বাজেটে দারিদ্র্য দূরীকরণের দর্শন

আপডেট : ২৭ জুন ২০২০, ২১:৫১

এ এইচ এম নোমান

দারিদ্র্য দূরীকরণে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় ১০০ উপজেলায় সকল প্রবীণ, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী, মাতৃত্বকালীন ভাতাসহ এক-চতুর্থাংশ পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে। স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়নে টেকসই এবং গতিশীল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ দর্শনের পল্লি সড়ক উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। তবে দুর্নীতির যে উত্সব চলবে তা নিরসনের জন্য গণতান্ত্রিক ও ক্রস চেকিংয়ের মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনয়নের বিকল্প নাই। নৌ, আকাশ, সড়ক, রেল যোগাযোগ অবকাঠামো নেটওয়ার্ক তৈরি চমত্কার সৃজনশীল দৃষ্টান্তকারী যা ‘পদ্মাসেতু নিজের টাকায় করব’ অনন্য দূরদর্শী দর্শনের পরিপূরক। পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি সামষ্টিক পথ পরিক্রমা বিনির্মাণের অতি বাস্তবমুখী চলমান মাতৃত্বকালীন ভাতা কেন্দ্রিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান, সঞ্চয় পরিবেশ সম্মিলনে স্বয়ংক্রিয় আর্থসামাজিক উন্নয়নে অর্থনৈতিক মুক্তির রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ চাই। উন্নয়নে গরিব মা কেন্দ্রিক অল্লাহ প্রদত্ত মার মর্যাদা অধিকারকে এগিয়ে নিতে হবে। বাজেটে মাতৃত্বকালীন ভাতা মাসে ৮০০ টাকা চলমান থাকবে ঘোষণা করেছেন, ধন্যবাদ। তবে এ ভাতা পোশাক শ্রমিক সমমানে মাসে ৮ হাজার টাকা করার দাবি করছি। একই সঙ্গে তিন বছর মেয়াদের স্থলে শিশুর স্কুল ভর্তি হওয়া পর্যন্ত পাঁচ বছর করা হোক। স্বল্প-মধ্যমেয়াদি বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি দীর্ঘ ২০ বছর এক প্রজন্ম মেয়াদি অধিকারভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ চাই। এক মা ১ লক্ষ টাকা বাজেট রেখে ১ কোটি গরিব মাকে টার্গেট করে দারিদ্র্য বিমোচনের ভিত রচনা করাই হবে জনবান্ধব বাজেট দর্শন যা এসডিজির অ্যান্ডিং পোভার্টির বাস্তবায়ন ভিত। বাজেট বরাদ্দের আরেকটি সৌন্দর্য যে, ১০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজনীয় খাতে বরাদ্দ রেখেছেন, তা থেকে ১০০ উপজেলায় ১ হাজার কোটি টাকা ‘মাতৃত্বকালীন ভাতাকেন্দ্রিক স্বপ্ন প্যাকেজে’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে বরাদ্দ প্রদানের দাবি জানাচ্ছি।

বাজেটের ৫ম অধ্যায়ের সংস্কার ও সুশাসন ১৩৬ অনুচ্ছেদে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কার্যক্রম আওতায় বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব আইন ২০১৫ সংশোধনের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। কি সংশোধন-উদ্যোগ আমাদের জানা নাই। তবে এই অংশীদারিত্বে শুধু ‘আমরা আর মামুরা’র অর্থবিত্ত ক্ষমতার শ্রেণিবিশেষের অংশীদারিত্বই বাড়বে। ধনী গরিবের বৈষম্য নিরসনের বিপরীতে মালিক-বণিক প্রতীকী রাজা-প্রজা মহাজন সৃষ্টির এক ধুরন্ধর কূট কল কাঠামো। বিপরীতে গণবান্ধব দর্শনে পাবলিক পুয়র প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপিপি) কাঠামো বিনির্মাণ চাই। যা মাতৃত্বকালীন ভাতা কেন্দ্রিক স্বপ্ন প্যাকেজ মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করেছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু-রেল সংযোগ, পায়রা বন্দর, দোহাজারী-কক্সবাজার রেল লাইন এ ধরনের মেগা প্রকল্পও পিপিপিপি বাস্তবায়ন করে দেশের সম্পদে ক্ষতিগ্রস্ত গণমানুষের মালিকানা বিধিবদ্ধ করাই হবে বৈষম্য থামানোর মৌলিক আইন সংস্কার। ১৪২ অনুচ্ছেদে মন্ত্রীর ভাষায় ‘দুর্নীতি দমনের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা’র নীতি থাকলেও বাস্তবে ‘কমিশনের ঘাড়ে বসে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ দেওয়ার একটা সুপার কাঠামো দাঁড়াবে। সিন্ডিকেটিং ভোগবাদীরা ‘সর্প হয়ে দংশন কর, ওঝা হয়ে ঝাড়ো’ কুলকিনারাবিহীন সাগরের অথৈ পানিতে হাবুডুবু খাবে। কমিশনের নাম বিকিয়ে দেশপ্রেমহীন আমলা নির্ভর প্রশাসন, ব্যাবসায়িক-রাজনীতিক মহল সবাই পগাড় পাড় হবে। তাই গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে জবাবদিহিতামূলক সরকারের স্বয়ংক্রিয় কাঠামোই হলো—দুর্নীতি দমনের মূলমন্ত্র। কমিশন হবে সকল যন্ত্রমন্ত্র কলকাঠি সঠিকভাবে চলার জন্য মনিটরিং, দৃষ্টান্তমূলক দুর্নীতি দমন ও শাস্তি প্রদানের সহায়ক রেফারি ও মূলচাবি-শক্তি। একই সঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও ঠুটো জগন্নাথের ভূমিকায় মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের শিখণ্ডি হয়ে পুতুল ভূমিকায় বসে থাকে। এমনকি কোনো কোনো সময় ‘মা’ তথা মানবাধিকার বিরোধীমনা অবসরপ্রাপ্ত আমলারা এর প্রধান হয়ে বেতনভাতা সুবিধাদি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নির্দ্বিধায় ভোগ করেন। জবাবদিহিতার কোনো বালাই নাই। করোনার মতো আজাব বালা মুসিবত যদি না আসে।

