বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রভাবে মানুষের চলাচল প্রায় বন্ধ। খাদ্যপণ্য ও জরুরি ওষুধ ছাড়া অন্যান্য খাতে বলতে গেলে ভোগ ব্যয় একেবারেই তলানিতে। এর ভয়াবহ বিরূপ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক খাতে। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সদ্য সমাপ্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরে পোশাক পণ্য রপ্তানি কমেছে পূর্বের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলারের। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা। পোশাক রপ্তানিতে এমন ভয়াবহ ধস গত চার দশকে দেখেননি রপ্তানিকারকরা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানি করেছিল ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ডলারের। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৮৩ কোটি ডলারে।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, আগামী মাসগুলোতেও পরিস্থিতির বিশেষ কোনো উন্নতির লক্ষণ দেখছেন না তারা। দেশের অন্যতম বড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান স্টারলিং গ্রুপের মালিক ও এফবিসিসিআইর সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, চলতি মাসের কিছু ক্রয়াদেশ তার কারখানায় রয়েছে। কিন্তু এর আগস্ট থেকে পরবর্তী মাসগুলোর রপ্তানি আদেশ নেই বললেই চলে। সেপ্টেম্বর থেকে মূলত পরবর্তী গ্রীষ্মের রপ্তানির পণ্য তারা তৈরি করেন। এসব ক্রয়াদেশ নিয়ে মূলত এই সময়টিতে আলোচনা হয়। কিন্তু এবার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। রপ্তানির অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাবে আশঙ্কা করে তিনি বলেন, যতদিন পর্যন্ত পর্যটকের স্বাভাবিক চলাচল শুরু না হবে, ততদিন পোশাক জাতীয় পণ্য তেমন বিক্রি হবে না। ফলে আমাদের রপ্তানি আদেশও কমতির দিকেই থাকবে।
অবশ্য তার এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, করোনা শুরুর সময় পরিস্থিতি যতটা খারাপ ছিল, এখন তার অগ্রগতি হয়েছে। আগামীতে ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতাদের বড়ো ধর্মীয় উত্সব বড় দিনের কেনাকাটা হবে। হয়তো কিছুটা কম হবে। কিন্তু অনলাইন বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় বিক্রি হবে। ফলে বাংলাদেশের সামনে ভালো সময় আসছে। কেননা সদ্য সমাপ্ত জুনে রপ্তানি তুলনামূলক ভালোই হয়েছে। এজন্য এতদিন যে কম সক্ষমতা নিয়ে কাজ করতে হতো, সেখানেও পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। ফলে শ্রমিকদের স্বাভাবিক বেতন-ভাতাও দেওয়া সম্ভব হবে বলে অনুমান তার।
কারখানা বন্ধের ঝুঁকি
সূত্র জানিয়েছে, সদ্য সমাপ্ত জুনে রপ্তানি পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গত এপ্রিলে পোশাক রপ্তানি হয়েছিল মাত্র সাড়ে ৩৭ কোটি ডলার। মে মাসে ১২০ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আর জুনে এসে রপ্তানি হয়েছে ২১২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের এবং রপ্তানির নেতিবাচক ধারা থেকেও বের হয়ে আসার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। অবশ্য পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর পরিচালক ফজলে এহসান শামীম ইত্তেফাককে বলেন, গত বছর সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ যেসব পোশাক তৈরি করে রপ্তানি করেছিল, তা বিদেশি ব্র্র্যান্ডগুলোর বিক্রি হওয়ার কথা ছিল গত মার্চ থেকে মে বা বর্তমান জুলাই পর্যন্ত সময়ে। এই সময়টি সেখানে গ্রীষ্ম হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এবার করোনার কারণে যেহেতু বিক্রি তেমন হচ্ছে না, ফলে ঐসব পণ্য বায়ারদের কাছে রয়ে গেছে। এই কারণে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ ঐ ক্রয়াদেশ নাও পেতে পারে।
বিজিএমইএ এরই মধ্যে জানিয়েছে, করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রায় সোয়া ৩০০ কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। এসব কারণে কিছু ছোট পুঁজির কারখানা এরই মধ্যে বন্ধও হয়ে গেছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আগামীতে আরো বেশকিছু কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
