নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দেশের নতুন নতুন এলাকা বন্যাকবলিত হচ্ছে। কুড়িগ্রাম জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এছাড়া লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও জামালপুর জেলা এবং সুনামগঞ্জের ছাতক, নীলফামারীর ডিমলা, রংপুরের পীরগাছা উপজেলাসহ বিভিন্ন স্থানে বন্যা দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাড়িঘর, ফসলের ক্ষেত।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, সেখানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। কুড়িগ্রামের ২০টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির আউশ, পাট, ভুট্টা, কাউন, চিনাবাদাম ও শাকসবজির ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, নদ-নদীর পানি যেহারে বাড়ছে তাতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। শনিবার বিকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীর পানি ৩৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ৪৩ সেন্টিমিটার, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ৩৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ৩৮ সেন্টিমিটার এবং নুনখাওয়া পয়েন্টে ৩১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
চিলমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, উপজেলার মাইলডাঙ্গা, টোন গ্রাম, নটারকান্দি, কড়াই বরিশাল, মনতোলা, ঘোড়ারকুটি, চাচলা, ঢুষমারা, মাঝস্থল এলাকা প্লাবিত হয়ে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। আমন বীজতলা, মরিচ, বেগুন ক্ষেত তলিয়ে গেছে। গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বন্যাকবলিত এলাকার লোকজন। রাজার ভিটা এলাকায় বাঁধের রাস্তার সংস্কারকাজ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অবহেলায় শেষ না হওয়ায় তা যে কোনো মুহূর্তে পানির তোড়ে ভেঙে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সেখানকার লোকজন।
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তায় অব্যাহত পানি বৃদ্ধির কারণে উপজেলার সাহেবের আলগা, বেগমগঞ্জ, দলদলিয়া, থেতরাই, গুনাইগাছ, বজরাসহ আটটি ইউনিয়নের প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমর, গঙ্গাধর, শংকোষসহ সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে দুই কুল ছাপিয়ে তলিয়ে গেছে বামনডাঙ্গা, বেরুবাড়ী, রায়গঞ্জ, কালীগঞ্জ, নুনখাওয়া, নারায়ণপুর, কচাকাটা, কেদার ও বল্লভেরখাস ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি গ্রাম। এতে করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ঐ গ্রামগুলোর সাত সহস্রাধিক মানুষ।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার ১৩টি ইউনিয়নে বন্যা দেখা দিয়েছে। সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, গোকুন্ডা, মোঘলহাট, কুলাঘাট, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারি, তুষভান্ডার, কাকিনা, হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, সির্ন্দুণা, পাটিকাপাড়া ইউনিয়নের ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাট, ভুট্টা ও আমন বীজতলাসহ অন্যান্য ফসল তলিয়ে গেছে। বন্যার প্রাবল্য কমাতে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তর জানায়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে ২১ মেট্রিকটন চাল বিতরণ করা হয়েছে। গতকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নগুলোতে ৫৯ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ি ঘাট পয়েন্টে শনিবার বিকাল ৩টায় প্রবাহিত হয়েছে বিপত্সীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে। আর ঘাঘট নদী জেলা শহরের নতুন ব্রীজ পয়েন্টে প্রবাহিত হয়েছে বিপত্সীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে। জেলার সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার নদী তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত হওয়ায় ডুবে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার পরিবার। শুরু হয়েছে নদীভাঙনও। ফুলছড়ি উপজেলায় গত বছরের বন্যায় ভাঙা বাঁধ মেরামত না করায় বাঁধের ভেঙে যাওয়া অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে দুইটি গ্রামের সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ডুবে গেছে গাইবান্ধা-বালাসীঘাট সড়কও। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো জরুরিভাবে মেরামত করা হচ্ছে।
জামালপুর প্রতিনিধি জানান, যমুনার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বেলা ৩টার দিকে যমুনার পানি বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্টে বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে দেওয়ানগঞ্জ ও ইসলামপুর উপজেলার প্রায় ১০ হাজার মানুষ। পানিতে তলিয়ে গিয়ে যমুনার চরের বাদাম ক্ষেত ও বীজতলার কাঁচা শাকসবজি, উঠতি ফসল ইক্ষু ও পাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইসলামপুর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের মুন্নিয়ারচর ও নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের মাইজবাড়িসহ বেশ কিছু এলাকায় নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, শুক্রবার সকালে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপত্সীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের প্রায় ৩ হাজার পরিবার। বন্যায় চরের বাদাম খেত ও বীজতলার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায় জানান, শুক্রবার তিনি উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের পানিবন্দি ২২টি পরিবারের মধ্যে সরকারের তরফ থেকে শুকনো খাবার ও নগদ ২ হাজার টাকা করে বিতরণ করেছেন। বাকি পরিবারগুলোর জন্য জেলায় ত্রাণের চাহিদাপত্র প্রেরণ করা হয়েছে।
পীরগাছা (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, রংপুরের পীরগাছায় তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। নদী তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী প্রায় ৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। সরকারি ও বেসরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়নি। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ বলেন, বন্যা কবলিত এলাকার খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জে নদী তীরবর্তী এলাকা ও নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, গতকাল সকাল ৯টায় সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পানি বিপত্সীমার ৪৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং যাদুকাটার পানি বিপত্সীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
এদিকে ছাতক (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানিয়েছেন, সুরমা নদীতে পানি বৃদ্ধির ফলে ছাতক পৌরসভাসহ উপজেলার ইসলামপুর, নোয়ারাই, উত্তর খুরমা, চরমহল্লা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বটেরখাল, কাকুরা নদীর পানিতে ভাতগাও, দোলারবাজার, জাউয়া, দক্ষিণ খুরমা, সিংচাপইড়, ছৈলা আফজালাবাদ ও গোবিন্দগঞ্জ সৈদেরগাঁও ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে ছাতক-সিলেট সড়কের একটি অংশ। ভেসে গেছে শতাধিক মত্স্য খামারের মাছ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শাকসবজির বাগান ও খেতের ফসল। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী ছাতক পয়েন্টে গতকাল সুরমা নদীর পানি বিপত্সীমার ১৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং চেলা ও পিয়াইন নদীর পানি বিপত্সীমার ১৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
বিশ্বনাথ (সিলেট) সংবাদদাতা জানান, সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার লামাকাজি ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
সিলেট অফিস জানায়, উজানের পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বর্ষণের ফলে সুরমা, কুশিয়ারাসহ বিভিন্ন নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সিলেট সদর, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জাফলং, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ উপজেলা বন্যা কবলিত হয়েছে। শনিবার দুপুরে দিরাই উপজেলা থেকে মার্কুলী যাওয়ার পথে একটি যাত্রীবাহী নৌকা হাওরের প্রবল স্রোতের তোড়ে ডুবে গেলে এক বৃদ্ধ ও শিশুর সলিল সমাধি ঘটে। পরে পুলিশ তাদের লাশ উদ্ধার করে। শেষ খবর পর্যন্ত তাদের পরিচয় মেলেনি।
শনিবার সন্ধ্যায় সিলেট বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ অফিস সূত্র জানায়, সিলেট ও সুনামগঞ্জে ৫ হাজার ২১৫ হেক্টর আউশ ক্ষেত ও সিলেটে ৩৫ হেক্টর আমনের বীজতলা পানিতে ডুবে গেছে।
