকে গভীর পরামর্শ সংগ্রহ করেন কীভাবে সমষ্টিকে অনুভব করেও ব্যক্তিকে তার আর্তি ও উল্লাস সমেত কবিতায় আনা যায়। এই দিকটা সম্পর্কে অরুণ মিত্র নিজেই তাঁর এক প্রবন্ধে সংকেত দেন, ‘প্রতিরোধ-আমলে সর্বজনীন চেতনার আলোয় নেমে এলেও হূদয়ের অস্ফুট রহস্যের জগত্ থেকে বিচ্যুত ছিলেন না এল্যুয়র।’ অরুণ মিত্র এল্যুয়রের এই ব্যাপারটা— হয়তো এ তাঁরই আত্মকলমের ভেতর-কথাটিকে— আরো বুঝিয়ে বলেন আমাদের : ‘ব্যক্তিগত প্রেম ছিল তাঁর ধ্যানের বিষয়, কিন্তু তা কোনো কিছুকে অস্বীকার করে নয়। প্রেমকে তিনি তাঁর মুক্তির নির্যাসে সমগ্রভাবে ধরতে চেয়েছেন, খণ্ডিত করে নয়। সুতরাং জীবন ও মানুষের প্রতি আত্মীয়তা তাঁর সত্তায় শিকড় মেলে ছিল। বরং তাঁর মতো ভালোবাসার কবি যদি মানুষের যন্ত্রণায় বিচলিত না হতেন, যদি অত্যাচারের বিরুদ্ধে না দাঁড়াতেন, তবে সেটাই আশ্চর্যের হতো।’ আমাদের সন্দেহ থাকবার কথা নয় যে এটা অরুণ মিত্র-রও ছবি। তবে, দু’জনার ভেতরে মৌলিক একটা পার্থক্য আছে। সেটা হচ্ছে— এল্যুয়র ভালোবাসার কবিতা দিয়ে শুরু করে মানুষের— সমষ্টির— রাজনৈতিক বাস্তবতার— যন্ত্রণার কাছে গিয়েছেন, আর অরুণ মিত্র-র যাত্রা ঠিক এর উলটো ইতিহাস— ওই সকল বোধ ও যন্ত্রণা, প্রখর ঝংকৃত ঘোষণা থেকে মগ্নস্রোতে।
কিন্তু মগ্নস্রোতেও ঠিক নয়। মগ্নস্রোতটি যতটা না তাঁর অনুভবের মানচিত্রে, অনুভবে তিনি এখনো, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সমষ্টিসংলগ্ন ও তাদ্বারা আলোড়িত— আসল মগ্নতা তাঁর দেখবার চোখ দুটিতে এবং বলার কথাটির স্বরস্পন্দনে। বলার ব্যাপারটি বলে নেয়া যাক এই অবসরে। অরুণ মিত্র তাঁর প্রায় সব কবিতা গদ্যে লিখেছেন— একেবারে টানা গদ্যের বিন্যাসে ছেপেওছেন। তাই বলে কি তারা ছন্দহীন? গদ্যে লেখা কবিতাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন— ভাবছন্দ। এই ভাবছন্দটি অরুণ মিত্র কোথা থেকে পান? আমাদের মনে হতে পারে অরুণ মিত্র ছিলেন ফরাসিভাষায় দক্ষ, প্রচুর ফরাসি কবিতা পড়েছেন, ফরাসি কবিতার অন্তত দু’জন— জাঁ আর্তুর র্যাঁবো আর সাঁ ঝন পার্সের নজির তাঁর সমুখে ছিল— র্যাঁবোর বিষয়ে তিনি যে দারুণ উত্সাহী ছিলেন, সে খবর বাংলাদেশেও আমাদের কাছে পৌঁছোয় জনরব হয়ে— হয়তো সেই র্যাঁবো থেকেই গদ্যকে ভাবছন্দে তুলে আনবার ও কাজে লাগাবার প্রেরণাটি পান। হয়তো! অনুমানমাত্র। আমার যেটা মনে হয়, তাঁর