প্রস্তাবিত বাজেট ২০২০-২০২১

কতটা ব্যবসাবান্ধব

আপডেট : ২৭ জুন ২০২০, ২২:০৯

প্রস্তাবিত ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে আয়কর ও ভ্যাটের বেশ কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, করপোরেট করে ছাড়সহ বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকলেও বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণে হঠাত্ কিছু নীতি পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে বাজেটে। ফলে আয়কর ও ভ্যাটের বেশকিছু বিষয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তারা। রপ্তানি শিল্পে উেস কর বৃদ্ধি, বিরোধ নিষ্পত্তিতে আপিলের জরিমানা বাড়ানো, রাজস্ব কর্মকর্তাদের অধিক ক্ষমতা দেওয়া ছাড়াও করোনা পরিস্থিতিতে নীতির পরিবর্তন কতটা ব্যবসা-বান্ধব হবে সেটি নিয়ে উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদগণ। চলমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে নতুন শংকা ভর করেছে উদ্যোক্তাদের ওপর। কীভাবে মন্দাকালীন অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হবে, কীভাবে কর্মসংস্থান ধরে রাখতে হবে, এখন সেই বিষয়টি বড় করে দেখছেন তারা। প্রস্তাবিত বাজেট চলমান পরিস্থিতিতে কতটা ব্যবসা-বান্ধব হলো সে বিষয়ে উদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে দৈনিক ইত্তেফাক ও সচেতন ব্যবসায়ী সমাজের যৌথ উদ্যোগে এই আয়োজন।

ব্যবসায়ীদের হয়রানি বাড়বে

বিনিয়োগ নিরুত্সাহিত হবে

—সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এমপি

সাবেক সভাপতি, এফবিসিসিআই

 

প্রস্তাবিত বাজেটে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ব্যবসাবান্ধব। কিন্তু আয়কর ও ভ্যাটের বিষয়ে কিছু প্রস্তাবে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বাড়বে। এমনিতেই করোনা পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ে ছন্দপতন দেখা দিয়েছে। বলতে গেলে ব্যবসা স্থবির হয়ে  আছে। এ পরিস্থিতিতে উেস কর, আগাম কর, ভ্যাটের আপিল করতে গেলে প্রায় দ্বিগুণ অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা এবং সহকারী কমিশনারের নিচের কর্মকর্তাদেরও ঢালাও ক্ষমতা দিয়ে দেওয়ায় মানুষ বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়ে নিরুত্সাহিত হবে।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী কেউ রাজস্ব কিংবা ভ্যাট ইস্যুতে কোনো বিরোধে আপিলে যেতে হলে তাকে তর্কিত অর্থের প্রায় অর্ধেক আগে জমা দিতে হবে। আগেই এত টাকা বন্দি হয়ে গেলে মানুষ আপিলে যেতে চাইবে না। কর্মকর্তাদের এত বেশি ক্ষমতা দেওয়ায় ব্যবসায়ীদের হয়রানি বাড়বে। ব্যবসায়ীদের আস্থা নষ্ট হবে। ব্যবসায়ে গতি না বেড়ে বরং কমতির দিকে যাবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দরকার আওতা এবং সক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু তা না হয়ে নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা হয়ে গেলে তা ব্যবসায়ের পরিবেশ নষ্ট করবে। প্রথম সচিব আর দ্বিতীয় সচিবরা যদি এনবিআর চালায়, তাহলে এরকমই হবে।

 

হঠাত্ হঠাত্ নীতি পরিবর্তন

ব্যবসার জন্য খারাপ

—আব্দুস সালাম মুর্শেদী এমপি

প্রেসিডেন্ট, এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ

 