আর্থিক খাতে সংস্কার (১৪৪) ব্যাংকিং ইনক্লুশন স্ট্রাটেজির নামে গ্রামের বঞ্চিত মানুষের টাকা ধনীক বণিক শহুরেদের কাছে চলে আসছে। এর চালাকিতে বাস্তবে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা এক্সক্লুডেড হয়ে ঘুরে ফিরে শহুরে অসত্ অনাচার পাচারকারীদের কাছে চলে আসছে। তাই গ্রামকে শহর করার পরিপন্থি অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশলে স্থানীয় সরকার তথা জেলা উপজেলা ইউনিয়নকে ‘সেবক’ আওতায় এনে পরিবর্তন চাই। করোনা দুর্যোগ আজ গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে বেশি আবির্ভূত। এর থেকে উপলব্ধির শিক্ষা নিতে হবে। ১৫৭ অনুচ্ছেদ, জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সাম্য ও ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠায় আয়কর সম্প্রসারণ ও শুল্ক আয় থেকে কল্যাণমূলক ব্যয় অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করেছেন এফসিএ অর্থমন্ত্রী।

মানুষ কর প্রদানে উত্সাহী ও গর্বিত (১৬৩) হতে চায় কিন্তু এ যেন করোনা যমকে ভয় করার চেয়েও কর কর্মকর্তাদেরকে বেশি ভয় পাওয়া—আতঙ্ক। কর আদায়ের মেশিন ঠিক হলে সম্পদ কতিপয় ভাগ্যবান ব্যক্তিদের মাঝে আবদ্ধ থাকবে না। কেননা, কেরোসিন তেলের মেশিনে সরিষার তেল বের হয় না। কৃষক চাষিদের উত্পাদন ব্যয়ের তুলনায় ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে বাজেট প্রণয়ন চেষ্টায় কৃপণতা নাই। মাছ-মুরগি-গবাদিপশু (মামুগ)র গুরুত্ব স্থান পেয়েছে যা ধন্যবাদ যোগ্য। স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থা দুর্নীতির বিশাল যজ্ঞ ডাক্তার হাসপাতাল ওষুধ কোম্পানি-ত্রয়ীদের সিন্ডিকেট সংস্কার- ভাঙার পথ খুঁজতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ব্যাবসায়িক গোঁ করোনার আঘাতকেও হার মানিয়েছে। এসকল প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ বা পিপিপিপি আওতায় আনা যায় কি না সরকার নীতি নির্ধারক বিশেষজ্ঞরা এর উত্তর ঠিক করবেন। কৃষি ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান ধন্যবাদ যোগ্য সর্বগৃহীত পদক্ষেপ। ব্যাংক, পিকেএসএফ থেকে এর লেজুড় ধরতে এনজিওসহ সংশ্লিষ্টরা নিয়ম নীতিমালার প্যাঁচে এখনো ধোঁয়াশায় ও উত্কণ্ঠিত। আমি ১৯৭০-এর ভয়াল জলোচ্ছ্বাসের ‘ধ্বংস থেকে সৃষ্টি’র সৃজনশীলতা ও মুক্তিযুদ্ধকালে সমবায় উত্পাদন যোদ্ধার প্রেরণায় কাজ শুরু করে অদ্যাবধি রত আছি। করোনা ভাইরাস ভয়াবহতার ধ্বংস থেকেও আলাহর ওপর ভরসা রেখে সৃষ্টিশীলতার শিক্ষায় এগিয়ে যেতে চাই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্মুক্ত চিন্তাভাবনা প্রসূত প্রান্তিক জন বাজেট দর্শন দেখতে চাই। ব্রিটিশ পাকিস্তান সৃষ্ট শোষণ-তোষণ ও শাসনের ঔপনিবেশিক খাপে ফেলা বাজেট চাই না। বরং বঙ্গবন্ধুর শোষণহীন সমাজব্যবস্থার মুক্ত বাংলা গড়ার বাজেট দর্শন হোক দারিদ্র্য দূরীকরণের হাতিয়ার।

n লেখক :প্রতিষ্ঠাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা ও স্বপ্ন প্যাকেজ প্রবর্তনকারী সংগঠন- ডর্প