যাত্রা

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:১৩

প্লেন থেকে নামল রাহিমা। সেই কালো বোরকা। যেটা পরেই সে দুই বছর আগে উঠেছিল প্লেনে।

এমন-ই কালো বোরকা আশপাশে সবার। কারো মুখ জ্বলজ্বল খুশিতে। কেউ ক্লান্ত। বিধ্বস্ত। বোরকার আড়ালেই কয়েকজনকে বোঝা যাচ্ছে পেটে বাচ্চা। রাহিমা’র মন খারাপ হয়ে যায়। এই মাইয়াগুলার কী অইব? এগোর পরিবার কি এগোরে মাইনা লইব?

মনটা আষাঢ়ের মেঘের মতো হয়। টার্মিনাল পার হয়। ব্যাগ চেক হয়। কী আর ধরা পড়বে? জীবনডা নিয়া কোনোরকমে পালাইয়া আইছে। ব্যাগের মধ্যে থাকব কী?

কালো কালো বোরকা। এগিয়ে চলে গুটি পায়ে। দেশের মাটিতে পা। আকাশ-বাতাসে মায়ের গন্ধ। মা নেই অনেকের। কিন্তু সেই ভিটাটা তো আছে। তাই এইটা মায়ের দেশ। কারো কারো জন্য পরিবারের লোকজন অপেক্ষা করে। সবাই পরিচিত লোকজনের কাছে এগিয়ে যায়। রাহিমা’র কেউ আসে না। আসার কথা না। জানলেও কি আসত?

হাফিজ মিয়া তো টাকার কাঙাল। টাকার জন্যই বউরে পাঠিয়েছে বিদেশ। দুই ছেলে-মেয়ে। ছেলেটার আট বছর। তখনি স্কুলে যেত। একটা এনজিও-র স্কুল। বিনাবেতন। সেইসাথে দুপুরের খাবার দেয়। একজন মানুষের একবেলার খাবারের চিন্তা তো শেষ। এই ভাবনায় হাফিজ মিয়া ছেলেকে স্কুলে পাঠায়। আর ঢেঁড়স খেতে দাঁড়িয়ে ছেলের স্কুলে যাওয়া দেখত রাহিমা। কী সুন্দর করে সবার সাথে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যায় তার ছেলে। মায়ের মন স্বপ্ন দেখত। ছেলে একদিন বড় পাস দিব। মানুষের বাড়িতে কাজ করেই হোক কিংবা যেমন করেই হোক ছেলেকে সে পড়াবে। এমন ভাবনা ছিল রাহিমার। গরিব ঘর। গরিব মন। কিন্তু রাহিমা’র চোখে স্বপ্ন।

মেয়েটাকে তিন বছরের রেখে গেছে। কী সুন্দর করে কথা বলত। তোতাপাখির মতো। কলকল ছলছল করত। যাওয়ার সময় বুক ভেঙে কান্না এসেছিল মেয়েটার জন্যই। এই একটা মুখ মনে হলে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠত প্রতিদিন। কী সুন্দর পাখিটাকে রেখে গেছে। বুকে পাথর বেঁধে।  ছেলেটাকে পড়াবে। মেয়েকেও পড়াবে। একটা টিনের ঘর তুলবে। ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নগুলোকে জোরা দিতে জমি বিক্রি। সুদে টাকা ধার করে পাড়ি জমায় বিদেশ। আহা বিদেশ। স্বপ্নঘেরা চোখ। মনে মনে সুখ। কত কিছুই না ভেবেছিল। কত কিছুই না করার কথা ছিল। বিমানবন্দরের টার্মিনাল পার হয়। দলবেঁধে রেল স্টেশনে। গন্তব্য একেকজনের একেক দিক। একেক গাড়িতে চেপে। রাহিমার উঠতে হবে ময়মনসিংহের গাড়িতে। মাঝপথেই গফরগাঁও। রিকশা। তারপর নৌকা। আর কয়েক মাইল হাঁটাপথ। তারপরেই বাড়ি। নিজের সংসার।

একটু একটু করে গড়া। সব ফেলে রুপালি স্বপ্নে বিভোর হয়ে বিমানে উঠেছিল। হায়রে বিমান। হায়রে বিদেশ যাত্রা...