করোনার এই সময়ে ব্যবসা বাণিজ্যের চাকা যখন স্থবির তখন ব্যবসায়ীরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা প্যাকেজের ঘোষণায় তারা মানসিকভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠে। তবে প্যাকেজ বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে ব্যবসায়ীরা শুধু মনোক্ষুণ্নই নন। তারা রীতিমত হতাশ হয়েছে। পরিবর্তীত প্রেক্ষাপটে বিশ্ব বাজার সঙ্কুচিত হবে। কিছু পণ্যের চাহিদা বাড়লেও আমাদেরকে তীব্র প্রতিযোগিতায় পড়তে হবে। এখন বিশ্ব অর্থনীতিই বিধ্বস্ত অবস্থায় আছে। বিশ্ববাজারে আমাদের অবস্থান ধরে রাখতে হলে বা কোভিড-১৯ পরবর্তী অবস্থা সামাল দিতে প্রস্তুতি নিতে হবে। বেসরকারি ও সরকারি পর্যায় থেকে সেটা না করলে হবে না। সরকার বিভিন্ন সময়ে নানান পলিসি সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে। তবে ব্যবসার ক্ষেত্রে হঠাত্ হঠাত্ করে নীতি পরিবর্তন করলে তাতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এটা করা মানে উদ্যোক্তাদের কষ্ট দেওয়া। উদ্যোক্তাদের হয়রানি করা। এ ধরনের সিদ্ধান্ত অবশ্যই প্রত্যাহার করা দরকার। মূসক নিয়ে বিরোধে মামলা করতে গেলে ১০ শতাংশের বদলে ২০ শতাংশ টাকা জমা দেওয়ার যে বিধান করা হয়েছে তা সঠিক হয়নি। এতে জেনুইন ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। নতুন উদ্যোক্তারা নিরুত্সাহীত হবে।

এখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাটাই চ্যালেঞ্জ। অবশ্য এখন যে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে সেটাকে সবার আগে টিকিয়ে রাখতে হবে। বিদেশ থেকে আমাদের যে আয় আসতো তা সামনে আরো কমে যাবে। কারণ, প্রবাসী শ্রমিকরা দেশে ফিরে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে সবদিক বিবেচনা করে সরকারকে সামনে এগুতে হবে। বেসরকারি খাত তথা ব্যবসায়ীদের স্বার্থ দেখলেই তা দেশের পক্ষে যাবে। কারণ উদ্যোক্তারাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে থাকেন। এ সময়ে এমন কোনো কাজ করা যাবে না যেটা ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর। করোনার কঠিন সময়ে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করার জন্য এগ্রিকালচার, রেমিট্যান্স, রপ্তানিমুখি শিল্পকে রক্ষা করতে হবে। কারণ এসব খাতের মাধ্যমেই কর্মসংস্থান হয়। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। এমন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হবে যাতে সবার উপকার হয়। অর্জন করা যাবে না এমন টার্গেট না নেওয়াই ভালো। হাঁস মেরে ফেলে ডিম নেওয়া যাবে না। হাঁসকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বাজেটে করজাল বাড়ানোর কথা বলা হলেও তা কঠিন হবে। কারণ এখন ছোট মাঝারি সবাই বিপদে আছে। এ সময়ে এনবিআরকে সহনীয়ভাবে কাজ করতে হবে। তারা যদি যুদ্ধংদেহি মনোভাব পোষণ করে তাহলে শিল্প ও অর্থনীতির জন্য তা বাজে পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে।

 

এ ধরনের ব্যবস্থা বিদেশি বিনিয়োগের

জন্য সহায়ক নয়

—সিদ্দিকুর রহমান

সহসভাপতি, এফবিসিসিআই

 

প্রস্তাবিত বাজেটে ভ্যাট ও আয়কর বিষয়ে কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তাতে ভ্যাট-ট্যাক্স আয় বাড়াবে না, কিন্তু ব্যবসায়ীদের হয়রানি বাড়বে। ব্যবসা তো শুধু বাংলাদেশে হয় না, অন্যান্য দেশেও হয়। আমরা বিদেশি বিনিয়োগ চাই। কিন্তু তাদেরকে তো ব্যবসায়ের সুযোগ দিতে হবে। এজন্য কর কাঠামো সহজ করা এবং জটিলতা কমানো দরকার। কিন্তু এভাবে জটিলতা বাড়লে তো বিদেশি বিনিয়োগ আসতে চাইবে না। আমাদের প্রতিযোগী অন্যান্য দেশে বিনিয়োগ কেন বাড়ছে, তা যাচাই করা দরকার। ২০ শতাংশ টাকা অগ্রিম দিয়ে কেউ ভ্যাটের বিষয়ে আপিল করতে চাইবে না। রাজস্ব কর্মকর্তা, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের হাতে ঢালাও ক্ষমতা দেওয়ার ফলে ব্যবসায়ীদের হয়রানি বাড়বে। অন্যদিকে আওতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। আমরা এফবিসিসিআই থেকে বলেছি, যেখানে প্রয়োজন—সারা দেশের সব ব্যবসায়ীদের সংগঠন ও চেম্বার সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। হয়রানির পথ উন্মুক্ত না করে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সহযোগিতা নেওয়া উচিত। এতে রাজস্ব আদায় আরো বাড়বে।