কবিতা পড়ে পড়ে— পড়াও ঠিক নয়— কানে শুনে— ছাপা অক্ষরে বাঁধা কবিতাও আমি কানে শুনে তবে তা পাই— সেই শুনে শুনে, বাক্যবন্ধের দোলা ও তাল-চাল শোণিতে অনুভব করে আমি দেখে উঠেছি যে, অরুণ মিত্র তাঁর মাটি তাঁর ভাষাতেই— রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসুর গদ্যে লেখা কবিতা থেকেই নিশ্চয় প্রাণিত হন বা সাহসটা পেয়ে যান। অরুণ মিত্র তাঁর গদ্যের যে বাক্স্পন্দনটি কবিতায় নিয়ে আসেন, তার ভেতরে রবীন্দ্রনাথের স্পন্দনটি থেকে থেকেই মনে পড়বে আমাদের— বাক্যে ক্রিয়াপদের সংস্থানে নয়, বাক্যের হ্রস্ব-দীর্ঘ বুননে, খুব গভীর কথাটি সরল করে বলবার ছলায়।
তবে ছন্দ বলতে আমরা যা বুঝি, ছন্দের সঙ্গে টানেটানে যে মিল লাগাবার ব্যাপারটাও চলে আসে— রবীন্দ্রনাথের সমকক্ষ এমন নিপুণ কারিগর আমাদের ভাষায় এখন পর্যন্ত কেউ নন, যদিও আমি বুদ্ধদেব বসুর কথা ভুলে যাচ্ছি না, ছোট আকারে অমিয় চক্রবর্তীর কথাও নয়— এই ছন্দ আর মিলের বিরুদ্ধে অরুণ মিত্র যে অবস্থান নেন, সেটা আমার কাছে অবোধ্যই থেকে যায়। অরুণ মিত্র অবস্থানটা নেন এই রকম : তাঁর প্রবন্ধ থেকে :
‘কবিতা লিখতে গিয়ে আমি বারেবারে তাদের— অর্থাত্ ছন্দে ও মিল— তাদের কাছ থেকে বাধা পেয়েছি বলেই অন্য পথ ধরেছি। এখন তো আমার কাছে ছন্দমিলকে একটা সংস্কার মনে হয়। সংস্কার? আমরা অবাক হই। তিনি আরো বলেন, মিল যতখানি সাহায্য ধ্বনিবিন্যাসে করতে পারে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে কবিতার। যে-শব্দ ব্যবহারের কোনো প্রয়োজন নেই, সেই শব্দ সে ঘাড়ে ধরে প্রায়ই ব্যবহার করায়। এবং মিলের জন্যে কবিতার বক্তব্য বিপথে চলে যেতে পারে।’
অবাক হতেই হয়! সংস্কার না হয় বলা গেল ছন্দ মিলকে, মিল কবিতার ক্ষতি করে! অনিবার্য নয় এমন শব্দকে ঘাড়ে ধরে টেনে আনে মিল! আর মিলের এই দস্যুতার জন্যে কবিতার বক্তব্য বিপথে চলে যেতে পারে!— এমনটি যাঁর হাতে হয়, হতে পারে, তিনি তো কবিই নন। এই সরল কথাটি কীভাবে অরুণ মিত্র ভুলে গিয়েছিলেন ভাবতে আমার অবাক লাগে। শ্রদ্ধা রেখেই আমি তাঁর এ মন্তব্যটিকে আমার স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে চাই। বড়মাপের একজন কবির পক্ষেও যে কাজের কারিগরি দিক নিয়ে অসাবধান উক্তি করাটা অসম্ভব কিছু নয়— এটা আমাদের সতর্কই করবে।
