সৈকতের ইশকুল বন্ধ। কিন্তু ঘরের বাইরে যেতেই পারছে না। মা, দিদা সবার বারণ। বাবা ঢাকায় চাকরি করে। লকডাউনের কারণে গাড়ি বন্ধ থাকায় বাবাও বাড়িতে আসতে পারে না। ফোনে ফোনে প্রতিদিন কথা হয় সৈকতের সাথে। বাবা কবে আসবে জানতে চাইলে বাবা বলে, গাড়ি তো বন্ধ। গাড়ি চালু হলেই চলে আসব।
আগে বাবা কিছুদিন পর পর আসা-যাওয়া করলেও এখন দুই মাস হয়ে গেলেও বাবা আসতে পারছে না। এদিকে ঘরের বাইরে যাওয়ার কথা বলতেই পারছে না মাকে। গেলেই নাকি বিপদ। কিসের বিপদ তা সে জানে না। অন্য সময় হলে দুপুরে মা ঘুম পাড়িয়ে দিতে দিতে বলত, দুপুরে রোদের মধ্যে ভূত আসে। ছোট ছেলেমেয়েদের ভুলিয়ে ভালিয়ে অনেক দূরের পাহাড়ে নিয়ে ফেলে দেয় দুষ্টু ভূতেরা। যেখান থেকে কেউ ফিরে আসতে পারে না। ঘুম থেকে উঠলে মা ফ্ল্যাটের নিচে নিয়ে একটু ঘুরে আসত। সামনের মাঠে খেলতে দিত। এখন তা-ও বন্ধ। বরং টিভি দেখতে না চাইলেও টিভি চালু করে দেয় মা। ওর পছন্দের কার্টুন চ্যানেল ধরিয়ে দেয়। যা খেতে চায় তা-ই বানিয়ে হোক দোকান থেকে এনে হোক সৈকতকে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ঘরের বাইরে যেতে গেলেই যত বারণ। এবারের ছুটিটাও ঈদের বা গ্রীস্মের নয়।
দিদা বলল, দাদুভাই বাইরে বেরুলে করোনা রোগের ভাইরাস গায়ে লাগতে পারে। তাতেই বিপদ। করোনা ভাইরাস কী, সৈকত জানে না। পাশের ফ্ল্যাটের নিলয়ের সাথেও খেলতে যাওয়া বারণ। নিলয়ও সৈকতকে আর আগের মতো ডাকে না খেলতে। দু মাস আগেও নিলয়ের সাথে ফ্ল্যাটের সামনের ছোট্ট খালি জায়গায় বল খেলেছে। অন্য ফ্ল্যাটের বন্ধুরাও আসছিল। এখন কিন্তু কেউ খেলতে আসে না।
সৈকতের কিছুই ভালো লাগে না। ইশকুলেও যেতে পারছে না। আগে তো ইশকুলে গিয়ে বন্ধুদের সাথে কত খেলাধুলা করত। সৈকত এবার ক্লাস থ্রিতে উঠেছে। শশাংক মালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। জানুয়ারিতে নতুন বই দিয়েছে ইশকুলে। ক্লাসও শুরু হয়েছিল। কিন্তু একমাস না যেতেই ফেব্রুয়ারিতে ইশকুল বন্ধ হয়ে গেল। সারাদিন মনমরা হয়ে জানলার পাশে বসে থাকে। বাইরের গাছপালা, দূরে হেঁটে যাওয়া লোকজনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তবে ফ্ল্যাটের পেছনের দিকে পশ্চিম পাশের জানলা দিয়ে একটু দূরে দেখা যায় ছোট ছোট ঘর। ঘরের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা দৌড়াদৌড়ি কত কি লেখাধুলায় মেতে থাকে। সৈকত তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। একদিন মাকে ওদের কথা বলতেই মা বলে, ওরা বস্তির ছেলে। ওদের কিছু হবে না। সৈকত মা’র এ কথাটা দিদাকে বললে দিদাও একই কথা বলে। তবে দিদা বলে কি, দাদুভাই ওরা সারাদিন ধুলাবালি, ময়লা নিয়ে মাখামাখি করে। ওদের সহ্য হয়ে গেছে। রোগব্যাধি ওদের পাশে যেতে পারে না। সৈকত মনে মনে বলে, তাহলে তো ওরাই ভালো। ওদের কেউ খেলতে বারণ করছে না। আমাদের বাসাটা ওদের কাছে হলে তো ভালোই হতো। পাঁচ তলায় কেন নিল বাবা।
দিদা প্রতিদিন সৈকতকে গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। সেই গল্পও আর ভালো লাগে না। দিদাও যেন আর গল্প খুঁজে পায় না। প্রতিদিন রাজা-উজির আর রাক্ষস-খোক্ষসের গল্প শুনতে শুনতে সৈকতও যেন ক্লান্ত। দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। এসব কথা বাবাকে ফোনে জানায় মা। বাবাও সৈকতের সাথে ফোনে কথা বলে মনটাকে ভালো করার চেষ্টা করে। বাবা বলে কি, আর মাত্র ক’টা দিন। তারপর আমরা শিশুপার্কে ঘুরতে যাব। মামার বাড়িতে বেড়াতে যাব বলে বলে কিছুটা হলেও সৈকতকে আনন্দে ফেরাতে চায়। সৈকতও বাবা আসবে আসবে বলে মনে মনে স্বপ্ন বোনে। কিন্তু যখন দেখে বাবা আসছে না, আবার মন খারাপ। মা সৈকতের মুখের দিকে তাকাতে পারে না। কী করবে তা-ও বুঝতে পারছে না। দিন দিন কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে সৈকত। বাবা বলল, একজন শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে আনতে। কিন্তু ডাক্তার বাবুরাও করোনার ভয়ে চেম্বারে বসেন না। এর মধ্যে হঠাৎ সৈকতের খুব জ্বর। মা ছেলের চিন্তায় অস্থির। সেদিন বাবার সাথে ফোনে অনেক রাগারাগি করেছে মা। তাড়াতাড়ি বাড়ি এসে সৈকতকে একজন ভালো চিকিৎসক দেখাতে বলল। মা কেঁদে কেঁদে বলে, আমার ছেলের কিছু হয়ে গেলে আমি কিন্তু ছাড়ব না। বাবাও কেঁদে কেঁদে আসতে না পারার অসহায়ত্বের কথা বলেছে। ছেলের দুশ্চিন্তায় সারারাত ঘুমাতে পারেনি বাবাও। হায়রে করোনা ভাইরাস!