এনবিআর চাইলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যে কোনো ফাইল ওপেন করতে পারে। কিংবা এত দিন যেভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিয়ম মেনে অভিযান করেছে, তাও করতে পারে। কিন্তু অফিসে, ব্যবসায়ে হানা দেওয়ার ঢালাও সুযোগ দেওয়া ঠিক নয়। আমদানিকৃত কাঁচামাল চার মাসের মধ্যে ব্যবহার না করলে ভ্যাট রেয়াত পাওয়ার সুযোগ প্রত্যাহারের মতো প্রস্তাব অযৌক্তিক। আমাদের কিছু কাঁচামাল, কেমিক্যাল সব সময়ই প্রস্তুত রাখতে হয়। এগুলো তো নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্যে আমদানি হয়। চাইলে নিয়ম মেনে এনবিআর পরীক্ষা করে দেখতে পারে, আমদানিকৃত এসব পণ্যের পরিস্থিতি না দেখাতে পারলে জরিমানা করুক। এসব পণ্য ব্যবহারের জন্য এক থেকে দেড় বছরের সময় দেওয়া উচিত। চার মাসের মধ্যে ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা দেওয়া ঠিক নয়।

 

প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই আমাদের দাবিগুলো

বিবেচনা করবেন

—এ কে এম সেলিম ওসমান, এমপি

প্রেসিডেন্ট,  বিকেএমইএ

 

এবারের বাজেট পাশ হলে ভ্যাট আদায়ের জন্য যে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভ্যাট বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা অনুমতি ছাড়া হানা দিতে পারবেন। এত দিন সহকারী কমিশনার পর্যন্ত এই ক্ষমতা ছিল বটে, কিন্তু এখন তারা চাইলেই ঐসব প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র যাচাই করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিশনারের আগাম অনুমোদন লাগবে না। এতে আমি মনে করি, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের অযৌক্তিক দাবির সুযোগ বাড়বে। কোনো কিছু যদি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থেকে করা না হয়, তা হলে সে যেই হোক না কেন, তার অপরাধ করার প্রবণতা বেড়ে যায়। বাজেটে যদি এটি পাশ হয়, তাহলে আমরা ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হব, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাদের দুর্নীতি এবং দুর্বলতা দুটোই বেড়ে যাবে এবং তারা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে।       

এবারের বাজেটে আরেকটি বিষয় যেমন আপিলাত ট্রাইব্যুনাল ও আপিল কমিশনারেটে আপিল দায়েরের ক্ষেত্রে দাবিকৃত ভ্যাটের ১০ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ অর্থ পরিশোধের বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। এখানেও ব্যবসায়ীদের হয়রানির শিকার হওয়ার শতভাগ আশঙ্কা আছে। আমি মনে করি, দাবিকৃত ভ্যাটের পরিমাণ ৫ শতাংশ করা উচিত। যেন একজন ব্যবসায়ী সাহস পান। দুর্নীতি যেন দমন হয়। 

আমরা ফ্যাক্টরির মেশিনারিজ ও ডাইস-কেমিক্যাল আমদানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের ছাড়পত্রে মাধ্যমে এত দিন আমদানি করতাম। কিন্তু এবারের বাজেটে তা বাতিল করে ভ্যাট অফিসের ছাড়পত্র নেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। আমি মনে করি, এটি ইজ অব ডুইং বিজনেস বা ব্যবসা সহজীকরণের পরিপন্থি। আমি বলি, বাজেটে অনেক কিছুই থাকে। তবে পরবর্তী সময়ে আমরা অনেক কিছু থেকে নিস্তার পাই। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ব্যবসাবান্ধব।  আমরা সবসময় তার কাছে সহযোগিতা পেয়ে আসছি। তিনি নিশ্চয়ই আমাদের দাবিগুলো বিবেচনা করবেন।

