গৌতম বুদ্ধ বলিয়াছেন, ‘একজন অলসের মৃত্যুর পথ হয় সংক্ষিপ্ত, আর একজন পরিশ্রমী মানুষের জীবন হয় বর্ণাঢ্য। সুতরাং বোকারাই অলস হইয়া থাকে, আর বুদ্ধিমান মানুষ হন পরিশ্রমী।’ দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের মৃত্যু মহামতি গৌতম বুদ্ধের সেই বাণীই আরো একবার আমাদের স্মরণ করাইয়া দিয়াছে। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন পরিশ্রমী ও নিষ্ঠাবান উদ্যোক্তা। লেখাপড়া শেষ করিয়া তিনি ডব্লিউ রহমান জুট মিলে ট্রেইনি হিসাবে কাজ শিখিয়া প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী হিসাবে যোগ দিয়াছিলেন; কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধে সবকিছু উলটপালট হইয়া যায়। ১৯৭২ সালে দেশ স্বাধীনের পর তিনি প্রায় শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করেন। ৫০ লক্ষ টাকা ব্যাংক ঋণ লইয়া তিনি চায়ের ব্যবসার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করিয়াছিলেন। নিজের মেধা ও পরিশ্রমের দ্বারা তিনি ১৬টি কোম্পানি গড়িয়া তোলেন। তাহার এই কোম্পানির সর্বশেষ বার্ষিক লেনদেন ছিল সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। লতিফুর রহমানের মধ্যে ছিল নবপ্রবর্তনের একটি ক্ষমতা। তিনিই বাংলাদেশের বাজারে আন্তর্জাতিক ফাস্টফুড চেইন পিত্জাহাট এবং কেন্টাকি ফ্রায়েড চিকেন বা কেএফসি প্রবর্তন করেন। লতিফুর রহমান নেসলে বাংলাদেশ, হোলসিম বাংলাদেশ এবং ন্যাশনাল হাউজিং ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি লিন্ডে বাংলাদেশ ও ব্র্যাকের গভর্নিং বোর্ডের পরিচালকের দায়িত্বও পালন করিয়াছেন। ব্যবসায় পরিচালনার ক্ষেত্রে নিষ্ঠা, নীতি ও সততার স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যবসায়ী জগতে তিনি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বিজনেস ফর পিস অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। তিনি দেশের দুইটি প্রথম শ্রেণির সংবাদপত্র ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাতা। এই ক্ষেত্রেও তিনি পেশাদারিত্বের পরিচয় রাখিয়াছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে লতিফুর রহমান ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক, মৃদুভাষী। ধৈর্যের কোনো ঘাটতি ছিল না তাহার চরিত্রে। ১৯৯৮ সালে গুলশানের বাড়িতে তাহার মেয়ে, স্কলাস্টিকা স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী শাজনীন নিহত হওয়ার পর তিনি স্থিরচিত্তে সেই শোক সহ্য করিয়াছেন। ২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজান হামলায় তিনি তাহার অত্যন্ত আদরের মেধাবী নাতিকে হারাইয়াছেন। সেই শোকও কাটাইয়া উঠিয়াছিলেন। করোনার ভয়াল থাবায় সমগ্র পৃথিবী যখন অস্থির হইয়া আছে, তখন লতিফুর রহমানও স্বাভাবিক কারণে বিচলিত হইয়াছিলেন। এই ভাইরাস প্রাদুর্ভাব শুরু হইলে তিনি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নিজ বাড়িতে থাকিতে শুরু করিয়াছিলেন। একজন ভালো ব্যবসায়ী একটি সমাজের জন্য বড় উদাহরণ। আমাদের এই সমাজে যখন ভালো মানুষ ও নিষ্ঠাবান মানুষের অভাব প্রকট হইয়া উঠিতেছে তখন লতিফুর রহমানের চলিয়া যাওয়া নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা তাহার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। তাহার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রহিল আমাদের গভীর সমবেদনা।
