চিকিত্সক ও জনবল সংকটের কারণে খুলনা বিভাগের স্বাস্থ্যসেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরসহ এ বিভাগের দশ জেলা ও ৫৯টি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এক হাজার ৯২৩ জন চিকিত্সক পদের মধ্যে ৬৯৬টি এবং বিভাগে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের (ল্যাব) মঞ্জুরিকৃত ১৪৪টির মধ্যে ৭১টি পদ শূন্য রয়েছে। বিভাগের সবচেয়ে বৃহত্তম চিকিত্সা সেবা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের ভরসাস্থল খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের অবস্থা আরো করুণ। আড়াইশ শয্যার জনবল দিয়ে চলছে পাঁচশ শয্যার এই হাসপাতাল। বৃহত্তর খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের মধ্যে একমাত্র শহিদ শেখ আবু নাসের বিশেয়ায়িত হাসপাতালের ৯৩ জন চিকিত্সকের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ২৬টি পদই খালি।
এদিকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের পিসিআর মেশিনে একদিনে তিন শিফটে করোনা পরীক্ষার সর্বোচ্চ ক্ষমতা ২৮২টি। নমুনা আসছে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০টি। ফলে নমুনা জমতে জমতে রীতিমত স্তূপে পরিণত হয়েছে। সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে চেষ্টা করলেও সহস্রাধিক নমুনা অপেক্ষমান থাকছে। এতে রিপোর্ট দিতে ৫ থেকে ৭ দিন সময় লাগছে। ফলে সামগ্রিক চিকিত্সা ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ করোনাকালে রোগীরা পাচ্ছেন না কাঙ্ক্ষিত চিকিত্সাসেবা। সব মিলিয়ে খুলনার স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক হ-য-ব-র-ল অবস্থা। তবে, সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাকালের প্রথম দিকে চিকিত্সাসেবার কিছুটা ঘাটতি হলেও বর্তমানে কোনো সমস্যা নেই।
জানা যায়, স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর, এমএসডি, পোর্ট হেলথ অফিস এবং একটি বক্ষব্যাধি হাসপাতালসহ খুলনা বিভাগের দশটি আধুনিক সদর হাসপাতাল ও ৫৯টি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১ হাজার ৯২৩টি চিকিত্সকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে পরিচালকের দপ্তরে পাঁচটি পদের মধ্যে একটি, খুলনা বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ১১টি পদের মধ্যে ৭টি এবং খুলনা জেলায় ৩০২টি পদের মধ্যে ১০২টি, বাগেরহাটে ২৫৩টির মধ্যে ১১৬টি, সাতক্ষীরায় ২০৫টির মধ্যে ৮০টি, যশোরে ২৮১টির মধ্যে ৮২টি, ঝিনাইদহে ২১২টির মধ্যে ৬৮টি, মাগুরায় ১১৮টির মধ্যে ৪২টি, নড়াইলে ১১৫টির মধ্যে ৪৭টি, কুষ্টিয়ায় ২২০টির মধ্যে ৭২টি, চুয়াডাঙ্গায় ৯৩টির মধ্যে ২২টি ও মেহেরপুরে ১০৩টির মধ্যে ৫৭টি চিকিত্সকের পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া বিভাগের ১০ জেলায় তৃতীয় শ্রেণির মঞ্জুরিকৃত ৬ হাজার ৮৭১টি পদের মধ্যে ১ হাজার ৯৪৯টি পদ ও চতুর্থ শ্রেণির ২ হাজার ৪৮টি পদের মধ্যে ৭৮৫টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
এ ব্যাপারে খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিত্সক ও নার্সের সংকট থাকলেও রোগীদের চিকিত্সায় কোনো অবহেলা হচ্ছে না।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল সূত্র জানায়, শুরুর দিকে যে জনবল ছিল তাই দিয়েই চলছে হাসপাতালটি। ফলে স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও নার্সসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। হাসপাতালটি ৫০০ শয্যার হলেও প্রতিদিন রোগী থাকে এক হাজারেরও বেশি। তবে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারণে বর্তমানে রোগীর চাপ অর্ধেকে নেমে এসেছে। খুমেক হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকসহ চিকিত্সকের মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে ২৬৯টি। এর মধ্যে সিনিয়র কলসালটেন্ট সার্জারি, সিনিয়র কলসালটেন্ট রেডিওলজি, সিনিয়র কলসালটেন্ট চর্ম ও যৌন, রেজিস্ট্রার গাইনি, রেজিস্ট্রার নিউরো মেডিসিন, রেজিস্ট্রার নেফ্রোলজি, রেজিস্ট্রার আইসিইউ, রেজিস্ট্রার কার্ডিওলজি অ্যান্ড সিসিইউসহ গুরুত্বপূর্ণ ১৪৬টি চিকিত্সকের পদ শূন্য রয়েছে। প্রায় অর্ধেক চিকিত্সকের পদ শূন্য থাকার কারণে চিকিত্সা সেবা চলছে জোড়াতালি দিয়ে।
রেডিওলজিস্ট বিভাগের মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট এস এম আলতাফ হোসেন জানান, এ বিভাগে ৭টি এক্সরে মেশিন থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে চারটি মেশিন অকেজো। রেডিওলজিস্ট বিভাগে মঞ্জুরিকৃত পদ রয়েছে ৯টি। এরমধ্যে ৬টি পদই খালি। এর ওপর ছয়মাস ধরে কোনো চিকিত্সক নেই। এছাড়া আলট্রাসোনোগ্রামের মেশিন থাকলেও কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক নেই। ফলে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত চিকিত্সাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এদিকে, প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধীনে কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য হাসপাতালে পৃথক ফ্লু কর্নার ও ‘করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল’ নামে ১০০ শয্যার পৃথক একটি হাসপাতাল চালু করা হয়েছে। প্রতিদিন এখানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
এদিকে শেখ আবু নাসের হাসপাতালের ৯৩ জন চিকিত্সকের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সিনিয়র ও জুনিয়র কলসালটেন্টসহ বিভিন্ন বিভাগের ২৬টি পদই খালি রয়েছে। তবে বিশেষায়িত এ হাসপাতালের ১০টি আইসিইউ ও ৩০টি সিসিইউর সব কয়টিই চালু আছে।