 

বাজেটে সরকারের চেতনা পরিপন্থি কিছু নীতিমালা ঢুকে পড়েছে

—মোহাম্মদ হাতেম

প্রথম সহসভাপতি-বিকেএমইএ এবং সিনিয়র সহসভাপতি-ইএবি

 

আমরা বরাবরই দেখে আসছি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিনিয়োগ বা শিল্পায়নকে উত্সাহিত করা এবং ইজ অব ডুইং বিজনেস বা ব্যবসা সহজীকরণের কথা প্রতিনিয়ত বলে থাকেন এবং সে আলোকেই নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদও দিয়ে থাকেন। কিন্তু এবারের বাজেটে সরকারের সে চেতনা পরিপন্থি কিছু নীতিমালা ঢুকে পড়েছে যা নিয়ে ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাগণ রীতিমতো হতাশ এবং তাদের বিনিয়োগ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।  শত বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মহামারির এ সংকটকালে যেখানে ব্যবসায়ীরা টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত এবং যেখানে                     সরকারের পলিসিগত সাপোর্ট প্রত্যাশিত সেখানে উলটো এ ধরনের সাংঘর্ষিক নীতির কারণে নতুন উদ্যোক্তা তো আসবেই না বরং                         বিদ্যান উদ্যোক্তাগণই তাদের ব্যবসায় টিকে থাকা নিয়ে উদ্বিগ্ন।                আমি এমন দুইটি বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই—(১) মেশিনারিজ ও ডাইস-কেমিক্যালস আমদানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিবর্তে ভ্যাট অফিসের ছাড়পত্র নেওয়ার বিধান এবং (২) কোনো ডিমান্ড জারি হলে আপিল করতে গেলে ১০% এর স্থলে ২০% জমা দেওয়ার বিধান।

মেশিনারিজ ও ডাইস-কেমিক্যালস আমদানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিবর্তে ভ্যাট অফিসের ছাড়পত্র নেওয়ার বিধান: বিগত দিনগুলোতে এসআরও-১২৮ আইন/২০১৭ এর অধীনে স্ব স্ব অ্যাসোসিয়েশনের ছাড়পত্রের মাধ্যমেই আমদানিকৃত মেশিনারিজ ছাড় করার বিধান থাকলেও তা বাতিল করে এসআরও ১২১-আইন/২০২০ দ্বারা সংশ্লিষ্ট ভ্যাট অফিসের ছাড়পত্র নেওয়ার বিধান ১১ জুন ২০২০ থেকে কার্যকরের কথা বলা হয়েছে। সেখানে আমদানিকারী প্রতিষ্ঠানের মাসিক রিটার্ন দাখিলসহ যাবতীয় করণীয়সমূহ পরিপালন সন্তুষ্টি সাপেক্ষে ভ্যাট অফিসের ছাড়পত্র দেওয়ার বিধান জারি করা হয়েছে যা ব্যবসা সহজীকরণের পরিবর্তে আরো কঠিন থেকে কঠিনতর করা হলো বলেই আমরা মনে করছি। শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহ ভ্যাট-এর আওতামুক্ত থাকার বিধান থাকলেও প্রতি মাসে শূন্য হারে কেন রিটার্ন দাখিল করতে হবে তার যুক্তিসংগত কোনো কারণ আজও আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। তাছাড়া আয়কর বিভাগে দাখিল করা বিগত বছরগুলোর ব্যালেন্সশিট নিয়ে সেখান থেকে বিভিন্ন রপ্তানি উপকরণ ক্রয়ের ওপর ভ্যাট-এর ডিমান্ড জারি করা (যদিও সেটা বিক্রেতারই দেওয়ার বিধান),     রাস্তাঘাটে বিভিন্ন জায়গায় রপ্তানি পণ্য তৈরিতে ব্যবহূত উপকরণ               আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে গাড়ি আটকিয়ে হয়রানি ইত্যাদি তো চলমান রয়েছেই। নতুন করে হয়রানির আরো একটি ঘাট যোগ হলো বলে  আমরা উদ্বিগ্ন। প্রতি বছর যতই আমরা ভ্যাট থেকে মুক্তি চাই না কেন, কোনো না কোনোভাবে আরো বেশি করে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহকে জড়াবার কৌশল নেওয়া হচ্ছে, যার যৌক্তিকতা আমাদের জানা নেই। এ থেকে ব্যবসায়ীদের মুক্তি দেওয়া হউক, অন্যথায় বাধাগ্রস্ত হবে চলমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহের সম্প্রসারণ এবং থমকে যাবে নতুন বিনিয়োগ।