ক্ষুধায় পেট চোঁ-চোঁ করছে। বনরুটি আর কলা। আর বোতলভর্তি পানি। ঢকঢক গেলে সে। কতশত যাত্রী। পিলারের পাশে যে বসার জায়গা, সেখানে ভালো ভালো ভদ্দরলোক-মহিলারা বসে। ক্ষুধার পেটে খাবার পড়ে শরীরটা এখন অবশ। লোহার রেলিং ধরে সৌদি ফেরত আরো কয়েক নারী। যাদের সাথে এতক্ষণ এক বিমানেই ছিল। তাদের একজনের পাশ ঘেঁষে বসে। বড় একলা লাগে। কতক্ষণে বাড়ি যাবে। ছেলে-মেয়ে দুটোর মুখ দেখবে। আহা...। প্রাণটা জুড়াবে। নাড়িছেঁড়া দুই ধন।

‘খালায় চইলা আইলেন ক্যা?’—পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই এক নারীর জিজ্ঞাসা।

‘আমার আর বালা লাগতাছিল না। সারাদিন কাম করতে অয়। বাসি পান্তা খাওন। আর বাথরুমের লগে আছিল ঘুমের জায়গা। খালাগো... কী যে কষ্ট। দুইডা বছর দাঁতো দাঁত চাইপ্পা আছিলাম জমি বেচার ট্যাহা য্যান উডাইবার পারি। দেড় বছরের বেতন দিয়া ট্যাহা উডছে। জমি ছুডাইছি। কষ্ট-মুষ্ট কইরা ভাবছিলাম আরো বছরখানেক থাকলে টিনের ঘর তুলুনের ট্যাহাডা উডাইতে পারবাম। কিন্তু আমারে বাসা বদল কইরা দিলো। আগের বাসায় খুব কাম করতে অইত। দিন-রাইত। সতের জন মানুষের সব কাম আমারই করতে অইত। করতাম। শরীলরে শরীল মনে করতাম না। একটু জিরাইবারও পারতাম না। তাও দেশে একটু ট্যাহার সুহের লাইগ্যা টিইক্যা থাকতাম। কিন্তু বাড়ির মালিক আমারে বেইচ্চা দিলো। পরে যে বাড়িত দিলো আর কয়দিন থাকলে এরা আমারে মাইরালতো। সারাদিন কাম করাইতো। এক বেলা খাওন দিত। মাঝে মাঝে ধইরা মারতও। কও এই বয়সে কী এত কষ্ট সওন যায়?’ মুখ ঢাকা বোরকায়। কিন্তু টলটল পানি সেই চক্ষে। রাহিমা কাঁদতে থাকে। নিজের নিঃস্ব, বিধ্বস্ত অবস্থা। নিজের জন্য নিজেরই মায়া লাগে তার।

স্টেশন থেকে কেনা খিলিপান। আঙুলের ডগায় চুন বিনিময়।

‘কাইন্দ না গো খালা। দেশে দু্ইডা গরু-বরহি পালতাম। দুধ দিত। দুধ বেচতাম। কোরবানির সময় গরু ও বেচবার পারতাম। আর অ্যামনে হাঁস-মুরগি তো আছিলই হাতের। খারাপ তো আছিলাম না। লুভে ধরছে গো লুভে। কাঁচা ট্যাহার নেশায় আমার ছেড়া দুইডা আমারে পাডাইলো। বুড়া বয়সেও মায়েরে দিয়া কামাই করানি চাই। ছেড়াগো পাল্লায় পইড়া গেছিলাম। কইছে এক বাসার কাম। আর বাইচ্চা দেহা। কিন্তু আমার করতে অইছে তিন বাসার কাম। রাইত ১-২ ডার আগে কোনোদিন ঘুম নাই। কাম করতে করতে আমি দিশাহারা অইয়া যাইতাম। এই শইল্যে তো আর সয়না। তাই পলাইয়া আইছি।’ মুখ থেকে পানের পিক সজোরে ছুড়ে মারে মোর্শেদা। ছেলেমেয়ের কাঁচা টাকার স্বপ্নে বিদেশ গেছিল ।