অরুণ মিত্র ভাবছন্দ ব্যবহারে রবীন্দ্রনাথের দিগন্তছোঁয়া প্রান্তরের টান যেমন কাজে লাগিয়েছেন, তেমনি বুদ্ধদেবের মহানাগরিক টোনটিও আত্মস্থ করেছেন; অনুকরণ নয়, অনুসরণও নয়, নিজস্ব একটা নিসর্গ তৈরি করেছেন গদ্যের— আর সেটি তাঁরই স্বাক্ষরিত হয়েছে কত সাবলীলভাবেই না প্রতিদিনের জবান থেকে তুলে আনা শব্দের পর শব্দ সমাহারে। ভাবা যায়— কিলিবিলি, ল্যাঠা, পেল্লায়, তুড়ুং, এন্ডিগেন্ডি, হুড়কো, দিল্লেগি, জাবড়ানো, মাদারি, ছরকুট, জেল্লা, অ্যায়সা রংঢং, ঝকমারি, আরো কত কত মুখের শব্দ আমাদের মুখেই ছিল, কবিতায় নামেনি; অরুণ মিত্র তাদের একটা একটা করে তুলে এনে নক্ষত্রের মতো আকাশে বসিয়ে দিয়েছেন— আকাশটা ঝলমল করছে এখন। আর এই জবানী শব্দগুলোর জন্যেই অরুণ মিত্র-র কাব্যভাষাটি হয়ে উঠেছে কারো সম্প্রসারণ নয়, শুধু তাঁর— তাঁরই উদ্ভাবিত।
কবিতায় শব্দের ব্যাপারে তিনি যে কতটা সচেতন ছিলেন, জেদী ছিলেন, শব্দগুলোকে টেনে টেনে তিনি যে বিন্যাসের ভেতরে ফেলে ভাঙচুর করেছিলেন, প্রথাসিদ্ধ বাক্ভঙ্গিতে তাঁর যে কতখানি অনাস্থা ছিল, এ খবরটা পাওয়া যাবে তাঁরই একটি কবিতায়— ‘শেষ ভোরের ডাক’ নামে অসাধারণ একটি প্রেমের কবিতায়— যার গদ্যশরীরের ভেতরে ছন্দেও কিছু নিটোল পঙিক্ত রয়েছে। অরুণ মিত্র বলছেন :
‘তোমাকে, তোমার সাক্ষােক আমি এইমাত্র আঁকতে যাচ্ছিলাম চলতি কথার বয়ানে : তোমায় দেখেছিলাম অন্ধকারে।’
লক্ষ করি— ‘তোমায় দেখেছিলাম’— এমন বলাটাই ছিল প্রথাপ্রত্যাশিত, কিন্তু পরমুহূর্তেই কবি বলছেন :
‘পণ্ডশ্রম পণ্ডশ্রম। অন্ধকারই যদি, তাহলে তোমাকে দেখেছিলাম কী করে? চলতি কথারা, এই শব্দপুঞ্জ, এদের নিয়ে বেজায় ঝকমারি। এরা সব অভ্যেসের দাস, বিশ্বাসঘাতকতা এদের স্বভাবে গুঁড়ি মেরে থাকে, একটু সুযোগ পেল তো হালুম, আসল বলাটা ছিন্নভিন্ন, খেই হারিয়ে তখন খালি আকুলিবিকুলি। যা বলতে চাই : তার উলটোটাই অনেক সময়... এ বড় বিষম ফাঁদ। আমি তাই নিজেকে বলি : শব্দ খোঁড়ো, অন্ধকার খুঁড়ে মাঝরাতের সূর্য ওঠাও, আগুন খুঁড়ে তোলো তুষার, বিষাদ খুঁড়ে উল্লাসকে ডাকো, খোঁড়ো শব্দ খোঁড়ো।’
কবির কাজটি যে কী, এই বাক্যটি হিতোপদেশ হয়ে থাকতে পারে নবীন কবিদের জন্যে— শব্দ, শব্দকে খুঁড়ে খুঁড়ে অন্ধকার থেকে সূর্য— তাও মাঝরাতের, আগুন থেকে তুষার, বিষাদ খুঁড়ে উল্লাস।