কোনো ডিমান্ড জারি হলে আপিল করতে গেলে ১০% এর স্থলে ২০% জমা দেওয়ার বিধান: সাধারণত আমাদের বিগত দিনগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা এ ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হন বেশি এবং অধিকাংশ কেইসেই ট্রাইব্যুনাল বা হাইকোর্টে গিয়ে ডিমান্ডগুলো বাতিল হয়ে যায়। ততক্ষণে বছরের পর বছর হয়রানি হয়ে সারা। এবারের বাজেটে যে প্রস্তাবটি করা হয়েছে তা হলো—“অযৌক্তিক মূসক মামলা দায়েরের প্রবণতা হ্রাসের লক্ষ্যে আপিলাত ট্রাইব্যুনাল ও আপিল কমিশনারেট আপিল দায়েরের ক্ষেত্রে তর্কিত আদেশে উল্লিখিত দাবিকৃত করের ১০% এ পরিবর্তে ২০% পরিমাণ অর্থ পরিশোধের প্রস্তাব করা হলো”।

বিষয়টি সম্পূর্ণভাবেই জনগণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি। কারণ অযৌক্তিক মূসক মামলা দায়েরের প্রবণতা হ্রাসের লক্ষ্য বলা হলেও আমরা ভুক্তভোগী শ্রেণির মানুষ বলব অযৌক্তিক বা অন্যায়ভাবে ডিমান্ড জারির কারণেই আমাদেরকে আপিল বা মামলায় যেতে হয়, এটা জনগণের মৌলিক অধিকার। ন্যায্য বিচার চাওয়া এবং পাওয়ার ক্ষেত্রে এটা একটা বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা বলেই আমরা মনে করছি এবং বাড়িয়ে দিবে কষ্ট অব ডুইং বিজনেস। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেন এবং কীভাবে ডিমান্ড জারি হয় তা সবাই জানেন। এটা রহিত করা একান্তই প্রয়োজন।

 

ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়ানোর সঠিক

সময় এটা নয়

—দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

সম্মানীয় ফেলো, সিপিডি

 

ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের টার্নওভার করের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি। অথচ করোনা পরিস্থিতিতে তারাই সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে আছে। যারা করের আওতায় আছে, পুরো চাপ তাদের ওপর দেওয়া হয়েছে, সম্প্রসারণের কাজ দেখলাম না। এছাড়া ব্যবসায়প্রতিষ্ঠানে তদন্ত করার জন্য নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের অধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীয়দের ওপর চাপ বাড়বে। অন্যদিকে ‘ব্যক্তিগত উন্নয়ন’ হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। আপিলের জরিমানা বাড়ানো হলো। এগুলো বাড়ানোর জন্য এটি সঠিক সময় নয়। একই সঙ্গে যে পদ্ধতি নেওয়া হচ্ছে, তাও সঠিক নয়। প্রয়োজন করদাতার সঙ্গে কর কর্মকর্তার সম্পর্ক ন্যূনতম পর্যায়ে আনা। এজন্য প্রযুক্তি তথা অটোমেশনে যাওয়া দরকার। কিন্তু সেক্ষেত্রে অগ্রগতি না হলে করের সুবিধা তিন পক্ষে ভাগ হয়ে যায়।

বাড়তি যে রাজস্ব ধরা হয়েছে, তার ৫১ শতাংশ আসবে ভ্যাট আর ৩৭ শতাংশ আসবে সম্পূরক শুল্ক থেকে। অর্থাত্ পুরো করের চাপ পরোক্ষ করের ওপর। সাম্প্রতিককালে এই পরিমাণ পরোক্ষ করের চাপ ছিল না। এটি আয় নির্বিশেষে সব মানুষের ওপর চাপ বাড়বে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কর কাঠামো সংস্কার। এটি না করা গেলে গুরুতর সংকট তৈরি হবে। কেননা জিডিপিতে রাজস্বের অবদান কমছে। এবার তা ১০ শতাংশের নিচে নেমে যাবে।

