সিরাজগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২০, ২২:৪১

সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় পাঁচটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। বহু বাড়িঘর, ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরেও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অর্ধশতাধিক গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে পদ্মা-যমুনায় অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধিতে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, আরিচা-কাজীরহাট নৌ রুটে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল মারাত্মক বিঘ্নিত হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধের হার্ড পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে গতকাল        বুধবার সকাল ৬টায় বিপত্সীমার ৪৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে আগামী ৪৮ ঘণ্টা যমুনা নদীর পানি স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। 

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুর রহিম জানান, ‘বন্যায় জেলার কাজীপুরসহ পাঁচটি উপজেলার ৩১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব এলাকার ২১৬টি গ্রামের ২৪ হাজার ৯২৪টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২৮০টি ঘরবাড়ি আংশিক, ২২টি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার রাস্তা ও বাঁধ এবং প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, টানা বৃষ্টিপাত আর পাহাড়ি ঢলে জগন্নাথপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চলসহ পুরো উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় ঐসব গ্রামের লোকজন পানিবন্দি হয়ে পড়ায় চরম দুর্ভোগে রয়েছে। অধিকাংশ গ্রাম ও সড়কপথ জলমগ্ন থাকায় যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র খোলা রাখা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহফুজুল আলম মাসুম জানান, নলজুর ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যায় সহস্রাধিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।

শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, যমুনার পানি আরিচা পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯ ও বাঘাবাড়ী পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বুধবার দুপুরে বিপত্সীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর প্রভাবে নদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে আবাদকৃত বোরো ধান তলিয়ে গেছে। ঘের ও পুকুর থেকে মাছ বেরিয়ে যাচ্ছে। আরিচা-জাফরগঞ্জ বাঁধ ও দাশকান্দি সড়কের কয়েক জায়গায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিআইডব্লিউটিসি আরিচা সেক্টরের ডিজিএম জিল্লুর রহমান জানান, পদ্মায় প্রবল সে াত ও ঘূর্ণাবর্তের কারণে ফেরির ট্রিপ টাইম বেড়ে গেছে। এতে ফেরি চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। মাওয়া রুটে ফেরি সার্ভিস বন্ধ থাকায় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটে যানবাহনের চাপ প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘট নদনদীর পানি সামান্য কমলেও জেলায় পানিবন্দি প্রায় দেড় লাখ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ পায়নি বলে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রিত পরিবারগুলো অভিযোগ জানিয়েছে। বন্যার পানির তোড়ে সাঘাটা-গাইবান্ধা (বাঁধের ওপর নির্মিত) সড়কের ভাঙ্গামোড় এলাকায় সড়কের গাইড ওয়াল ধসে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান জানান, বুধবার ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপত্সীমার ৭৮ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি বিপত্সীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান জানান, বন্যার পানিতে জেলায় ৩ হাজার ১০৬ হেক্টর জমির পাট, ১৯৬ হেক্টর আউশ ধান ও ১২৮ হেক্টর শাক-সবজি, ৪৩ হেক্টর আমন ধানের বীজতলা, ৪৪ হেক্টর তিল ও ২০ হেক্টর জমির চিনাবাদাম নিমজ্জিত হয়েছে।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জেলায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি ১ সেন্টিমিটার কমে বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপত্সীমার ৮৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও বেড়েছে ব্রহ্মপুত্রসহ শাখা নদীর পানি। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে জেলার ৭ উপজেলার প্রায় ৩ লাখেরও বেশি মানুষ। বন্ধ হয়ে গেছে স্থানীয় ও আঞ্চলিক সড়কযোগাযোগ। তলিয়ে গেছে ১০ হেক্টরের বেশি জমির ফসল। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।

নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, নাগেশ্বরীতে ধীরে কমতে শুরু করেছে নদনদীর পানি। উন্নতি হচ্ছে বন্যা পরিস্থিতির। তবে শুকনো খাবার, সুপেয় পানীয়জলের সংকট ও পানিবাহিত বিভিন্ন রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকারি হিসাবে আগাম এই বন্যা প্লাবিত করেছে উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন। পানিবন্দি করেছে ৪ হাজার ৬২৮ পরিবারের প্রায় ২০ হাজার মানুষকে।