বিদ্যুত্স্পৃষ্টের ঘটনা :প্রয়োজন সচেতনতা

আপডেট : ২৮ জুন ২০২০, ২১:৫৩

সালাহ্উদ্দিন নাগরী

গত ২১/৬/২০২০ তারিখ সকালে টাংগাইলের মির্জাপুরে মহিষ চরাতে গিয়ে মাঠে পড়ে থাকা বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু হয়। এলাকাবাসী জানান, বাঁশের খুঁটির সাহায্যে টানানো বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে এ ঘটনা ঘটেছে। কিছুদিন আগে পত্রিকার আরেকটি খবরে এসেছিল—খিলগাঁও এলাকায় বর্ষার কোনো এক রাতে এক দম্পতি বাইরে থেকে বাসায় ফিরে কলাপসিবল গেটে হাত দিতেই দুই জনই বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ঐ সময় বাসার সামনের পুরো চত্বর পায়ের গোড়ালি সমান পানি ছিল।

শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে বাসাবাড়ি, বাণিজ্যিক ভবন, মিল-ফ্যাক্টরি, বহিরাঙ্গনসহ সবখানেই সারা বছরই বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু ও আহত হওয়ার খবরগুলো পত্রিকার পাতায় ভেসে ওঠে। শিশু, গৃহবধূ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ গাছ থেকে ফল পাড়া, ছাদে কাপড় শুকানো, নির্মাণাধীন বিল্ডিং ও বাসাবাড়িতে ইলেকট্রিক কাজ ও রিপেয়ারিংয়ের সময় বিদ্যুতে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। তাতে কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করছেন, কেউ কেউ আবার আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন। আমাদের দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অপেক্ষা সড়ক দুর্ঘটনা, লঞ্চ ও নৌকাডুবি, সাপের কামড়, বজ্রপাত, অগ্নিকাণ্ড, বিদ্যুত্স্পৃষ্ট এবং পানিতে ডুবে মৃত্যু অনেক বেশি। উন্নত-উন্নয়নশীল সব দেশেই বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে থাকে, ভারতে প্রতিদিন এতে ৩০ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এক জরিপ মতে, আমাদের দেশে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে ২০০৩ সালে ২৭২০ জন মৃত্যুবরণ করেন, প্রতি বছর এ সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ২০১৬তে ৬৮৮০ জনে ঠেকেছে। আর এর শিকার হচ্ছেন ১৮-৫৯ বছরের মানুষই সবচেয়ে বেশি। অর্থাত্ একটি পরিবারে কর্মক্ষম মানুষই এ দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছেন। বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে যেহেতু পুরুষেরাই জড়িত থাকে বেশি, তাই তাদের সংখ্যা মহিলাদের থেকে বেশি। বিজ্ঞানের এ উত্কর্ষের যুগে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা বড়োই বেমানান। যে কোনো মৃত্যুই বেদনার; কিন্তু যে মৃত্যুগুলো সচেতনতা ও সতর্কতার মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব, তা আমাদের বেশি ব্যথিত করে।

সম্প্রতি পত্রিকার খবরে দেখলাম—সিলেটে বেশকিছু এলাকায় আন্ডারগ্রাউন্ড সঞ্চালন লাইন চালু করা হয়েছে। অত্যন্ত ভালো একটি উদ্যোগ। এর ইনস্টলেশন একটু ব্যয়বহুল হলেও মেইনটেনেন্স কস্ট তুলনামূলক কম, নিরাপদ এবং সৌন্দর্য বর্ধনে সহায়ক। ভরা বর্ষা চলছে। খেতখামার, বিলঝিল, রাস্তাঘাট পানিতে ভরে আছে। বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে কোথায় পড়ে আছে কে জানে? তাই এ সময় বিদ্যুত্ দুর্ঘটনাও বেশি ঘটে। বর্ষায় বা অন্য কারণে স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাওয়া ওয়াল, পুরোনো বৈদ্যুতিক ওয়ারিং এবং ত্রুটিপূর্ণ সুইচ-প্লাগ-সকেটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট ঘটনা ঘটে। অনেক বাসায় বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি বাইরে জুতা-স্যান্ডেল রেখে খালি পায়ে ঘরের ভেতর বৈদ্যুতিক কাজ করে, যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বৈদ্যুতিক কাজের আগে মেইনসুইচ বন্ধ করা, প্লাস্টিকের জুতা-স্যান্ডেল ব্যবহার ও কাঠের টুল-চেয়ারে দাঁড়িয়ে কাজ করার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

বাসাবাড়ি, স্থাপনা ও যেখানে যখনই বিদ্যুত্স্পৃষ্টের ঘটনা বা অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটবে, সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার বিদ্যুত্সংযোগ বন্ধ করতে হবে, এটাই হলো এ নিরাপত্তার প্রথম ধাপ; কিন্তু বাড়িঘর, অফিস-আদালতে আমরা যারা থাকি, বসবাস করি, কাজ করি, তাদের অনেকেই জানি না, সেখানকার মেইনসুইচ কোথায় আছে? তাই দুর্ঘটনায় বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতেই আমাদের হাতড়ে বেড়াতে হয়, আর এর মধ্যে তড়িতাহত ব্যক্তিটির প্রাণ যায় যায় অবস্থার তৈরি হয়।

সাবধানতার মার নেই, তাই বিদ্যুত্ দুর্ঘটনা রোধে বাসাবাড়ির গ্যারেজ, পানির মোটর ও জেনারেটর ঘর এবং উন্মুক্ত জায়গাটিতে বৃষ্টিতে যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বিদ্যুত্স্পৃষ্টের ঘটনা কমিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তাই রেডিও-টেলিভিশনের সাহায্য নিয়ে এ ব্যাপারে সতকর্তামূলক কার্যক্রম চালানো যেতে পারে। স্থাপনা নির্মাণ কার্যক্রমে নিয়োজিত শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের বৈদ্যুতিক ও অন্যান্য কাজে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়গুলো বুঝিয়ে দিতে হবে। পরিবারের সচেতন ব্যক্তিদের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সাবধানতার বিষয়টি অন্যদের নিয়মিত স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। মসজিদে জুমার নামাজের পূর্বে বিদ্যুত্ সতর্কতার বিষয় আলোচনা করতে হবে। প্রাইমারি ও জুনিয়র স্কুল পর্যায়ের ক্লাসগুলোতে বজ পাত ও ভূমিকম্পে করণীয়, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পদ্ধতি, রাস্তা পারাপারের নিয়মাবলি ও অন্যান্য সামাজিক সতর্কতার বিষয়গুলো পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে—এ দুর্ঘটনাগুলো প্রতিরোধে প্রথম এবং অন্যতম পন্থা হলো সতর্কতা ও সচেতনতা। 

n লেখক :সরকারি কর্মকর্তা