 

বাজেট পাশের আগে কিছু বিষয়

বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন

—রুবানা হক

সভাপতি, বিজিএমইএ

 

প্রস্তাবিত বাজেটে রপ্তানির উেস কর ও প্রণোদনার ওপর কর এতদিন যে হারে দেওয়া হতো, তার দ্বিগুণ হয়েছে। আবার ভ্যাট ও শুল্ক সংক্রান্ত কিছু ইস্যুতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বাজেট পাশের সময় এগুলো বিবেচনায় নেওয়া দরকার। ইতিমধ্যে এ ইস্যুতে এনবিআরকে একটি চিঠিও পাঠানো হয়েছে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে। আগে বিজিএমইএর প্রত্যয়নপত্র দিয়ে আমদানিকৃত মূলধনী যন্ত্রপাতি ও অগ্নি নির্বাপণ উপকরণ খালাস করা যেত। এখন বিভাগীয় ভ্যাট কর্মকর্তার প্রত্যয়ন লাগবে। এটি আমদানি প্রক্রিয়াকে আরো জটিল করবে। একই সঙ্গে রপ্তানি ও বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করবে।

এছাড়া বন্দরে পণ্য পৌঁছানোর পাঁচ দিনের মধ্যে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। এটি আদৌ সম্ভব নয়। কেননা, এর সঙ্গে অনেকগুলো পক্ষ জড়িত থাকে। অনেক সময় জাহাজ চলে আসে কিন্তু ডকুমেন্ট পরে আসে। এইচ এস কোড (পণ্যের পরিচিতি নম্বর) সংক্রান্ত জটিলতা কমানো এবং কারখানাকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করার জন্য কিছু পণ্যে শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহারসহ রেয়াতি হারে আমদানি সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন।

 

মাঠ পর্যায়ের রাজস্ব কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারী

হওয়ার অবারিত সুযোগ তৈরি করবে

—মোহাম্মদ আলী খোকন

প্রেসিডেন্ট, বিটিএমএ

 

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের ব্যাপক বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দার প্রভাবে আমাদের রপ্তানিমুখী ও স্থানীয় চাহিদা পূরণের জন্য যে সব টেক্সটাইল মিল সুতা ও কাপড় তৈরি করে ঐ সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে আগামীতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ সব দিক বিবেচনায় নিয়ে ও করোনা ভাইরাসজনিত মহামারি থেকে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ  মোকাবিলার জন্য বস্ত্র খাতে বিদ্যমান নগদ সহায়তা আপত্কালীন সময় তথা আগামী ৬ মাসের জন্য ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে তা ১০ শতাংশে নির্ধারণ ও কটন সুতাসহ কৃত্রিম আঁশের সব ধরনের সুতার মূসক ২ টাকা ধার্যের জন্য বিটিএমএ থেকে প্রস্তাব করা হয়েছিল। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বস্ত্র খাতে আমাদের প্রতিযোগী দেশের এগ্রেসিভ প্রোমেশনাল স্ট্রাটেজি মোকাবিলা করা। অন্যদিকে দেশের ক্ষতিগ্রস্ত মিলকারখানাকে সহযোগিতা করা।