‘ও মা ...তুমি কি দেখছ ওইহানে যে শেল্টার হোম আছে হেইনে কয়ডা মাইয়া পোয়াতি।’—ফিসফিস করে রাহিমার কানে বলে মোর্শেদা ।

‘হ খালা...এগো কপালে কী কষ্ট কও...। জামাইও ঘরে জায়গা দিব না অহন। বাপ-মায়েও তো দূরদূর করব।’ কথার সাথে সাথে রাহিমার দীর্ঘশ্বাস।

‘হেগো জায়গা দিব না জামাই-বাপমায়ে। আর আমরার অইছে পুতের বউ। এই যে এত্তডি ট্যাহা কর্জা কইরা পাডাইল। তুমার কি মনে অয় অহন আমারে বালা চক্ষে দেখব পুতের বউরা? ঠিকমতো খাওন দিব? বুকডা কামড় দিয়া উডে গো খালা। শেষমেশ না ভিক্ষা কইরা খাইতে অয়। বুড়া বয়সে এই আছিল কফালে।’—রাতের অল্প অন্ধকার চারপাশে। মোর্শেদা খালার মুখটাও এমন অল্প অন্ধকার। 

ছেলেমেয়ে দুইটার মুখ খুব মনে পড়তেছে রাহিমার। কতই না খুশি হবে ওরা মাকে দেখে। এতদিনে মনে হয় আরো বড় হইছে। স্কুলে বড় ক্লাশে উঠছে। ছয়মাস কোনো যোগাযোগ নাই। নতুন বাড়িতে কাজ নেওয়ার পরে আর যোগাযোগের উপায় ছিল না। তারা কোথাও যোগাযোগ করতে দিত না। চুরি করে কয়েকবার ফোন দিতে চাইছিল রাহিমা। ফোন লক করে রাখতো। এই ছয় মাসে তোতাপাখির গলাডা শোনা হয়নাই। ‘মা তুমি বালা কইরা থাইক্কো’—শেষ লাইনটা বলে ছেলেও ফোন রাখত না। আহারে কী জীবন। জেলখানার জীবন।

গাড়ি আসে। ময়মনসিংহের। মোর্শেদা খালার কাছে বিদায় নিয়ে রাতের ট্রেনে উঠে যায় রাহিমা। এতদিনের খালি খালি বুক। ছেলেমেয়ে দুইটারে বুকে নিলে শান্ত অইব দুনিয়া। আহা...। মায়া মায়া চারটা চোখ। দুই বছর তর সইছে। এখন কয়েক ঘণ্টার জন্য তর সইতেছে না। গাড়িটা এত আস্তে চলে কেন? রাতের ট্রেন। কু-ঝিক-ঝিক...। মাঝে মাঝে স্টেশন ছাড়া গাড়ি থামে। কেউ কেউ ভয় পায়। ডাকাত না আবার উঠে পড়ে ট্রেনে। অল্প অন্ধকারে সবুজ পাতাগুলো কালো দেখায়। সবুজ মাঠে গাড়ির কামরার আলো। ধানকাটা শেষে ধানের গুড়িসহ ধানখেত। আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। কেমন ঝিনঝিন করে ওঠে সবকিছু।

