ফাবিং ও করোনা-পরবর্তী সময়

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২০, ২২:১৮

মো. তাহসীনুল হক

ফাবিং। ইংরেজি এই শব্দ মূলত এসেছে Phone (ফোন) ও Snubbing (অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ) থেকে। ফাবিং একধরনের আচরণ, যেখানে আমরা মোবাইলকে গুরুত্ব দিতে দিতে পাশে বা সামনে থাকা মানুষটির প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়ি। শব্দটির সঙ্গে আমাদের কম পরিচয় থাকলেও স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই আচরণে আমরা কমবেশি সবাই অভ্যস্ত। আর এই আচরণকেই আভিধানিক ভাষায় বলা হয় ফাবিং।

পৃথিবী যত বদলাচ্ছে, প্রযুক্তিও তত উন্নত হচ্ছে আর বাড়ছে মোবাইল ফোনের গ্রাহকের সংখ্যা। সিঙ্গাপুরভিত্তিক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডাটা রিপোর্টালের বরাত দিয়ে জানা যায়, গত এক বছরে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ মানুষ নতুন করে মোবাইলের গ্রাহক হয়েছেন। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানিয়েছে, গত এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে  ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি ১১ লাখ। আর মোট ইন্টারনেট গ্রাহকের মধ্যে ৯ কোটি ৩১ লাখ মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। বর্তমান বিশ্ব যখন করোনা ভাইরাস মহামারিতে থমকে আছে, তখন মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারী গ্রাহকের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডাটা রিপোর্টাল করোনা ভাইরাসের জন্য লকডাউন চলাকালীন অনলাইনে প্রায় ২০টি দেশের ১৬ থেকে ৬৪ বছর বয়সিদের নিয়ে একটি জরিপ করে, যেখানে প্রায় ৭৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী এই লকডাউন চলাকালীন তাদের স্মার্টফোন সবচাইতে বেশি সময় ব্যবহার করেন বলে জানান ।

করোনা ভাইরাসের প্রকোপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মানুষ বেশির ভাগ সময় পার করছে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এ বছর জানুয়ারি মাসের চেয়ে মার্চে প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা ফেসবুক ব্যবহার করেছেন। অর্থাত্, বোঝা যাচ্ছে,  করোনা ভাইরাস চলাকালীন মানুষ স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই বেশি সময় কাটাচ্ছে। আর এটিই বাড়িয়ে দিচ্ছে করোনা-পরবর্তী ফাবিংয়ের আশঙ্কা।

আপনি যখন আপনার সামনের বন্ধুটিকে বাদ দিয়ে ভার্চুয়াল জগতের বন্ধুটিকে মেসেজ পাঠাচ্ছেন, তার মানেটা কী দাঁড়াচ্ছে? তার মানে দাঁড়াচ্ছে, সামনাসামনি থাকা বন্ধুটির চেয়ে ভার্চুয়াল জগতের বন্ধুটিই আপনার কাছে বেশি মূল্যবান। আর বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে সব সময়ই একটা মান-অভিমান, মানসিক টানাপোড়েনের জায়গা থাকে। কেউই মানতে পারে না যে সে যাকে বন্ধু করে, সেই বন্ধু তাকে বন্ধু ভাবে না, কিংবা ভাবলেও অন্য আরেকজন বন্ধুর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। এরকমটা যখন আপনার সামনে থাকা বন্ধুটিও ভাববে, তখন থেকেই আপনাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে থাকবে। টেক্সাসের বেলর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ৪৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে নিয়ে এক গবেষণা পরিচালনা করেন। সামাজিক সম্পর্কের ওপর ফাবিং কী প্রভাব ফেলে, তা বুঝতেই এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় অন্তত ৪৬ শতাংশ ব্যক্তি স্বীকার করেন যে তারা তাদের পাশে উপস্থিত থাকা ব্যক্তি থেকে ফাবিংয়ের শিকার। একই সঙ্গে অন্তত ২৩ শতাংশ ব্যক্তি বলেছেন, ফাবিংয়ের কারণে তাদের সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। শুধু তাই নয়, ফাবিং যারা করেন, তারা খুব দ্রুত বিমর্ষ হয়ে পড়েন। গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যক্তি বলেছেন, ফাবিংয়ের কারণে তারা একপর্যায়ে নিঃসঙ্গতা ও বিমর্ষতায় ভুগতেন। স্বাভাবিক সময়েই ফাবিং যখন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, দীর্ঘদিন পর করোনা-পরবর্তী সময়ে মানুষের যখন আরো বেশি সামাজিক ও মানবিক হওয়ার প্রয়োজন পড়বে, ঠিক তখনই করোনাকালীন অত্যধিক হারে স্মার্টফোন ব্যবহার অবনতি ঘটাতে পারে সামাজিক সম্পর্কের।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যে আমাদের জীবনে কী বিশাল আশীর্বাদস্বরূপ, তা ঠিক বলে বোঝানো সম্ভব নয়। কিন্তু নিজেদের দোষেই অনেক সময় আমরা এই আশীর্বাদটিকেই অভিশাপে রূপান্তরিত করে ফেলি। ফাবিংয়ের কারণেও ঠিক এমনটাই হচ্ছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট আমাদের অতি প্রয়োজনীয় জিনিস, অথচ ফাবিংয়ের কারণে সেই স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটকেই আমরা উপদ্রবে পরিণত করছি। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝুঁকে থাকা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের জন্য তাই ফাবিং সামনের দিনগুলোতে সামাজিক সম্পর্কের অবনতি ঘটায় কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই গেল!

n লেখক :শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ,

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়