কবি ভাষা থেকে শব্দ পান— প্রতিদিনের জাগতিক কাজে লাগা শব্দ হলেও, কবি যখন হাতে তুলে নেন শব্দ, তা শত ধর্ষণ সত্ত্বেও কৌমার্য নিয়েই তাঁর হাতে, শত উপেক্ষা সত্ত্বেও মাল্যের জন্যে অপেক্ষমাণ হয়ে সে আসে; কবির হাতে— কবিদেরই হাতে শব্দের পূনর্জন্ম হয় আত্মায় ও লক্ষণায়, কৃষকও সিংহাসনে বসবার অধিকার পায়, রকবাজের জবানও কবির ভাষা হয়ে ওঠে।
অরুণ মিত্রকে আমরা দেখেছি একদার প্রখর ঝংকৃত ঘোষণা থেকে সরে এসে মগ্নস্রোতে নিমজ্জিত হতে, তার সঙ্গে এটাও আমি দেখি— তাঁর চোখ উন্মিলীত হতে, যে-চোখ একান্ত তাঁরই, যে-চোখের কারণেই তিনি অরুণ মিত্র আজ আমাদের কাছে, যে-চোখ যাপিত জীবন, সংসার ও জগতের ভেতরে চলেই-চলা তামাশাটি দেখে ওঠে— যেনবা আলো-আঁধারির তামাশা— আলো-আঁঁধারিই তো!— আর তাকে পরতে পরতে খুলে দেখান তিনি। এই চোখটিই তাঁকে অনন্য করে তুলেছে, তাঁর কবিতাকে তাঁরই স্বাক্ষরিত করে উঠেছে।
তবে এই তামাশাটি উচ্ছলও নয়, লঘুচিত্তেরও নয়— ইংরেজিতে একে বলা যায়— ডার্ক। যে-তামাশা দেখে গা ছমছম করে ওঠে— আমাদের— তাঁর নয়, আমাদেরই তিনি ছলেক চমেক দিতে চান— নিজে তিনি মগ্নতার ভেতর থেকে অবলোকন করেন— যদিওবা প্রায়ই বলেন উত্তম পুরুষে, ওটা বলবার ভঙ্গি মাত্র— থাকেন তিনি নিরপেক্ষ, এমনকি নিরাসক্তও— এই নিরাসক্তিটাই সেই মগ্নস্রোত। দেখাটা নয়। দেখেন তিনি নিকটেও নয়, একেবারে ভেতরে প্রবেশ করেই।
অরুণ মিত্র দেখতে পান— একেবারে তাঁর শেষদিককার কবিতা থেকে স্তরে স্তরে পেছুতে যদি থাকি— যদি তাঁরই কবিতার ভেতর থেকে পঙিক্তগুলো তুলে তুলে দেখি— দেখতে পাবো তামাশাটিই তাঁর কবিতার ভেতরের শাঁস। এতেই তিনি, তিনি।
সেদিন ‘তিনি পেল্লায় এক বাজারের মধ্যে গিয়েছেন’, অরুণ মিত্র বলছেন, ‘আর সেখানে ডাঁই করা তরিতরকারি মাছমাংসের সঙ্গে অনেক মানুষও দেখে’ অবাক হয়েছেন— ‘সেকি! মানুষও বিক্রি হয় নাকি?’ চমকে উঠছেন— ‘কেন? মানুষ কি মানুষের মাংস খায় এখন?’ জেনে উঠছেন, ‘মানুষের মাথার ঘিলুই তো শরীরের সেরা অংশ, গোলমেলেও বটে, ওটাকে পরপর নানারকম শব্দের ধাক্কা লাগিয়ে গলিয়ে ফেলা হয়’, তারপরই তো টুপ করে গিলে ফেলা।
সাপেকাটা লাশ লখিন্দরকে নিয়ে বেহুলা যদি কলার ভেলায় না উঠত, তার বদলে যদি বেহুলাই সাপেকাটা হতো, তাহলে? তামাশাটা এই— ‘লখিন্দর ডাঙাতেই থাকত এবং ডাঙার ওপর দিয়ে ভাঙা হূিপণ্ড নিয়ে শোকাচ্ছন্ন ফিরে আসত বাড়িতে। মাস দুই মাত্র শোকাচ্ছন্ন থেকে একটি মেয়েকে সে বিয়ে করত, যদিও নতুন বধূটি বেহুলার মতো ‘অপরূপ সুন্দরী সে নয়,’ কিন্তু তাতে কী! কাজ তো চলে যেত!