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে আপিলাত ট্রাইব্যুনাল ও আপিল কমিশনারেটে আপিল দায়েরের ক্ষেত্রে দাবিকৃত ভ্যাটের ১০ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ অর্থ পরিশোধের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাব যথাযথ হয়নি। সরকার যেখানে ব্যবসার খরচ কমানো, ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ, উদ্যোক্তা বিকাশ ও ব্যবসা পরিচালনায় হয়রানি বন্ধের কথা বলছেন সেখানে এ ধরনের আইন হলে তা ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর হবে। নতুন আইনে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বাড়লে তাতে শুধু উদ্যোক্তা বিকাশই বাধাগ্রস্ত হবে না বরং প্রস্তাবগুলোর কারণে বিদ্যমান ব্যবসাই টিকে থাকতে পারবে না। কারণ, অনুমতি ছাড়া যে কোনো (রাজস্ব কর্মকর্তা) ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যে কোনো সময় ঢুকতে পারবেন যা মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের স্বেচ্ছাচারী হওয়ার অবারিত সুযোগ তৈরি করবে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনায় পণ্য খালাস/শুল্কায়নকালে এসআরও-১২১-এর শর্ত ৬ অনুযায়ী আমদানিকারক প্রয়োজনীয়সংখ্যক মূসক রিটার্ন দাখিল করেছে মর্মে কাস্টমস কম্পিউটার সিস্টেমে ইলেকট্রনিক তথ্য প্রদর্শিত না হলে বিভাগীয় মূসক কর্মকর্তার দপ্তর হতে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারককে প্রত্যয়নপত্র গ্রহণ সাপেক্ষে পণ্য খালাসের জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে নানা সমস্যা তৈরি হবে। তাই এই এসআরও প্রত্যাহার করে আগের মতো অ্যাসোসিয়েশনকে এ দায়িত্ব দিলে কোনো সমস্যা থাকবে না।

সরকার যেটা করতে যাচ্ছে তা মোটেও

ভালো পলিসি হবে না

—আহসান এইচ মনসুর

নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট

 

ভ্যাট আদায় বিষয়ে একটা খুবই খারাপ সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে। এটার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইসহ অন্যদের একসঙ্গে কাজ করা উচিত। সরকার যেটা করতে যাচ্ছে তা মোটেও ভালো পলিসি হবে না। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভ্যাট আইনে ২০১২ অনুযায়ী ডিভিশনাল পর্যায় বা তার ওপরের লোকদের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল এখন তা মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও দেওয়া হচ্ছে। যা খুব খারাপ হবে। এতে ব্যবসায়ীরা অনেকক্ষেত্রেই অযথা হয়রানির শিকার হবেন। আর তাতে ব্যবসার পরিবেশ নষ্ট হবে। একটা দেশের উন্নয়নে বেসরকারি খাত তথা ব্যবসায়ীরা বড় ভূমিকা রাখেন। একটি আইনের মাধ্যমে যদি সে ভূমিকা রাখার কাজে বাধা সৃষ্টি হয় তাহলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য খারাপ বিষয়, দুঃখজনক।

করোনা পরিস্থিতিতেও সরকার বাস্তবতার সঙ্গে মিল না রেখে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে। বাস্তবতা বিবর্জিত এ লক্ষ্য কখনোই অর্জন সম্ভব হবে না। এমনিতেই গত সাত-আট বছর ধরেই রাজস্ব খাত বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা এমনিতেই চাপে থাকবে। এর ওপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমোদন ছাড়া মাঠ পর্যায়ের কর কর্মকর্তারা যদি বেশি ক্ষমতা পায় তাহলে তা ব্যবসায়ীদের ওপর প্রয়োগ করবে। তাতে কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে জড়ানোর সুযোগও হবে। তাতে দেশের জন্য খুব ভালো কিছু হবে না। মূসক নিয়ে বিরোধে মামলা করতে গেলে ১০ শতাংশের বদলে ২০ শতাংশ টাকা জমা দিতে হবে। এটা ঠিক হয়নি। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নিরপেক্ষ লোক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। সরকারি কোনো লোক নিয়োগ দিলে তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না।

 

অটোমেশন হলে অনেক সমস্যার

সমাধান হতে পারে

—মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ

সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

 