দু চোখ ভেঙে ঘুম আসে তার। নিজেই টের পায় না কখন ঘুমের কোলে মাথা পেতে দেয়। আবার চমকিয়ে উঠে পড়ে। ট্রেন না তাকে না নামিয়ে চলে যায়। হাতে ব্যাগ নাই তেমন। দুইটা গায়ে দেয়ার জামা নিয়েই কোনোরকম পালিয়েছিল সে। সেই ব্যাগটাই মাথার কাছে রেখেছে। ট্রেনের তালে তালে মাথা দোলে ওঠে। নিজেকে বড্ড নিঃস্ব লাগে। ছেলেমেয়ে দুইটা জানতো মা বিদেশ থেকে ফিরে আসার সময় তাদের জন্য সুন্দর সুন্দর জামা আনবে। ভালো ভালো খাবার আনবে। কত রাত সজাগ থেকেছে রাহিমা। সেই সজাগ থাকা রাতে খালি চোখে ভেসে উঠত বিদেশ থেকে বাড়ি ফিরছে সে। উঠানে পা দিতে দিতেই দুই ছেলেমেয়ে পাখির মতো উড়ে আসছে তার কাছে। আর তাদের জড়িয়ে ধরে বুকটা ঠাণ্ডা করছে রাহিমা। এই কল্পনায় কল্পনায় এতদিন কাটিয়ে এসেছে সে। আজ তার সেই বিশেষ দিন। কিন্তু কই সে সাজানো গোছানো বড়লোক রাহিমা? বরং নিঃস্ব, পরিশ্রান্ত এক তরুণী এখন সে। মাথাটা বাহিরে দেয়। জানালা দিয়ে। হিম হিম বাতাস মুখে ঝাপটা দেয়। কেমন একটা শান্তি লাগে। কতদিন পর। কতদিন পর এত সুন্দর গন্ধ। মাটির। বাতাসের। সেই বাতাসে আতকা আতকা পোলাপান দুইটার গায়ের গন্ধ আইসা লাগে নাকে। আরো আপন লাগে সবকিছু। সবকিছু। ট্রেনে পাশে যে বসে আছে ষাটোর্ধ্ব ভাঙা শরীরের বৃদ্ধ। ইচ্ছে হয় তার হাতটাও ছুঁয়ে দিতে। বাবা নেই। বাবা বে?ঁচে থাকলে এমনই হতেন মনে হয়। বলিরেখা পড়া কপাল। মুখ। অভাবের মুখাবয়ব।

আহা বাবা...। অভাব ছিল। শান্তিও ছিল। এক বেলা কোনোরকম পেট ভরে ভাত খেত। মরিচ ভর্তা দিয়ে। বাবা-মায়ের ছেলেমেয়ের সংখ্যা বেশি। সবাই প্রতিবেলা খেতে পারত না। দুই-একজনকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছিল মা। আর কিছু না হোক তিনবেলা তো খেতে পারবে।

ভাইগুলো গার্মেন্টেসে কাজ করে। একজন মেকানিকের কাজ করে। দুই-চারটা কাঁচা টাকা যখন হাতে আসে, চোখ চকচক করে। বাড়ির কথা ভুলে যায়। বিয়ে করে। নিজেদের সংসার গোছায়। মুরগি পালা, সবজি বিক্রির টাকা দিয়ে মা বিয়ে দেয় বোনদের। কোনোরকমে সংসার করে যাচ্ছে বোনগুলা। রাহিমাও করছিল। নাকে-মুখে। এখন তো আফসোসই লাগে। পাটশোলার ঘর। পান্তাভাত। কিন্তু কী শান্তি। ছেলেমেয়ে দুইটা। পাখির মতো কিচিরমিচির করত। কোলজুড়ে থাকত। রাহিমা কি বেশি লোভে পড়ে গিয়েছিল? লোভে পাপ-পাপে মৃত্যু। কিন্তু পাটশোলার ঘরটাকে একটা টিনের ঘর বানানো, প্রতিদিন যে ঢিলা প্যান্টটা টানতে টানতে ছেলেটা স্কুলে যায় সেই প্যান্টটা বদলানো। বাড়ির পেছনে যে ডাঁটা গাছ, কচুগাছ তার থেকেই প্রতিদিন পাতা তুলে তাই রান্না করত। সাথে মরিচ পোড়া। এই শাক দিয়ে মরিচপোড়া কয়দিন খাওয়া যায়? নিজেরা না হয় কোনোরকম খেয়ে নেয়া যায়। বাচ্চা দুইটা? রাহিমার কিচিরমিচির পাখি দুইটা? মেয়েটার চোখের দিকে তাকাতে পারত না রাহিমা। মুরগির ডিম যখন বেচত, মেয়েটা মাঝে মাঝেই বায়না করত, ‘মা, আমি ডিম খামু। একটা ডিম দেওনা।’ ছেলে স্কুল থেকে ফেরার আগেই মেয়েটাকে ডিম সেদ্ধ না হয় ভেজে দিত। ডিম খাওয়ার সময় মেয়ের মুখটা এখনো কলিজা জুড়িয়ে দেয় এই মায়ের। আহা...। কী প্রশান্তি। একটা ডিম  সেদ্ধ খাচ্ছে না বেহেশতের কোনো খাবার খাচ্ছে। মেয়েটার জন্যই মনটা মোচড় দিয়ে ওঠে তার। ছোট্ট ছোট্ট হাতে শেষদিন মাকে আদর করে দিয়েছিল। ‘তোমার লাইগ্যা মজা আনতে যাইতেছি’—হাসি হাসি মুখে রাহিমা মেয়েটাকে কোল থেকে নামায়। কিন্তু কলিজাটা মনে হয় কেউ বুক থেকে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে একটানে।