বলছেন তিনি, ধন্য আমি, নিজমুখেই বলতে হচ্ছে, কারণ ‘এটা আত্মনির্ভরতার যুগ। সুতরাং আত্মপ্রচার করতেই হয়।’ কেন ধন্য? কারণ, ‘আমি একজন অতি উত্কৃষ্ট (সর্বোত্কৃষ্টও বলা যায় হয়তো) অভিনেতা।’ আর সে অভিনয়টা কিসের? ‘এই মুহূর্তে যখন আমার হূিপণ্ড ফাটব ফাটব করছে, তখন আমি তারুণ্যের জয়গান গাইছি!... কারো বোঝার সাধ্যি নেই আমি অভিনয় করছি।... আমার আসল-নকলে তফাত্ করবে কে?’
তিনি তো জানেন মুখসোয়াদি শান্তিবাণী ‘একদিন তাঁর ভিটেয় ঘুঘু চরিয়ে দেবে,’ তবু স্বপ্ন দেখার বিরাম নেই। স্বপ্নরা এসে তাঁকে দেখাবে ‘ইন্দ্রসভা, দেখাবে ধনধান্যে পুষ্পে ভরা।’ ‘এক নম্বর শান্তিবাণী’ যখন স্বপ্নের ছবিঘরে তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে, তখন ‘দু নম্বর শান্তিবাণী এক নম্বরকে কচুকাটা করে রাজত্ব করার জন্যে মহাব্যস্ত।... স্বপ্নরা এবার রাত ছেড়ে পালালো বলে। এর চেয়ে বড় তামাশা আর কী হতে পারে।’
প্রেমিকাকে তিনি বলছেন, ‘তোমার উষ্ণতা আমার জীবনকে জড়িয়ে আছে’— বেশ তো! কিন্তু বাস্তবে দেখছেন— উষ্ণতাকে সে নারী অবিরাম বরফের হাতে তুলে দিচ্ছে। ব্যাপারটা শোকাবহ হতে পারত। কিন্তু অরুণ মিত্র জানেন, ‘যতক্ষণ না আমাদের গায়ে বেঁধে ততক্ষণ আমরা বুঝতেই পারি না এটা কাঁটাতার।... আমরা ঘেরাও হয়ে আছি এইসবে।...’ তখন বলেন, ‘আহা ঘেরাওয়ের কী শিল্পশ্রী।’
নিজেকে অরুণ মিত্র বলছেন, ‘আমি ম্যাজিকওয়ালা।’ আমাদের জীবন যে আসলে ঘেরাওয়ের মধ্যে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন, ‘সময়ের কালো কালো টুকরো যাদের গায়ে সেঁটে থাকে, তারা বুঝতেও পারে না আসলে কেমন দশায় রয়েছে তারা। হাঁ করে তারা আমার লোফালুফি দেখে। তাদের বেঁচে থাকাটা সামনে ঝলমল করে ওঠে।...’ ঘোষণা করছেন, ‘আপনারা এখন বুঝতে পারছেন নিশ্চয় কত বড় বাহাদুর ম্যাজিকওয়ালা আমি।’
বলছেন, ‘আমাকে দ্যাখো! কেন দেখবো? বলছেন, ‘নিজেকে ঘুম পাড়াতে আমার মতো কে পারে? এত হৈচৈ হট্টগোল টালমাটাল। তবু তার মধ্যেই ঘুমপাড়ানি গুনগুন আর আস্তে আস্তে চোখের দু’পাতা জুড়ে যাওয়া। এ কী সহজ ক্ষমতা।’ একে বলে ঠোঁট শক্ত রেখে হাসা— তাও নিজেরই প্রতি নিজেরই বিভঙ্গ দেখে।