ভ্যাট বিষয়ে যে নতুন সিদ্ধান্ত হচ্ছে তা অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হবে। এটা ব্যবসায়ীদের জন্য ভালো কিছু হবে না। কর কর্মকর্তাদের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার অপব্যবহার হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা আছে। যে উদ্দেশে এ আইন করা হয়েছে তার সঠিক বাস্তবায়নটা বিভিন্ন কারণে হয় না। এক্ষেত্রে সঠিক জবাবদিহিতা না থাকলে সমস্যা বাড়বে। ভ্যাট আদায়ের ব্যবস্থা অটোমেশন হলে তাতে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে। অটোমেশন হলে সেখানে নির্দিষ্ট                      ফর্মুলা থাকবে। সে অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা ভ্যাট ও ট্যাক্স দেবেন।                   আর কর্মকর্তারাও নিয়মানুযায়ী কাজ করবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ও ব্যবসায়ীরা মুখে অটোমেশনের কথা বললেও এটা বাস্তবায়ন হোক সেটা চান না। এ কারণেই এটা করতে এত ধীরগতি। আমাদের দেশে কোনো আইন করা হয় ভালো ফলাফল পাওয়ার জন্য। তবে তাতে ভালো কিছু ফল আসে না। অনেকক্ষেত্রেই তা নিবর্তনমূলক আইনে পরিণত হয়। কারণ, যাদের ধরার জন্য আইন করা হয়                    তারা ঠিকই ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যান। আর আইনের জালে ছোটরা ধরা পড়ে।

মূসক নিয়ে বিরোধে মামলা করতে গেলে ১০ শতাংশের বদলে ২০ শতাংশ টাকা জমা দেওয়ার যে বিধান করা হয়েছে তাতে ছোটরা বিপদে পড়বে। বড় ব্যবসায়ী যারা কর ফাঁকি দেন তাদের জন্য এটা করা হলেও তারা বিভিন্নভাবে এ থেকে পার পেয়ে যান। তবে এ আইনের কারণে যারা নিয়মিত কর দেন তাদের বিপদে পড়তে হয়। তাদের জন্য আইনটা কঠিন হয়ে যায়। প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য ভালো কিন্তু প্রয়োগের জায়গায় সমস্যা হয়ে যাচ্ছে।

 

করোনা পরিস্থিতিতে ব্যবসায়-বাণিজ্যের

অবস্থা ভালো নয়

—শামস মাহমুদ

সভাপতি, ডিসিসিআই

 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাঠপর্যায়ের কর্মীরা আগে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নথিপত্র তদারকি করতে গেলে কর কমিশনারের অনুমোদন লাগত। প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হচ্ছে, এখন অনুমোদন লাগবে না। এতে ব্যবসায়ীদের হয়রানি আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আমরা অনলাইনে রিটার্ন দেওয়ার কথা বলছি, যাতে কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দেখা না হয়। এখন যদি নতুন করে মাঠপর্যায়ে অনুমতি ছাড়া নথিপত্র যাচাইয়ের সুযোগ                     দেওয়া হয়, তাহলে তা সমস্যা বাড়াবে। আমরা চাই, মাঠপর্যায়ের কর্মীদের এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা শুধু জ্যেষ্ঠ                  কর্মকর্তাদের অনুমোদন সাপেক্ষে থাকা উচিত। এখন যে পদক্ষেপটি নেওয়া হয়েছে, তা কর বাড়ানোর জন্য বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আমরা স্বাভাবিক সময়েই মাঠপর্যায়ে এত ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য মনে করতাম না।

বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা ভালো নয়। উলটো সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বেশি। আমরা আশঙ্কা করছি, হয়রানি অনেক বাড়বে। তাই মাঠপর্যায়ে এত ক্ষমতা না দেওয়াই সুবিবেচনাপ্রসূত কাজ হবে। বিরোধ দেখা দিলে সেটা নিষ্পত্তির বিষয়টিও কঠিন করে ফেলা হয়েছে। মূসক নিয়ে বিরোধে মামলা করতে গেলে ১০ শতাংশের বদলে ২০ শতাংশ টাকা জমা দিতে হবে। এরপর কয়েকটি স্তর পেরিয়ে উচ্চ আদালতে একটি মামলা নিষ্পত্তি করতে                    গেলে ৫০ শতাংশ অর্থ জমা দিতে হবে। এটা কোম্পানির তারল্য             সংকট বাড়াবে। এমনিতেই কোম্পানিগুলো পরিচালন মূলধনের অভাবে রয়েছে। এছাড়া মামলায় জিতলেও জমা দেওয়া টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট নয়। আবার কারখানার যন্ত্রপাতি আমদানিতে ভ্যাটের প্রত্যয়নপত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ করোনার সময়ে ব্যবসা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য হুমকিস্বরূপ। আমরা আশা করি, সরকার বিষয়গুলো বিবেচনা করবে।