এই কলিজা ঠাণ্ডা হয় না দেড় বছর। দাঁতে দাঁত চেপে কাজ করে যায় দেড় বছর। ছয় মাস আগ পর্যন্ত যখন বাড়ির সাথে যোগাযোগ ছিল ঘরটা টিনের করা হয়েছে। বেড়া দিয়ে সুন্দর একটা রান্না ঘর বানানো হয়েছে। এখন আর মানুষের বাড়ির  চুলায় দৌড়াদৌড়ি করতে হয় না। শাশুড়ি আর জামাই হাফিজ মিয়া দুইজনে মিলেমিশেই রান্না-বান্না করে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে খায়। প্রহর গুণত রাহিমা। আর ক্যালেন্ডার দেখত। আর তো মাত্র একটা বছর। কিছু টাকা জমিয়ে দেশে এসে পড়বে। গরু-ছাগল পালবে। আর হাফিজ মিয়াকে একটা মুদির দোকান করে দিবে। এবার হাঁস-মুরগি পালার সময় ডিম আর বিক্রি করবে না রাহিমা। প্রতিদিন মেয়েটাকে দিবে। আর লুকিয়ে দিবে না মেয়েকে । দুই ভাইবোনকে একসাথেই ডিম সিদ্ধ করে দিবে। ওরা খাবে। রাহিমা দেখবে। আহা কী সুখ...। সুখের জীবন।

হলো না। দেড় বছরের কাজের পর মালিক বদল হলো। আগের বাসায় সতের জন মানুষের কাজের অমানুষিক প্ররিশ্রম ছিল। কিন্তু রাতে চারঘণ্টা ঘুমাতে পারত। কিন্তু মালিক বদল হবার পর মানুষ যে কেমন পিশাচ হতে পারে দেখল রাহিমা। দোজখ শুধু মরার পরে না। মরার আগেই সে দেখে ফেলেছে। সারাদিন গাধার মতো খাটতে হতো। রাতে বাথরুমের পাশের যে জায়গাটায় ঘুমানোর ব্যবস্থা ছিল, গন্ধে সেখানে দুই চোখ এক করা যেত না। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত চোখের পাতা যখন এক হতো তখন বাড়ির মালিক এসে ঝাঁপিয়ে পড়ত। এমনও রাত গেছে যখন বাড়ির মালিক তার ওপর পৈশাচিক নির্যাতন করে গেছে, ঠিক তার কিছুক্ষণ পর মালিকের ছেলে এসে তার ওপর চড়াও হয়। আহারে জীবন...। এই জীবনের জন্যই জমি বেচে, সুদে টাকা নিয়ে যাত্রা শুরু হয়। ছয় মাসের মাথায় এই বাড়ি থেকে কোনোরকম এক কাপড়ে পালায় সে। দূতাবাসের সেইফহোমে থাকতে হয় এক মাস। পালিয়ে আসার সময় ফোন রেখে আসতে বাধ্য হয়েছিল। তাই বাড়ি ফেরার এই খবরটা দেয়া হয়নি কাউকে।