চাপা ঠোঁটে বলা তামাশার বিদ্রূপ জড়ানো অরুণ মিত্র-র একটি কবিতা লক্ষ করি : ‘আমি নতুনের ছাপ লাগাচ্ছি পুরনোয়। আমার হাত খুলে যাচ্ছে। এইভাবে এগিয়ে গেলে মনে হয়, কাছাকাছি একটা সময়ে রাতের ওপর আমি ছাপ লাগিয়ে দিতে পারব দিনের। ব্যস, তাহলেই কেল্লাফতে। বিধাতার ক্ষমতা এসে যাচ্ছে আমার হাতে। আমি রাতকে দিন দিনকে রাত, রাজাকে ভিখিরি ভিখিরিকে রাজা বানাতে পারব।’
আমরা স্মরণ না করে পারব না, কথাগুলো বলছেন সেই কবি যিনি শোষিতের পক্ষে একদিন প্রখর ঝংকৃত গলায় ডাক দিতেন, ‘প্রাচীরপত্রে পড়োনি ইস্তাহার/লাল অক্ষর আগুনের হল্কায়/জলসাবে কাল জেনো।... যুগান্ত উত্কীর্ণ : এখনি পড়ো/নতুন ইস্তাহার।’ এই স্মৃতিপাঠের সঙ্গে সঙ্গেই আমরা জেনে যাই কবি যে চোখ দুটি অর্জন করেছেন— তা এক ত্ তামাশা অবলোকনেরই— আর এখানেই, আরো একবার বলছি— তিনি, তিনি।
‘এ কি সমুদ্রের হাওয়া এই যে আমার’— অরুণ মিত্র-র— ‘গায়ে এসে লাগল?’
অরুণ মিত্র বলছেন,
‘আমি বুঝি না কোথা থেকে কোন্ হাওয়া আসে, /আমি হাওয়াই বুঝি না।/ফার্নেসের ভালোবাসা আমার চামড়ায় খুব ট্যান দিয়েছে/আর ছাপ মেরেছে এক নম্বর,/যদি দু’একজোড়া জুতো বানান, দেখবেন কী আরাম।/... আমার সম্পদ বলতে এখন শুধু একটাই :/গায়ের এই জুতো বানাবার দামি চামড়াটা।’
অরুণ মিত্র-র কবিতা থেকে, ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত কবিতার বই ‘ঘনিষ্ঠ তাপ’ থেকে, আমি যে বদলটা লক্ষ করি তাঁর চোখের ও বলবার ধরনটির, সেটি তামাশা অবলোকনের, যে-তামাশা তাঁরই বর্ণনায় আলো-আঁধারির তামাশা— আর বলবার ধরনটিও বদলে গিয়ে মগ্ন ধরনের, সে মগ্নতাও উদাস বাউলের নয়, চিলেকোঠাবাসী ভাবুকেরও নয়— রাস্তায় নেমে আসা পথিকের, ঘামেধুলোয় যাঁর আত্মার প্রসাধন, একই সঙ্গে যিনি জীবনের ভেতরে ও বাইরে বাস করেন, নিরাসক্ত ও গভীর আসক্ত এই কবি যিনি রকে বসতেও দ্বিধা করেন না, রকবাজদের শব্দভাণ্ডারকে যিনি রত্নখনি বলে দেখে ওঠেন, শব্দ খোঁড়েন, শব্দ খুঁড়ে খুঁড়ে যিনি আগুন থেকে তুষার, বিষাদ খুঁড়ে উল্লাস তুলে আনেন, অন্ধকারে মধ্যরাতের সূর্যকে উদিত করেন— ও কবিতা লিখে চলেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত— পরিণত বয়স পর্যন্ত— গৃহস্থগণ যাকে বার্ধক্য বলে, সেই পর্যন্ত। কেউ প্রকৃত কবি কি না এটিও এক পরীক্ষা— কোন্্ বয়স পর্যন্ত তিনি লিখে যাচ্ছেন, নিরন্তর, ভালো থেকে আরো ভালো, বলার কথাটি না-ফুরিয়ে, দেখার চোখটি না-নিভিয়ে।
