মানবতা ও নৈতিকতার কোনো স্তরেই নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ও অহেতুক রক্তপাতকে সমর্থন করা যায় না। হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য, প্রতিশোধ গ্রহণের অসত্ উদ্দেশ্য সাধনে যারা নিরপরাধ মানুষ হত্যা করে তারা মানবতাবর্জিত ও সভ্যতার শত্রু। সম্প্রীতি ও শান্তির ধর্ম ইসলাম মানুষের জানমাল রক্ষা করার জন্য সব ধরনের যুলুম, অত্যাচার ও রক্তপাত নিষিদ্ধ করেছে। বিদায় হজের ভাষণে মানবতার নবী মহানবী মুহাম্মদ (স) বলে গেছেন— ‘আজ এই পবিত্র দিনে, পবিত্র মাসে এবং পবিত্র শহরে তোমাদের জন্য যেমন (যুদ্ধবিগ্রহ) হারাম, তেমনিভাবে তোমাদের জান ও মাল বিনষ্ট করাও হারাম।’ (সহীহ্ বুখারী হাদিস- ১৭৪১) এ জন্য ইসলাম নিরপরাধ মানুষ হত্যা করাকে শিরকের পর সবচেয়ে বড় অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন- ‘কবীরা গোনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় গোনাহ হলো আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করা, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা কথা বলা।’ (সহীহ মুসলিম হাদিস-৮৮) অপর এক হদীসে নবী করীম (স) ইরশাদ করেন-‘দুনিয়া ধ্বংস করার চেয়েও আল্লাহর কাছে ঘৃণ্যতর কাজ হলো মানুষ হত্যা করা।’ (তিরমিযী)
অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনাই নয়; ইসলামের দৃষ্টিতে পুরো মানব জাতির বিরুদ্ধে তা একটি ধ্বংসাত্মক কাজ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ ফরমান- ‘নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে দুনিয়ার সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল, আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে রক্ষা করল।’ (সূরা মায়িদা, ৩২)
নিরীহ মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার চেয়ে ভয়াবহ পাপ আর নেই। ইসলামী শরীয়াহ মতে পৃথিবীর সব মানুষ মিলে যদি একটি অন্যায় হত্যাকাণ্ড ঘটায়, তবে কিয়ামতের দিন সবাইকে জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে। নবী করীম (স) বলেন- ‘যদি আসমান ও জমীনের সব অধিবাসী একজন মুসলমানকে অন্যায়ভাবে হত্যার জন্য একমত হয়, তবে আল্লাহ তাদের সবাইকে অবশ্যই জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। (মুসনাদে আহমাদ) হাশরের ময়দানে অন্যায় হত্যাকাণ্ডের মোকদ্দমা দিয়েই আল্লাহ তাঁর বিচারকার্য শুরু করবেন। হাদীস শরীফে এসেছে- ‘কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে মোকদ্দমার ফায়সালা হবে তা হলো- রক্তপাত বা হত্যা সম্পর্কিত।’ (বুখারী শরীফ হাদীস-৬৩৫৭)
ইসলামের সোনালী যুগে প্রতিটি জনপদ নিরাপদে ছিল। একজন নারী সুসজ্জিত অলঙ্কার পরে একাকী নিরাপদে রাত দুপুরে তার গন্তব্যে পৌঁছতে পারতেন। তখন সংখ্যালঘুদের জান-মালেরও পূর্ণ নিরাপত্তা ছিল। কোরআন এবং আল্লাহর নবীর (স) শিক্ষা তখনকার মানুষকে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছিল। আল-কোরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নানাভাবে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ বলেন— ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা কাসাস- ৭৭)
লেখক: বাংলাদেশ বেতারের ধর্মীয় আলোচক