এক দিক দিয়ে ভালোই হলো। ভোরে বাড়ি ফিরে সবাইকে চমকে দিতে পারবে। ছেলেমেয়ে দুটো ঘুমভাঙা চোখে স্বপ্ন দেখছে ভাববে। আর রাহিমা তাদের চিমটি দিয়ে বলবে—‘ওরে কইলজারা... তোমরা স্বপ্ন দেখতাছো না। তোমগো  মা হাছা হাছা চইলা আইছে।’

মনে মনে কত জল্পনা-কল্পনা। ট্রেনের গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলে। আজানের সাথে সাথে হুইসেল দিয়ে গাড়ি থামে স্টেশনে। স্টেশনে নামার পরই পেটে ক্ষুধা জানান দেয়। স্টেশনের পাশে টিউবওয়েল থেকে পেট ভরে পানি খায় সে। আর তো মাত্র কিছুক্ষণ। বাড়িতে গিয়েই পেট ভরে খাবে। বোরকার কোঁচড়ে থাকা একটুকরো পান মুখে দেয়। পান ক্ষুধা নিবৃত্ত করে তার।

আর তো ঘণ্টাখানেক। কোনোরকম দিনের আলো ফুটলেই বাড়ির দিকে হাঁটা ধরবে।

দিনের আলো ফোটে। পা চালাতে চালাতে ভাবে, যা-ই হোক, হাফিজ মিয়া যেন মন খারাপ না করে। আগের মতোই না হয় এক বেলা খাবে। বাড়ির পেছনে কচু-ডাটায় চলবে জীবন। এনজিও-র স্কুলেই পড়বে ছেলেমেয়ে দুটো।  তাতেই শান্তি। কেমন সবুজ সবুজ এক ভাবনায় বাড়ির উঠান পার হয় সে।

‘মারুফ, ও মারুফ... বাবা ঘুম থাইক্কা উঠো। মা আইছি...। আমার ইতি আম্মায় কই?’ দরজায় কড়া নাড়ে রাহিমা। নাড়তেই থাকে বেশ কিছুক্ষণ।

ঘুমঘুম চোখে দরজা খোলে হাফিজ মিয়া। টিনের ঘরের দরজা। রাহিমার পাঠানো টাকার টিনের ঘর। আচমকা রাহিমারে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে হাফিজ।

‘তুই? তুই আইলি কইত্থিকা? ’ খুশি হবে কোথায়? বিরক্ত আর ক্রোধান্বিত কণ্ঠ হাফিজ মিয়ার।

‘ওমা কী হইছে তোমার? এমন করো ক্যা? আমার পোলামাইয়া দুইডা কই? আগে দেখিত ওগোরে।’ ঘরে ঢুকতে যায় রাহিমা।

‘খবরদার খানকি মাগি, আমার ঘরে ঢুকবি না। বেহায়া কোনহানকার...’ একনাগাড়ে চেঁচাতে থাকে হাফিজ মিয়া। সবাই জেগে ওঠে ততক্ষণে। ঘরের দোরগোড়ায় পৌঁছায় হাফিজ মিয়ার নতুন বউ। বাড়ির মালিক বদলায়ে সৌদি আরবে এক বাড়িতে রক্ষিতা হয়ে থাকে রাহিমা। এই খবর কানে আসে হাফিজ মিয়ার। কোনো যোগাযোগ না থাকায় দালালরা কাল্পনিক গল্প বানায়। রাগে-ঘেন্নায় আবার নতুন সংসার পাতে সে।

নতুন বউয়ের উঁকি দেয়া মুখ। ঘরের ওই কোনায় মায়াবী চারটি হতবিহ্বল-আতঙ্কিত চোখ। এই ঘরে ঢুকতে পারবে না রাহিমা। এই সন্তানদের ছুঁয়ে দেখতে পারবে না। মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে ওঠে তার। কিচ্ছু আর মনে থাকে না।

‘পানি আনো... পানি আনো...’ আশপাশের বাড়ির বউ-ঝিরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে জ্ঞান ফিরাতে।

অলঙ্করণ :সোহেল আশরাফ