জন্মশতবর্ষে কবি অরুণ মিত্রকে স্মরণ করছি, শ্রদ্ধা নিবেদন করছি, তাঁর কথা আমাদের ফুরোবে না। অগত্যা এখানেই শেষ করছি তাঁরই একটি কবিতা দিয়ে— কথামুখ— যেখানে তাঁকে আংটির পাথরের মতো পাওয়া যাবে।
‘কবিতার তো অশেষ কথা, একটা গলা কতই-বা/বলতে পারে? খণ্ড-সময়ের পাত্র উপচে এত/এত কথা উঠে আসে যা কিছুতে দুই ঠোঁটে/কুলোয় না অথচ পাঁজর ভাঙা চাপ চলে।/এবং কবিতা, কী বলব, জীবনের ভেতরে এমন/অচ্ছেদ্য জড়ানো কে আছে যে তাকে তুলবে/ফুলের মতন, তোড়া বেঁধে রেখে দেবে, গুণের হিসেব/দেবে সমঝদার কানে? তা তো মোটেই হবার নয়।/এ এক গহন যাত্রা, এ এক দামাল স্রোত,/এ এক শরীর পোড়ানো জ্বর কিম্বা সব শেষে/এ সেই মৃত্যুর শীতল যা আরো তাপ বুনে রাখে/অন্য রক্তে অন্য মাংসে, একটা জ্বলন্ত থেকে/হাজার আগুন উঠে যায়, রাত্তিরকে চিরে চিরে/অপরূপ মুখ দেখায়, তার দিকে কতবার যে/কবিতার বিহ্বল তাকানো আর তারপর/স্ফুট-অস্ফুটের ধ্বনি আমাদের কানে রাখা,/মাটিতে বাজানো। রোদ্দুরের ধমকে কখন/রহস্য লুকোয়, ক্ষিদে আর হাড়গোড়ের/সময় ঝংকার দিতে থাকে, লড়াই তুমুল বাজে/কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। রৌদ্ররাত্রি-ধ্বনিত যে-ঘর/সে তো কবিতার, আমাদেরই আজন্ম মায়াবী ঘর।
যে-অক্ষরগুলো হালকায় গম্ভীরে এতদিন/ছোট-বড় পৃষ্ঠায় রাখলাম তারা যা বলেছে...কী বলেছে?/তারা কি একটুও উষ্ণতা দিয়েছে? জীবনের/সামান্য নিঃশ্বাস যদি তারা এনে থাকে উচ্চারণে/কিম্বা মৃত্যুর ভেতর দিয়ে মৃত্যুহীনতার/অনুমান দিয়ে থাকে যেমন আমরা কবিতার কাছে/পাই, তবে জানব কিছু সার্থকতা পেয়ে গেল/এ গরীব হাত, এই ফাঁকা ভাঁড়ারের হাত।
সমস্ত শুভেচ্ছা আমি রাখি এই কয়েকটি অক্ষরে/তাদের উদ্দেশে যারা কণ্ঠে তুলে নেবে ভোরের রক্তিমে/কবিতার পালক-পাথর-কথামালা,/আমি থাকব চিরসখা অগোচর রাত্রিলগ্ন’
১লা নভেম্বর ২০০৯
(কলকাতায় প্রদত্ত কবি অরুণ মিত্র স্মারক বক্তৃতা) সৌজন্যে :আনোয়ারা সৈয়দ হক
