সোনালি আঁশ খ্যাত ও অমিত সম্ভাবনাময় পাটশিল্প এখন রীতিমতো ঝুঁকির মুখে পড়িয়াছে। অথচ পাটশিল্প একসময় ছিল আমাদের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য প্রধান বুনিয়াদ। এমনকি আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সহিতও সম্পৃৃক্ততা ছিল পাটের। আশ্চর্যের ব্যাপার হইল, গত এক দশকে পাট রপ্তানি হইতে আমাদের আয় কিন্তু দ্বিগুণ বাড়িয়াছে। বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের বহুমুখী উদ্যোগও দৃশ্যমান; কিন্তু তাহার পরও বিগত বত্সরব্যাপী দফায় দফায় কিছু পাটকলে চলিয়াছে রাজপথ রেলপথ অবরোধ, অনশন, হরতাল। সংঘাত সংঘর্ষ সহিংসতা দেখা দিয়াছে। শ্রমিকরা তাহাদের দাবিতে একের পর এক আন্দোলন চালাইয়া গেলেও সুষ্ঠু সমাধান আসে নাই। সকল কিছু মিলাইয়া পাট সেক্টরের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং পাট মন্ত্রণালয় ও বিজেএমসির অবহেলার কারণে অমিয় সম্ভাবনার পাটশিল্প আজ পথ হারাইয়াছে বলিয়া মনে করেন অনেকে। সম্প্রতি পাটশিল্পে সরকারের লোকসান ঠেকাইতে পাটকলগুলির প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিকদের স্বেচ্ছা অবসর তথা দেনা-পাওনা বুঝাইয়া দিয়া বিদায় (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) করিবার সিদ্ধান্ত হইয়াছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হইতে জানা যায়, আট বত্সরে পাটশিল্পে সরকারের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াইয়াছে ৪ হাজার কোটি টাকারও অধিক। আর এই বিপুল পরিমাণ লোকসান রোধ করিতেই সরকার এই শ্রমিক ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ লইয়াছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা এই ব্যাপারে একযোগে আন্দোলন করিবার ঘোষণা দিয়াছে।
যে কোনো লাভজনক শিল্পে যখন নিয়মিত লোকসান গুণিতে হয় তখন উহার সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনাকেই সর্বাগ্রে দায়ী করিতে হইবে। লাভজনক পর্যায়ে লইয়া যাইতে যাহা করা প্রয়োজন, যেইভাবে পরিচালনা করিতে হইবে, তাহা করিতে ম্যানেজমেন্টের সদিচ্ছার অভাব এবং দুর্নীতির কারণে এই দশা হওয়াটাই স্বাভাবিক। ইহা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। গত বত্সর জাতীয় পাট দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলিয়াছেন, পাট এমন একটি পণ্য, যাহার কিছুই ফেলনা নহে। তাহার প্রশ্ন ছিল—তাহা হইলে কেন পাটে এত লোকসান হইবে? প্রধানমন্ত্রী লোকসানের কথা শুনিতে চাহেন নাই বরং পাটশিল্প কীভাবে লাভজনক হইবে সেইদিকে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলিয়াছেন। প্রশ্ন হইল, কেন দীর্ঘসময় ধরিয়া পাটশিল্প লোকসানে জর্জরিত হইল? এই ব্যাপারে বিজেএমসি জানাইয়াছেন, ২০০৯-২০১২ সাল পর্যন্ত তিন বত্সরে মিলগুলির সেটআপের শূন্যপদের বিপরীতে তিন ধাপে ৩০ শতাংশ করিয়া মোট ৯০ শতাংশ শ্রমিক স্থায়ী করায় মজুরি বৃদ্ধি পায়। সাড়ে ৪ হাজার শ্রমিককে পুনর্নিয়োগও দেওয়া হয়। অন্যদিকে পঞ্চাশের দশকের পুরাতন মেশিনের কারণে পাটকলগুলির উত্পাদনক্ষমতা ৫০ শতাংশের নিচে নামিয়া গিয়াছে। এইদিকে নিয়মিত শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ না করিতে পারিবার কারণে পাটকলগুলির গেটে ঘনঘন মিটিং, ধর্মঘট ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে উত্পাদন ব্যাহত হইয়াছে। ফলে দিনদিন লোকসানের পরিমাণ বাড়িয়াছে।
পাট পরিবেশবান্ধব, বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য আঁশ। শিল্পবিপ্লবের সময় হইতেই অন্যান্য কৃত্রিম আঁশের স্থান দখল করিয়া পাটের যাত্রা শুরু। পাটের আঁশের প্রধান বৈশিষ্ট্য হইতেছে অন্য অনেক আঁশের সহিত মিশ্রণ করিয়া ইহাকে ব্যবহার করা যায়। এখন পাটশিল্পকে জাগাইতে পিপিপি কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা—যাহাই হউক না কেন, ম্যানেজমেন্ট যেন যথাযথ হয়। বিশ্বব্যাপী যখন পরিবেশবান্ধব পাটের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাইতেছে তখন পাটশিল্প হইতে সর্বোচ্চ সুফল পাইতে আমাদের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থাপনায় হালনাগাদ করিতেই হইবে।
